নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৯

নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা

  সজীব সরকার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বড় কোনো সহিংসতা ছাড়া মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনের পর স্বাভাবিকভাবেই সবার আগ্রহ ছিল নতুন মন্ত্রিসভার দিকে। সে কৌতূহলেরও অবসান হলো। ৪৭ জনের মন্ত্রিসভা পেলাম আমরা, যেখানে মন্ত্রী রয়েছেন ২৪ জন, প্রতিমন্ত্রী ১৯ জন ও উপমন্ত্রী তিনজন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবারের মন্ত্রিসভায় ৪৭ জনের মধ্যে ২৭ জনই নতুন। প্রভাবশালী অনেককে বাদ দিয়ে নতুনদের নিয়ে আসার এ সাহসী ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবিদার! নতুন সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে। প্রত্যাশা ছিল, সেখানে 'পুরনো ও ব্যর্থ'দের বাদ দিয়ে সম্ভাবনাময় ও চ্যালেঞ্জ নিতে সক্ষম নতুন মুখের দেখা পাওয়া যাবে। নতুন মুখ আমরা পেলাম, এখন তাদের পারফরম্যান্স দেখার অপেক্ষা।

নির্বাচন ঘিরে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, হচ্ছে। বাংলাদেশের বিগত নির্বাচনগুলোর কোনোটিই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। হয়তো এবারেরটিও নয়। কিন্তু বিগত নির্বাচনগুলোর মতো এই নির্বাচনে অত ব্যাপক আকারে সহিংসতা হয়নি, যার আশঙ্কা সবার মনে ছিল। বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের কাঁধে চড়ে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীলতার বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ও স্বাধীনতাবিরোধীরা যে ক্ষমতায় আসছে না- এ প্রশস্তি কমবেশি সবার মধ্যেই রয়েছে। তাই এখন সময় আগামীর দিকে তাকানোর; এবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দেশ ও জাতির কী প্রত্যাশা, এখন সেদিকেই মনোযোগী হওয়া জরুরি।

তবে সামনের দিকে তাকানোর আগে যদি একবার পেছনে ফিরে তাকাই তাহলে দেখব, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রায় অর্ধযুগ লন্ডন ও দিল্লিতে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন। অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালে তার অনুপস্থিতিতেই সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। শেখ হাসিনাই প্রথম এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন; পরে তারই নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটে; দেশে গণতান্ত্রিক শাসনের পথ উন্মুক্ত হয়। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর পর ইতিহাসের নানা বাঁকবদলের মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোটের মাধ্যমে ২০১৯ সাল থেকে টানা তৃতীয়বার ও মোট চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠন করলেন তিনি।

গত তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার অর্জন অনেক - এ নিয়ে মিথ্যাচারের সুযোগ নেই। অগুনতি এসব অর্জনের মধ্যে বাংলাদেশকে পাকিস্তানপন্থি চক্রের থাবা থেকে বের করে নিয়ে আসা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জঙ্গি-সন্ত্রাস দমন এবং পদ্মা সেতু আর মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রকল্পের কথা বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। সবচেয়ে বড় কথা, যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ ডিজিটাল হচ্ছে, যা অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করবে। তার এসব অবদানের জন্য দেশের ও আন্তর্জাতিক মহলের অসংখ্য স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছেন; ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি দেশি-বিদেশি প্রায় অর্ধশত পুরস্কার, পদক, ডক্টরেট ও সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে জাতিসংঘের একাধিক পুরস্কার রয়েছে, আছে দেশ-বিদেশের ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি।

সুধীজন বলেছেন, মানুষ শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রেখে আবার তাকে নির্বাচিত করেছে। তাহলে এই আস্থার মূল্য তিনি দেবেন- এই ভরসাটুকু বঙ্গবন্ধুকন্যার ওপরই কেবল রাখা যায়। প্রাপ্ত আসন ও ভোটের সংখ্যার বিচারে যারা একেবারেই তলানিতে পড়ে রয়েছে, তাদের তুলে নিয়ে আসা এবং সমঝোতা ও সম্মানের সঙ্গে তাদের স্বীয় ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করাও উচিত হবে প্রধানমন্ত্রীর। তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব উৎসাহিত করাও দরকার। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে যদি আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখা না যায়, তাহলে তিনি জনগণের এই বিপুল সমর্থন হারাবেন- এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। বাংলাদেশের মানুষ এখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে দারুণভাবে সোচ্চার; দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতির যে অঙ্গীকার আমরা পেয়েছি, জনগণ নিশ্চয়ই তার বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে। পাশাপাশি, দেশের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি যে তরুণরা, তারা কী চায়, কেমন বাংলাদেশ চায়- এই ভাবনাটুকু অন্তর দিয়ে অনুধাবন করতে হবে। তারুণ্যের এই শক্তিকে কাজে লাগাতে না পারলে কেবল তরুণরা হতাশ হবে তা নয়- গোটা জাতি অনগ্রসর থেকে যাবে। সর্বোপরি, একটি উদার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অর্জন এবং বিশ্বের অন্যতম সফল নেতা হিসেবে তার যাবতীয় অর্জন শেষ পর্যন্ত বিতর্কের মুখে পড়বে- এ আশঙ্কা তো থেকেই যায়! এ জন্য তাকেই একটি কার্যকর বিরোধী দল গড়ে ওঠার মতো পর্যাপ্ত 'স্পেস' ছেড়ে দিতে হবে।

ক্ষমতার প্রবণতাই হলো, সে ক্রমাগত তার আওতা বাড়ায় সবকিছু ক্রমেই গ্রাস করে নিতে চায়। সমাজতাত্ত্বিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা ক্রমেই স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। আমরা প্রত্যাশা করব, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক ও দায়িত্বশীল থাকবেন। চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রিত্বকে তিনি ক্ষমতা নয় বরং তার ওপর পরম বিশ্বাসে অর্পিত জনগণের দায়িত্ব হিসেবেই দেখবেন - এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।

শত বাধা জয় করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। এ জন্য তিনি নিঃসন্দেহে অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। তবে একই সঙ্গে তার ওপর যে গুরুদায়িত্ব বর্তাল, সে ব্যাপারে তিনি সচেতন ও দায়িত্বশীল থাকবেন বরাবরের মতো- দেশের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে তার কাছে আমাদের এটাই প্রত্যাশা। 'আলোর পথযাত্রী' গোটা দেশের ও গোটা জাতির জন্য আলোর দিশারি হয়ে থাকবেন- এই আশায় বুক বাঁধলাম!

সহকারী অধ্যাপক, জার্নালিজম কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ; স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
sajeeb_an@yahoo.com


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ