বিনামূল্যের বইয়ের দশ বছর

সময়ের কথা

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০১৯

বিনামূল্যের বইয়ের দশ বছর

  অজয় দাশগুপ্ত

সমকালের পাঠক, শুভানুধ্যায়ীদের ২০১৯ সালের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানাই। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর আমরা কয়েকজন একত্র হয়েছিলাম 'বন্ধুত্বের সূচনার' ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে। ১৯৬৮ সালে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হই। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নানা প্রান্ত থেকে আমরা এসেছি। আমার শিকড় ছিল গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ পরিচিত ছিল না। কিন্তু পরস্পরকে চেনা-জানায় বেশি সময় প্রয়োজন পড়েনি। এখন কোনো সংগঠনে আমরা সংঘবদ্ধ নই। কারও সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কও নেই। এমনও নয় যে, সকলে বাংলাদেশে অবস্থান করে। কিন্তু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে তাতে সমস্যা হয় না। আমরা পাঁচ দশক আগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে স্মৃতিচারণ করে সময় কাটাই।

এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে যারা ভর্তি হয়, তাদের নিয়ে একটি কর্মসূচি চালু আছে- পাথওয়ে টু জেনোসাইড, ১৯৭১। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অনন্য ভূমিকা রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখানেই প্রথম বাংলাদেশের পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে তোলা হয় ২ মার্চ, ১৯৭১। বটতলা, তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, রেসকোর্স ময়দান, মধুর ক্যান্টিন- এসব স্থানের ইতিহাস শোনে ছাত্রছাত্রীরা। আমার সৌভাগ্য, এমন একটি কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারছি। গত বছর এই কর্মসূচিতে অন্তত এক হাজার ছাত্রছাত্রীর সংস্পর্শে এসেছি। কথা বলেছি। হাঁটতে হাঁটতে এক ছাত্র মন্তব্য করেছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ধূলিকণার সঙ্গেই তো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আরেক ছাত্রী প্রশ্ন রেখেছিল- আপনি যখন ৫০ বছর আগে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছিলেন, তখন কি ভাবতে পেরেছেন- আপনার ৫০ বছর পর যারা এ গৌরবের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবে, তাদের সঙ্গে একত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলবেন? আমি এ প্রশ্নে হতবাক হয়ে যাই। বিস্মিত হই। আনন্দিতও হই। উত্তরে বলি- তোমার প্রশ্নের বিষয়টি নিয়ে তো চলচ্চিত্র হতে পারে, ধারাবাহিক নাটক হতে পারে। আমাদের জীবনের সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠান এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, সে সময়ের স্মৃতি থেকে কেউ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে চায় না।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম থেকেই ১৯৭১ সালের ১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের মিছিলে শামিল হই। ২৫ মার্চ থেকে যুক্ত হয়ে পড়ি স্বাধীনতার সশস্ত্র যুদ্ধে। মনে পড়ে, ২৫ মার্চ রাতে হাতিরপুল-বর্তমান সোনারগাঁও হোটেল এলাকায় প্রথম পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার সময় আমার অস্ত্র ছিল একটি গাছের ডাল। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্র নিয়ে যিনি এগিয়ে চলেছেন সবার আগে, অসম সাহসে- তার হাতে ছিল একটি শাবল। আর আমাদের ক্যান্টনমেন্ট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়মুখী সড়ক বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যিনি দিয়েছিলেন, তিনি খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান (পটুয়া নামেও ডাকা হতো তাকে), হাতিরপুলের সেন্ট্রাল রোডে ছিল তার বসবাস।

'তোমাদের যার যা আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে'- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এ নির্দেশের কী সফল বাস্তবায়নই না আমরা করতে পেরেছিলাম!

আমাদের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত ছয় হাজারের মতো ছাত্রছাত্রী। এখন অন্তত ৪০ হাজার ছাত্রছাত্রী পড়ছে। দেশে ছাত্রছাত্রী পাঁচ কোটির বেশি। এ বছরের ১ জানুয়ারি প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত চার কোটি ২৬ লাখ ছাত্রছাত্রীকে বিনামূল্যে বই দেওয়া হয়েছে। এর ব্যয় বহন করেছে বাংলাদেশ সরকার। বঙ্গবন্ধুকন্যা ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেন। ২০১০ সালে দেশের সব বিদ্যালয়ের সব ছাত্রছাত্রীর হাতে তিনি নতুন বই পৌঁছে দেন বছরের প্রথম দিনেই। সেই থেকে টানা ১০ বছর! ২০১৯ সালের জন্য ছাত্রছাত্রীরা বই পেল বছরের প্রথম দিনে। এ এক অনন্য অর্জন। এবার একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলেছে নভেম্বর-ডিসেম্বরজুড়ে। শেখ হাসিনাই ফের ক্ষমতায় আসবেন- এ নিয়ে ছিল চরম অনিশ্চয়তা। বিএনপির অনেক শীর্ষ পর্যায়ের নেতা এবং তাদের সমর্থক বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিকরা বলেছেন, 'দেখেন না, সাত দিন পর কী হয়।' নির্বাচনে শেখ হাসিনাই জয়ী হয়েছেন। তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যখন 'ভোট বিপ্লব', 'ব্যালট বিপ্লবের' কথা বলেছে, আওয়ামী লীগ নেতারা ৩০ ডিসেম্বরের পর পালানোর পথ পাবে না বলে সতর্ক করে দিয়েছে- তখনও কিন্তু বিদ্যালয়ের চার কোটি ২৬ লাখ ছাত্রছাত্রীর জন্য বই ছাপা, বাঁধাই ও হাজার হাজার বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর কাজে বিন্দুমাত্র বিঘ্ন ঘটেনি।

আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে সফলতার কথা বলি। বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণও কিন্তু বড় সাফল্য। এ বছর এত বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর জন্য বই মুদ্রণ, বাঁধাই ও মুদ্রণে ব্যয় পড়েছে মাত্র এক হাজার ৮২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের পরিমাণ সাড়ে চার লাখ কোটি টাকারও বেশি। সে তুলনায় বিনামূল্যের বইয়ের খাতে এ অর্থ কতই না সামান্য! আমাদের দেশে এমন অনেক ধনবান ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের কাছে ব্যাংকের পাওনা এক বছরে বিনামূল্যে বই বিতরণ করার জন্য যে অর্থ ব্যয় হয়, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। তারা ঋণ নিয়ে সময়মতো ফেরত দেন না এবং রাষ্ট্র এ অর্থ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপও নিতে পারছে না। অথচ কত সহজেই না টানা এক দশক ধরে কোটি কোটি ছাত্রছাত্রীর হাতে সময়মতো বই পৌঁছে দিচ্ছেন শেখ হাসিনা! এ এক বৈপরীত্য বৈকি!

বিনামূল্যের বই পেয়েছে ঢাকার ল্যাবরেটরি সরকারি বিদ্যালয়ের ছাত্র সাবিক রহমান। তার ভাইও একই বিদ্যালয়ের ছাত্র। তারা নবম শ্রেণিতে পড়ছে এবং টানা ৯ বছর বছরের প্রথম দিনে নতুন বই হাতে পেয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর দু'জনের একজন ছিল বরিশালে। কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে থাকা কঠিন নৌপথের ঝুঁকি নিয়ে সে ১ জানুয়ারি সকালে ঢাকা পৌঁছেছে কেবল নতুন বই হাতে পাওয়ার আনন্দ উপভোগ করতে। তাদের কাছে প্রতি বছর এদিনটি আনন্দ ঠিক ঈদের দিনের মতো।

নতুন বই নিয়ে কেমন অনুভূতি পরিবারে- এ নিয়ে কথা হয় নড়াইলের কালিয়া উপজেলার মনোরঞ্জন কাপুড়িয়া কলেজের শিক্ষক মঞ্জুর কাদেরের সঙ্গে। তার স্ত্রীও শিক্ষক। পুত্র সাজিদ শুয়াইব পড়ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মঞ্জুর কাদের বলেন, পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র নতুন বই হাতে পাবে, এমন আনন্দক্ষণের জন্য আমরা উন্মুখ হয়ে ছিলাম। তাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় বিনামূল্যের বই পেত কেবল দরিদ্র পরিবারের ছাত্রছাত্রীরা। এখন নবম শ্রেণি পর্যন্ত ধনী-দরিদ্র সব পরিবারের সন্তানরা বিনামূলে বই পায়। তিনি বলেন, আমরা দু'জনেই সন্তানের পড়াশোনার প্রতি খেয়াল রাখি। তবে এখন শিক্ষার আলো পৌঁছে গেছে হতদরিদ্র পরিবারের ঘরের ভেতরেও। বিদ্যালয়ের বাইরে কেউই আর থাকতে চায় না। তবে এসব পরিবারের সন্তানদের জন্য কেবল বিনামূল্যে বই প্রদান যথেষ্ট নয়, তাদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের আরও মনোযোগী হতে হবে। কেউ শিক্ষায় অমনোযোগী বা উদাসীন হলে তার দায় কিন্তু কেবল পরিবারের নয়, বিদ্যালয়, সমাজ এবং রাষ্ট্রেরও।

কক্সবাজারের উখিয়ার সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহম্মদ হারুনুর রশিদের সঙ্গে কথা হয় বই বিতরণ উৎসব নিয়ে। তিনি জানান, তার বিদ্যালয়ে এক হাজার ২৮ জন ছাত্রছাত্রীর হাতেই বই পৌঁছে গেছে। যখন ছাত্র ছিলাম নতুন বই হাতে পাওয়ার আনন্দ উপভোগ করেছি। তবে সে বই কিনতে হতো। আর এখন বছরের প্রথম দিনেই বিনামূল্যের বই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে সরকারের ব্যবস্থাপনায়।

বাংলাদেশের এ অঞ্চলে এখন কঠিন সময় অতিক্রম করছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। তাদের মিয়ানমার সরকার বাধ্য করেছে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। তবে এসব পরিবারের সন্তানদের জন্য যথাযথ শিক্ষার ব্যবস্থা করা সহজ কাজ নয়। এ অপূর্ণতা আমাদের অবশ্যই কষ্ট দেয়।

বরগুনা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী সুস্মিতা। এবার নবম শ্রেণিতে উঠেছে। নতুন শ্রেণিতে প্রথম দিনেই তার হাতে নতুন বই- টানা ৯ বছরে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এমন চমৎকার, নিখুঁত ব্যবস্থাপনার জন্য।

চিনু রানী সরকার হাওর অধ্যুষিত জেলা সুনামগঞ্জের ধরমপাশা উপজেলার জনতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক। শিক্ষকতার মহান পেশায় আছেন প্রায় ৩৫ বছর। তার বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী দুই হাজার ৪০০। বর্ষায় অনেকে আসে নৌকা কিংবা ট্রলারে চেপে। শুকনো মৌসুমে ১০ কিলোমিটার দূর থেকে হেঁটেও অনেক ছাত্র প্রতিদিন স্কুলে আসে। তিনি টানা দশ বছর ধরে বিনামূল্যের বই তুলে দিচ্ছেন ছাত্রছাত্রীদের হাতে। তার নিজের বই কেনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, বছরের দুই-তিন মাস চলে যেত সব বই হাতে পেতে। অনেক দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা সব বই কিনতেও পারত না।

প্রকৃতই নতুন যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। তবে শিক্ষার মান নিয়ে অনেকের শঙ্কা। কেউ কেউ হতাশাও ব্যক্ত করেন বিষয়টি নিয়ে। তবে বই প্রকাশ ও বিতরণ নিয়ে আমরা যে দক্ষতা বছরের পর বছর দেখাতে পারছি, সেটা যদি অন্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে পারি- নিশ্চিত করে বলতে পারি, শিক্ষার মান নিয়ে দুশ্চিন্তা কেটে যাবে। মুক্তিযুদ্ধে আমরা যে যেভাবে পেরেছি, অবদান রেখেছি। শিক্ষার মান বাড়াতেও এখন তেমনটি প্রয়োজন। এটাই হবে এ সময়ে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্নিষ্টদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ। যাতে জয়ী হতেই হবে। কারণ আমাদের চাই আধুনিক, উন্নত বাংলাদেশের জন্য দক্ষ, যোগ্য, সৃজনশীল মানবসম্পদ।

ajoydg@gmail.com


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ