টক-এ নো-টক

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৯

  হাবিবুর রহমান

বাংলাদেশে টক শো জনপ্রিয় অনুষ্ঠান, তাতে সন্দেহ নেই। একবার কাতার প্রবাসী এক বাংলাদেশি আমাকে বলেছেন, দেশে এক মাসের ছুটিতে থাকার সময় প্রতিদিন তিনি একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলে টক শো শুনেছেন। এ সুযোগে তার দুটি প্রাপ্তি ঘটেছে। এক. অনেক রাজনৈতিক নেতা ও পেশাজীবীদের চিনতে পেরেছেন; দুই. বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ে মোটামুটি ধারণা পেয়েছেন। তিনি নিজেকে মনে করতেন রাজনীতির বাইরের মানুষ। টক শো তাকে রাজনীতির অন্দর মহলের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অবশ্য বলেছেন, নানা মত শুনলেও গঠনমূলক আলোচনায় ঘাটতি দেখেছেন। বেশিরভাগ আলোচনায় পক্ষ-বিপক্ষ রয়েছে। আর এই পক্ষ-বিপক্ষ বেছে নেওয়া হয় প্রধানত রাজনৈতিক দল থেকে। তিনি মনে করেন, এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেখানে কিছুটা ভিন্নমত থাকলেও দলমত নির্বিশেষে সবার অভিন্ন অবস্থান কাম্য। সেটায় ঘাটতি রয়েছে।

বিএনপি নামের দলটি এখন বিপর্যস্ত। তাদের প্রায় সব প্রার্থী শোচনীয়ভাবে হেরে গেছেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের টক শোতে এ দলের অনেককে সোচ্চার দেখা গেছে। কিন্তু এখন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বলছেন ভিন্ন কথা। তারা টক শোতে অংশগ্রহণকারী দলের নেতাদের সতর্ক হতে বলেছেন। কোনো কোনো টেলিভিশন চ্যানেল বর্জন করতে বলেছেন। যারা আমন্ত্রণ পাবেন বিভিন্ন চ্যানেল থেকে, সেখানে যাওয়ার আগে দলের মনোনীত নেতার কাছ থেকে আলোচনার পয়েন্ট নিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। গঠনমূলক ও তথ্যনির্ভর বক্তব্য উপস্থাপন যেন করা যায়, সে জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনাও রয়েছে। এটাও বলা হয়েছে যে, কোনো কোনো টেলিভিশন চ্যানেল বিএনপি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরির জন্য কাজ করে। উদ্দেশ্যমূলক সমালোচনা করে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চাইছে, এসব চ্যানেলে যাওয়া থেকে যেন টকাররা বিরত থাকে।

টেলিভিশনগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে কম ব্যয়ের অনুষ্ঠান টক শো- এমন কথা বলা হয়। এ অনুষ্ঠানে তেমন সুসজ্জিত সেট দরকার পড়ে না। আলোচকদের মেকআপেও তেমন ব্যয় নেই। তবে তাদের কিছু সম্মানী দিতে হয়, যার পরিমাণ খুব বেশি হয় না। রেট ঠিক করার ক্ষেত্রে আবার মুড়ি-মুড়কির একদর। মন্ত্রী বা সাবেক মন্ত্রীর কিংবা সচিবের সঙ্গে যাকেই প্রতিপক্ষ করা হোক না কেন, সম্মানীর হার সাধারণত একই হয়ে থাকে। সঙ্গীত বা নৃত্য শিল্পীদের রেটে পার্থক্য থাকে। গানের অনুষ্ঠানে কেউ কেউ কয়েক লাখ টাকাও চেয়ে থাকেন। আবার কেউবা যৎসামান্য পেলেই খুশি; কিন্তু টিভি-টকারদের সবার এক রেট। এ ক্ষেত্রে টকারদের কাছে সম্ভবত গুরুত্ব পায় বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ। এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে অনেক মানুষের কাছে নিজের মতামত তুলে ধরতে পারেন। বিএনপি সংসদে যাবে কিনা, অনিশ্চিত। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী টক শোতেও সুবিধা করা যাচ্ছে না। বলা যায়, কঠিন সময় অতিক্রম করছে দলটি। এ অবস্থায় কেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব টকারদের প্রতি এমন নির্দেশনা জারি করছেন, যা কার্যত দলের অবস্থান টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে তুলে ধরার কাজ বিঘ্নিত করবে। এভাবে  দলের নেতাদের গণতান্ত্রিক অধিকার কতটা সংকুচিত করা হচ্ছে, সে প্রসঙ্গ না হয় বাদই থাকল। দলের নেতারা দলের অবস্থান মানুষের কাছে তুলে  ধরার কাজেও যে বিঘ্ন সৃষ্টি করছেন। এর পরিবর্তে তারা কিন্তু টকারদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা ভাবতে পারেন। সংসদ সদস্য যারা  হতে পারেননি, অথচ টকে প্রতিপক্ষের সঙ্গে টক্কর দিতে পারেন যারা তাদের সেখানে দেবেন প্রশিক্ষণ।


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ