চলন্ত বাসে ধর্ষণের প্রতিকার

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০১৯

  মো. আরিফুল ইসলাম

গণপরিবহন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে এর ভেতরে ও আশপাশে কিছু অপরাধ সংঘটিত হয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু ডি. নিউটনের মতে, গণপরিবহন নেটওয়ার্ক কিছু একক ও অনন্য পরিবেশ (স্থান ও সময়) সৃষ্টি করে, যেখানে অপরাধীরা অপরিকল্পিত সুযোগ পায়। এসব স্থানে চলাচল উন্মুক্ত থাকায় অপরাধের ধরনে একটি ভিন্নমাত্রা তৈরি হয়। অপরাধ বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে তিনটি উপাদান তথা হাঁটা, অপেক্ষমাণ ও চলমান অবস্থায় মানুষ অপরাধের শিকার হতে পারে। ১৯৮০-এর দশকে ক্যালিফোর্নিয়ায় কম পথচারী ও নজরদারিসম্পন্ন অপরাধপ্রবণ এলাকার রাস্তায় অনেক ধর্ষণ, হত্যা ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল। ১৯৯০-এর দশকের একটি গবেষণামতে, যুক্তরাষ্ট্রে ৫৬ শতাংশ অপরাধী তার বসবাসরত এলাকায় গণপরিবহনে যাতায়াতের নাম করে অপরাধ করে। ভারতে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে বহুল আলোচিত চলন্ত বাসে প্যারামেডিকেল ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হন। ইতিপূর্বে এরূপ ঘটনা ঘটে থাকলেও তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত বা ব্যাপক আলোচিত হয়নি। চলন্ত বাসেও এমন অপরাধ সংঘটিত হতে পারে জেনে মানুষ বিস্মিত হয়। ঠিক এক মাস পরই ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে পোশাক শ্রমিককে ধর্ষণের খবরটি প্রথম গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

এই নিবন্ধটিতে বাংলাদেশে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত চলন্ত বাসে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার ২০টি ঘটনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ২০১৩ সালে দুটি, ২০১৫ সালে চারটি, ২০১৬ সালে তিনটি, ২০১৭ সালে ছয়টি এবং ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচটি ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমবর্ধমান এ চিত্র গণপরিবহনে নারীর যাতায়াত বিশেষত কর্মজীবী নারীদের রাতে চলাচলে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। অপরাধ সংঘটনের স্থান বিশ্নেষণে দেখা যায়, ঢাকা জেলায় সবচেয়ে বেশি (ছয়টি) এ রূপ অপরাধ ঘটেছে। পরে যথাক্রমে টাঙ্গাইলে চারটি, ময়মনসিংহে দুটি, চট্টগ্রামে দুটি; বরিশাল, হবিগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নোয়াখালীতে একটি করে ঘটনা ঘটেছে। অর্ধেক ঘটনাই মহাসড়কে, ২৫ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে এবং ২৫ শতাংশ রাজধানী বা নগরীর অভ্যন্তরীণ সড়কে সংঘটিত হয়েছে। অপরাধ সংঘটনস্থল সাধারণত স্টেশন থেকে দূরে ছিল, যেখানে পথচারী বা টহলরত পুলিশ কম থাকে। ঘটনা মাঝারি পাল্লার বাসে (৩৫ শতাংশ) বেশি ঘটেছিল। পরে যথাক্রমে আন্তঃশহরে ৩০ শতাংশ, স্বল্প দূরত্বের লোকালে ২০ শতাংশ ও দূরপাল্লার সিটিং বাসে ঘটেছিল ১৫ শতাংশ। শুধু ধর্ষণের পরিকল্পিত ঘটনাগুলো অফিসিয়াল বাস, মাইক্রোবাস বা ম্যাক্সি নামক মিনি গণপরিবহনে ঘটেছিল। মোট ২১ জন ভিকটিমের মধ্যে ১৩ জনকে (৬২ দশমিক ১৫ শতাংশ) সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, পাঁচজনকে (২৩ দশমিক ৮ শতাংশ) সংঘবদ্ধ ধর্ষণচেষ্টা এবং তিনজনকে (১৪ দশমিক ২ শতাংশ) একক ধর্ষণ করা হয়েছিল। এদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। প্রায় ৫০ শতাংশ ঘটনায় ভিকটিমকে চলন্ত অবস্থায় যানবাহন থেকে ফেলে দিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছিল। অপরাধ সংঘটনে প্রায় ৫৫ শতাংশ ঘটনায় দুই-তিনজন, ৩৫ শতাংশ ঘটনায় চার-পাঁচজন এবং ১০ শতাংশ ঘটনায় ছয় বা ততোধিক ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেছিল।

অপরাধ সংঘটনকারীদের বয়স অধিকাংশেরই ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে এবং কিছু সংখ্যক ৩৬ বা তদূর্ধ্ব মধ্যবয়সী। অধিকাংশ ঘটনায় কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিবহন কর্মীরা যেমন ড্রাইভার, সুপারভাইজার ও সহযোগীরা জড়িত ছিল। কিছু ঘটনায় অন্য পরিবহনের শ্রমিক বা পেশাগত অপরাধীরা অংশগ্রহণ করেছিল। গণপরিবহনে ধর্ষণের ঘটনাগুলো বৃহস্পতি ও শুক্রবারে বেশি ঘটে, যেটি সাপ্তাহিক ছুটি ও কর্মজীবীদের দূর যাতায়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভুক্তভোগীদের ৬৫ শতাংশ রাত ৮টা থেকে ১১টার মধ্যে, ২৫ শতাংশ স্বামী বা পুরুষ সঙ্গী থাকা সত্ত্বেও মধ্যরাতে এবং ১০ শতাংশ দিনের বেলায় সংঘবদ্ধ আক্রমণের শিকার হয়েছিল। নজরদারি কম থাকায় গণপরিবহনে সহিংস অপরাধ সাধারণত সন্ধ্যা, রাত ও ভোরে বেশি হয়। ভিকটিম গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর আগেই বাসের অন্যান্য যাত্রীর নেমে যাওয়ায় অপরাধ সংঘটনের অপরিকল্পিত সুযোগ তৈরি হয়। বেশিরভাগ ঘটনার ক্ষেত্রেই চলন্ত বাসে একজন অল্পবয়স্ক নারীর (১৩-৩০) একাকী অবস্থানের সুযোগ নিয়ে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা হয়। তবে কিছু ঘটনায় ভিকটিমদের মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তিন-চতুর্থাংশ ঘটনাই অপরিকল্পিত এবং ভিকটিম-অপরাধীদের মাঝে পূর্বপরিচয় ছিল না বলে জানা যায়। পূর্বপরিকল্পিত ২৫ শতাংশ ঘটনায় দোষীরা দুই-তৃতীয়াংশ ভিকটিমের পূর্বপরিচিত। ভিকটিম যখন নিয়মিত কোনো গণপরিবহন ও একই পথে যাতায়াত করে, অপরাধীরা তাকে ওই নির্দিষ্ট পরিসরে শিকারে পরিণত করার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেয়। অপরাধ সংঘটনে দোষীরা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ফাঁদে ফেলা, মিথ্যা আশ্বাস প্রদান, গাড়ির নির্দিষ্ট গতিপথ হঠাৎ পরিবর্তন, কুপ্রস্তাব ও অন্যান্য কৌশল শেষে বল প্রয়োগ করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে দোষীরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ করেছিল। এ ছাড়াও যাত্রীবেশে ছিনতাইকারী ও ডাকাত দল বাসে উঠে যাত্রীদের টাকা ও মূল্যবান জিনিস কেড়ে নেওয়ার পর নারীদের ধর্ষণ করেছিল। তবে মাত্র ৫ শতাংশ ঘটনায় অপরাধীরা ঘটনাকালীন নেশাগ্রস্ত ছিল। নির্যাতিতার আর্তচিৎকারের কারণে ঘটনাস্থলে আটক বা পরে চিহ্নিত হওয়া ও শাস্তির ভয় থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য অনেক সময় ভিকটিমকে হত্যা করে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেয়।

মোট ভিকটিমের ৬৫ শতাংশ কর্মজীবী নারী, যারা তাদের কর্মস্থলে যাওয়া-আসার সময় অপরাধের শিকার হয়েছিলেন। ভুক্তভোগী কর্মজীবী নারীদের মধ্যে ৬২ শতাংশ পোশাক শ্রমিক এবং ২৩ শতাংশ কোম্পানির চাকরিজীবী। তথ্য বিশ্নেষণে দেখা যায়, কোনো নারীর বৈবাহিক অবস্থা, ধর্ম বা অন্যান্য আর্থ-সামাজিক অবস্থা চলন্ত বাসে ধর্ষিত হওয়ার প্রভাবক হিসেবে কাজ করে না। কর্মজীবীদের বেশিরভাগই তাদের অফিসিয়াল বা শিল্পাঞ্চল এলাকা থেকে দূরে আবাসিক এলাকায় বসবাস করে। সাধারণত কর্মস্থলে নির্দিষ্ট সময়ে যাওয়া বা বাসস্থানে ফেরা বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছানোর চিন্তা থেকে নারীরা অনেকটাই উদ্বিগ্ন থাকে। অনেক সময় তারা ভুল বাস নির্বাচন করে অনিয়মিত যাত্রী হয়ে ভ্রমণকালে নানা হয়রানি ও অপরাধের শিকার হয়। পেশাদার অপরাধীদের থেকে চলন্ত পরিবহনে অপরাধ সংঘটনকারীদের আচরণ ও মানসিকতায় ভিন্নতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনাস্থল থেকে দোষীরা আটক হয়েছিল। তা ছাড়া অপরাধ করার পর তারা পালানোর ব্যাপারে ততটা তৎপর ছিল না। যার অর্থ হচ্ছে, তারা বিষয়টিকে তেমন কোনো গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা আটক হওয়ার পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল। আলোচিত কিছু ঘটনায় আদালতে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি হয়ে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন ও জরিমানার শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। তবে প্রচলিত শাস্তি ও গণমানুষের সামাজিক বা গণমাধ্যমের প্রতিবাদ পরিবহন কর্মীদের যথেষ্ট সচেতনতা বা মনোভীতি তৈরি করতে পারেনি। ঘটনাকালীন পরিস্থিতি এমন থাকে, অপরাধ সংঘটনের পর পালানোর সুযোগ বেশি থাকে, পরে চিহ্নিত বা আটক হওয়ার ভয় কম থাকে। অনেক সময় দোষীরা মনে করে, লোকলজ্জার ভয়ে হয়তো ভিকটিম ঘটনাটি প্রকাশ করবে না। তা ছাড়া রাতে ভ্রমণকারী কিছু নারী সম্পর্কে পরিবহন কর্মীদের একটি নেতিবাচক ধারণা থাকে। বিআইএসআরের এক গবেষণামতে, প্রায় ৬০ শতাংশ ড্রাইভার যৌনকর্মীর কাছে গমন করে এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির তথ্যমতে, ৩০-৩৫ শতাংশ পরিবহন কর্মী মাদক গ্রহণ করে।

চলন্ত বাসে ধর্ষণ প্রতিরোধে যা করণীয় :১. নারীদের বাসে একক যাত্রী হয়ে ভ্রমণ পরিহার; ২. ভ্রমণে সতর্ক থাকা (যাত্রীবেশে অপরাধী ও পরিবহন কর্মীদের প্রতারণার ফাঁদ থাকে); ৩. রাতের বেলায় ভ্রমণে যাতায়াতের পথ, পরিবহন ও রাস্তার নিরাপত্তা সম্পর্কে জেনে নেওয়া; ৪. প্রচলিত আইনে প্রদত্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষার অধিকার যথাযথ প্রয়োগ [দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ১০০(৩য়) অনুযায়ী, ধর্ষণের অভিপ্রায়ে আক্রমণকারীর প্রয়োজনে মৃত্যু ঘটানো যেতে পারে]; ৫. আক্রান্ত হলে সাহায্যের জন্য জোরে চিৎকার ও জাতীয় হেল্প সেন্টারে (৯৯৯) কল; ৬. রাতের বেলায় সড়কে পুলিশের নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়ানো; ৭. বাসের জানালায় স্বচ্ছ গল্গাস লাগানোর বিধান; ৮. অপরাধ সংঘটনকালীন তা প্রতিরোধে জনসাধারণের সক্রিয় ভূমিকা পালন; ৯. পরিবহন কর্মীদের নিয়ে অপরাধ বিষয়ক মাসিক সচেতনমূলক প্রোগ্রাম; ১০. অপরাধীর দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত ও সম্ভাব্য অপরাধীদের কাছে তা প্রচার করা জরুরি।

গবেষণা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট
অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট
arifcps10005@gmail.com


মন্তব্য

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ