মধ্যবিত্তের স্বপ্ন দেখা

সমাজ ও রাজনীতি

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৯

মধ্যবিত্তের স্বপ্ন দেখা

  মামুনুর রশীদ

মধ্যবিত্ত অসম্ভব সব স্বপ্ন দেখতে পারে। সেই স্বপ্ন দেখা থেকে অনেক বড় বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে এই পৃথিবীতে। সে পরিবর্তন জীবনের ক্ষেত্রে, সমাজের ক্ষেত্রে ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে। একেবারে নিম্নবিত্ত মানুষ শুধু দৈনন্দিন জীবন-সংগ্রামের অপেক্ষায়। তাই তার পক্ষে স্বপ্নের সুযোগ খুবই কম। আবার উচ্চবিত্ত মানুষ তার ধনসম্পদ নিয়েই খুশি, কখনও কখনও এই সম্পদ রক্ষার সংগ্রামেই তার জীবন কেটে যায়। ব্যক্তিগত স্বপ্নচারণ থেকেই শুরু করা যাক। চার্লস চ্যাপলিন যিনি চার্লি চ্যাপলিন নামেই বেশি খ্যাত বিশ্বের সিনেমা শিল্পে এবং অভিনয়ে, তিনি আজও অনতিক্রান্ত। জন্মেছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষে। মা-বাবা দু'জনেই ছিলেন অভিনয় শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। একেবারে শৈশবে পিতামাতার বিচ্ছেদ ঘটে যায়। তখনকার দিনের অভিনয়ে একটা প্রধান শর্ত ছিল, তাকে গান গাইতে হবে এবং নাচ জানতে হবে। চার্লি চ্যাপলিনরা ছিলেন দুই ভাই। বড় ভাই সিডনি, ছোট ভাই চ্যাপলিন। একদিন গান গাইতে গাইতে হঠাৎ মায়ের কণ্ঠস্বর ভেঙে যায়। সে ভাঙা আর ঠিক হয় না। অভিনয় শিল্প থেকে বিদায় নিতে হয় মাকে। মা দুই সন্তানকে নিয়ে ভীষণ বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। একের পর এক বাড়ি ছেড়ে দিতে হয়। খাদ্য সংকট দেখা দেয়। মা কখনও সেলাইয়ের কাজ করেন, কখনও অনাথ আশ্রমে সন্তানসহ গিয়ে আশ্রয় নেন। এর মধ্যে তার মানসিক বিকৃতি দেখা দেয়। মানসিক অসুস্থতা নিয়ে দিনের পর দিন কাটতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে শিশু শিল্পী হিসেবে চার্লি চ্যাপলিন কোনো কোনো ভ্রাম্যমাণ থিয়েটারে সামান্য উপার্জন করতে সক্ষম হয়। এরই মধ্যে তিনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন অনেক বড় জীবনের। খুব অল্প বয়সেই চলে আসেন আমেরিকায় ভাগ্যান্বেষণে। সেখানে ওই অল্প বয়সেই অভিনয়ের ক্ষেত্রে নানা কৃতিত্ব দেখাতে শুরু করেন। নির্বাক চলচ্চিত্রের কাজ তখন শুরু হয়েছে হলিউডে। এখানে এসেও নানা টানাপড়েন। এর মধ্য দিয়েই তার চলচ্চিত্র পরিচালক ও অভিনেতার ক্যারিয়ার গড়ে উঠতে থাকে। তারপরের ঘটনা আমরা জানি।

সারাবিশ্বের মানচিত্রে তার অভিনয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণ একটা কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। পৃথিবীতে যত পরিবর্তন হয়েছে তার পেছনে আছে মধ্যবিত্ত। পৃথিবীর প্রথম শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের যারা নির্মাতা, তারা সবাই মধ্যবিত্ত। চীন বিপ্লবেও তাই। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের আমলে যে দেশপ্রেমের রাজনীতি শুরু হয়েছিল, তার উদ্গাতা ছিলেন উচ্চবিত্ত জমিদার ও ব্যবসায়ী শ্রেণি। তাদের হাত ধরে ভারতের স্বাধীনতা এলো বলেই ভারত ও পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের কোনো লাভ হলো না। যদিও এর মধ্যে প্রচুর মধ্যবিত্তের ত্যাগী রাজনীতিবিদরা ছিলেন। যারা কমিউনিস্ট পার্টি ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। কোটি কোটি দেশবাসী নিজ ভ্রাতার রক্তে হাত রঞ্জিত করলেন। জন্মভূমির ভিটে থেকে উচ্ছেদ হলেন এবং দেশান্তরির দুর্ভাগ্যে নিপতিত হলেন। এর মধ্যে অনেক মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব প্রথমে এই বঞ্চনা প্রত্যক্ষ করলেন এবং ভারতের স্বাধীনতার ফাঁকিটাও বুঝতে পারলেন। অবিভক্ত ভারতের মধ্যবিত্তের রাজনীতি থেকে যারা বেরিয়ে এসেছিলেন তারা হলেন- একে ফজলুল হক, আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মওলানা তমিজ উদ্দিন খান, সৈয়দ নওসের আলী প্রমুখ। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেম। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানও ক্রমশ ছাত্রনেতা থেকে বড় স্বপ্নের পথে হাঁটতে থাকেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীনতার ফাঁকি যখন তীব্র আকার ধারণ করেছে, তখন প্রথমেই হতাশাগ্রস্ত হলেও পরে নেতৃবৃন্দ এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে '৪৮ থেকে '৫২ সাল পর্যন্ত ব্যাপৃত হয়। এ সময় এই নেতৃত্বে ব্যাপকভাবে মধ্যবিত্তের আগমন ঘটে। যার ফলে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা। কমিউনিস্ট পার্টিও এ সময় সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত হয়। এই প্রতিষ্ঠানের যারা সদস্য ও কর্মী, তারা সবাই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আগত। তারা যে কোনো ধরনের নিপীড়ন সহ্য করার জন্য প্রস্তুত।

পঞ্চাশের দশকের শেষ থেকে পুরো ষাটের দশক পর্যন্ত এসব নেতা নানা ধরনের রাজনৈতিক নিপীড়ন সহ্য করেছেন, ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেও লড়াই করেছেন। এই লড়াই শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়। মুক্তিযুদ্ধে এই মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের তারুণ্য পরাধীনতার শিকল উপড়ে ফেলে। বাংলাদেশেও রাজনীতির নানা উত্থান-পতনের মধ্যে মধ্যবিত্ত নেতৃত্বই ছিল সবচেয়ে অগ্রগামী। স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের সাফল্য তাই প্রমাণ করে। এই মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের মধ্যে একটা বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি হয় ১৫ বছরের সেনাশাসনের সময়। এ সময় কোনো জবাবদিহি না থাকায় বিপুলসংখ্যক মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত নেতৃত্বের মধ্যে বেচাকেনা শুরু হয় এবং অনেকেই বিপুল সম্পদের অধিকারী হতে থাকে। এই যে সূচনা হলো, সেই থেকে রাজনীতিতে সম্পদ একটা বিষয় হয়ে দাঁড়াল। ডান-বাম দুই ধরনের রাজনীতিতে অর্থ একটা বিরাট ভূমিকা পালন করতে থাকল। পরবর্তী দশকগুলোতে শিল্পায়ন ও উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিপুল অর্থের লেনদেন শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে কোনো একসময় মধ্যবিত্তের হাত থেকে রাজনীতিটা আলগা হয়ে যায় এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি রাজনীতির মধ্যে আর তেমন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। এই যে মধ্যবিত্তের ছিটকে পড়া, তাতে শিল্পায়ন ও উন্নয়নের কিছু যায় আসে না; কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাপন এবং ভবিষ্যৎ, এসবও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ অনিশ্চয়তার ছাপ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এবং বিশেষ করে শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি সর্বত্রই ছায়া ফেলে।

সাম্প্রদায়িকতার উত্থান, ধর্মান্ধতা, বল্কগ্দাহীন মিডিয়ার কর্মকাণ্ড এবং উদ্দেশ্যবিহীন জীবনযাপন, এসবই মধ্যবিত্তের জীবনযাপন-বিরোধী। এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ না করে পারছি না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে গ্রামের একজন স্কুলশিক্ষক প্রার্থী হয়েছিলেন। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারের সময় একদিন আমাকে বললেন, কাল সকালে আমি গাড়ি নিয়ে আসব, তোমাকে নিয়ে কয়েকটা গ্রামে যাব। আমি সানন্দে রাজি হলাম এবং ভাবলাম, পরদিন নিদেনপক্ষে একটা মোটরসাইকেল অথবা অযান্ত্রিক জিপ গাড়ি নিয়ে আসবেন। পরদিন সকালে ওই সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী শিক্ষক একটি সাইকেল নিয়ে এলেন। বাড়ির সামনে একটা বাঁশের তৈরি বেঞ্চিতে বসে পানি, গুড় ও মুড়ি খেলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, গাড়ি কোথায়? তিনি বললেন, ওই তো সামনে। এবার তুমি পেছনে ওঠো। শিক্ষকের পেছনে উঠে বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে ঘুরে বেড়ালাম। সারাদিন ওই গুড়-মুড়িই চলল। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ভাত খেলাম। ওই শিক্ষক বিপুল ভোটে প্রাদেশিক পরিষদে সদস্য নির্বাচিত হলেন। শুধু তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অত্যন্ত অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ২০১৯ সালে এসে একজন সাংসদকে অবশ্যই সাইকেল চালাতে দেখে অথবা ওই ধরনের অবাস্তব কল্পনায় ধারণ করাও উচিত নয়। কিন্তু আজ বিপুল ধনবান না হলে কেউ জনপ্রতিনিধি হতে পারেন না। সাইকেল বা মোটরসাইকেল নিয়ে ভোট চাইতে গেলে ভোটাররাও হাসবে। কালে কালে যে আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে, বৈষয়িক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু স্বপ্ন স্থবির হয়ে আছে। সেই স্বপ্নটাই-বা কী? স্বপ্নটা শিক্ষার, জ্ঞান উপার্জনের, শিষ্টাচারের এবং আরও বৃহত্তরের ক্ষেত্রে নিজেদের সুন্দরভাবে প্রকাশের। আসলে স্বপ্নটা স্থিত হয়েছে বৈষয়িক প্রাপ্তির দিকে। সে প্রাপ্তিযোগ ঘটেছেও।

সম্পদের বা টাকার চরিত্র হচ্ছে, সে মানুষকে অস্থির করে দেয়। কোনো মনোযোগ বা নিজের দিকে তাকানো, পেছনের দিকে তাকানো- এসব আর জীবনের মুখ্য কোনো বিবেচনায় থাকে না। সেখান থেকেই একটা উদ্দেশ্যবিহীন, আদর্শবিহীন জীবন হাতছানি দেয়। এক প্রজন্মের কোনো সফল ব্যক্তির পক্ষে সে হাতছানি উপেক্ষা করা সহজ নয়। সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট লি কুয়েন একবার বলেছিলেন, সিঙ্গাপুরের মতো দ্বীপরাষ্ট্র সাধারণত টেকে না। আমারও সংশয় আছে, নাও টিকতে পারে। কিন্তু টিকে থাকার একটিই বিবেচনা আমার কাছে মনে হয় তা হলো, সিঙ্গাপুর জ্ঞান অর্জনের দিক থেকে আশাতীতভাবে এগিয়ে গেছে। আমিও বলব, আমাদের দেশের তারুণ্য জ্ঞানের দিক থেকে পিছিয়ে নেই। সারাবিশ্বের তথ্য তার কাছে উপস্থিত। কিন্তু এই তারুণ্য যতটা বিদেশমুখী, ততটা স্বদেশমুখী নয়। এই তারুণ্যকে কী করে নানা প্রায়োগিক দিক দিয়ে দেশে ফেরানো যায়, তার জন্য উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এই কাজটিই জরুরি। আমাদের দেশের তরুণরা বিদেশে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন এবং প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাতেও সক্ষম হচ্ছেন। এসব তরুণ দেশে এসেও অনেক কিছু পাল্টে দিতে পারেন, মানুষের জীবনের মানোন্নয়নে বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারেন। কিন্তু দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখাটার বিষয়টি তাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে; যার জন্য প্রয়োজন মধ্যবিত্তের সেই মানসিকতার নতুন করে প্রত্যাবর্তন।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ