আফসোস থেকেই গেল

রাজনীতি

প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০১৯

আফসোস থেকেই গেল

  ড. মইনুল ইসলাম

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের জন্য মহাজোট এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশ-বিদেশের অনেকেই অভিনন্দন জানালেও আমি অভিনন্দন জানাতে পারছি না। নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ আসনে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ডা. আফছারুল আমীনকে নৌকা মার্কায় আমিও ভোট দিয়েছি; কিন্তু ফলাফল দেখে যখন বুঝতে পারলাম যে, আমার ভোটটিকে আওয়ামী লীগ চরমভাবে অপমান করেছে, তখন আমার সমর্থিত প্রার্থীর বিপুল বিজয়ে আনন্দের পরিবর্তে আমাকে একবুক হতাশা ও বেদনায় আচ্ছন্ন করেছিল। দেশে যে ২৯৮টি সংসদীয় আসনের নির্বাচন হয়েছে, তার ২৮৮টিই পেয়েছে মহাজোট, আওয়ামী লীগ একাই পেয়েছে ২৫৯টি। ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারকে ক্ষমতায় রেখে যেহেতু এবারের নির্বাচনটা সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, তাই দেশের জনগণের মধ্যে ভীষণ উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছিল। একই সঙ্গে একটা ক্ষীণ প্রত্যাশা ছিল যে, এই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনটা অবাধ ও সুষ্ঠু হলে রাজনীতির একটা বড়সড় গ্যাঁড়াকল থেকে দেশটা মুক্তি পেয়ে যাবে। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিটা আদায় করা যাবে না জেনেও বিএনপি-জামায়াত ওই দাবি নিয়ে ২০১১ সাল থেকে বারবার দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছিল এবং ভবিষ্যতেও হয়তো যাবে। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, ১৯৭৩ সাল থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনই বাংলাদেশে সুষ্ঠু হয়নি। সে জন্যই দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার চালু হয়েছিল সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে। ওই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগই। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত চারটি নির্বাচনের কোনোটাতেই নির্বাচনের অব্যবহিত পূর্বে ক্ষমতাসীন দল বা জোট নির্বাচনে জিততে পারেনি। তার মানে, এ দেশে ক্ষমতায় থাকা যেহেতু পুঁজি লুণ্ঠনের লাইসেন্স পাওয়ার এবং একচেটিয়া ক্ষমতা ফলানোর অসীম সুযোগে পরিণত হয়, তাই পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন দল বা জোট দ্রুত জনপ্রিয়তা হারিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনেই জনগণ কর্তৃক প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ২০০৮ সালে নির্বাচিত মহাজোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই 'অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি বায়াস' (anti-incumbency bias) বুঝতে পেরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের সুযোগ নিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে আগের ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত করেছে। এবার যদি নির্বাচনটা সুষ্ঠু হতো, তাহলে এই ইস্যুর একটা সুরাহা হয়ে যেত। কিন্তু শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের এই 'গোল্ডেন চান্সটা' এবারও হারিয়ে ফেলেছে- এ জন্যই আমার বুকভরা হতাশা।

এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যা করেছে, সেটা ছিল চরম লজ্জাকর ব্যালট জবরদখল, যেটা মোটেও আবশ্যক ছিল না। নির্বাচনের আগের রাতে পুলিশের অংশগ্রহণে ব্যালটে সিল মারা থেকে শুরু করে পোলিং বুথে ঢুকে ব্যালট পেপারে বিনা বাধায় একচেটিয়া সিল মারা সবই চলেছে এবার। বিরোধী জোটের পোলিং এজেন্ট দেশের বেশিরভাগ এলাকায় ভোটকেন্দ্রগুলোতে না থাকায় এবং দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত ভোট গ্রহণ কর্মকর্তারা ক্ষমতাসীন সরকারের ভয়ে নীরবতা পালনকেই নিরাপদ ভেবে বিনা প্রতিবাদে এই জবরদখল মেনে নেওয়ায় এহেন ভোট ডাকাতির উৎসব সারাদিনই চলেছে দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলের ভোটকেন্দ্রে। কেন্দ্রের বাইরে তেমন সংঘাত দেখা যায়নি, পরিবেশ সবসময় সুনসান শান্ত ছিল। তাই সীমিত সংখ্যক নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা হয়তো বুঝতেই পারেননি যে, ভোটের বুথগুলোর অভ্যন্তরে এই প্রহসন চলেছে শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণের নামে। যখন ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, মহাজোটের প্রার্থীরা লাখ লাখ ভোট পেয়ে ২৮৮ আসনে জিতে গেছেন আর অন্যদিকে ১৬১ আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে, তখন এই হাস্যকর ফলাফল স্বয়ং শেখ হাসিনাকেই যে বিব্রত করছে, সেটা বোঝাই যায় (নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে, এর অর্ধেকই হয়তো ভুয়া)। ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি কলামে ড. মনজুর আহমদ এই ব্যাপারটাকে সঠিকভাবে বর্ণনা করেছেন 'ওভারকিল' (overkill) বলে; যে কথাটির অর্থ হলো 'প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্ষমতা ফলানো'। নির্বাচনের বেশ কয়েকদিন আগেই পরিস্কারভাবে বোঝা গিয়েছিল যে, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বড়সড় জয়ের পথে এগিয়ে চলেছে। অতএব, সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগ ও মহাজোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করত- এ ব্যাপারে কোনো সংশয় ছিল না কারও মনে। আমাদের নির্বাচনী এলাকায় আবদুল্লাহ আল নোমানের কোনো পোস্টার আমার চোখেই পড়েনি। তার পক্ষে কোনো বড়সড় মিছিল হয়েছে বলেও মনে হয় না। সে জন্য নির্বাচনের তিন দিন আগে একাত্তর টেলিভিশনের 'একাত্তর সংযোগ' শীর্ষক টক শোতে আমি অভিযোগও করেছিলাম যে, ধানের শীষের প্রার্থীরা হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে নির্বাচনী মাঠে নিষ্ফ্ক্রিয় থাকার কৌশল নিয়েছেন! হয়তো ভোটের আগেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার চাণক্যনীতিকে কৌশল হিসেবে নিয়েছিলেন তারা তাদের থিসিসকে প্রমাণ করার জন্য যে, কোনো ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনে এ দেশে কখনোই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। অতএব, ওটা বিএনপির একটা ফাঁদ ছিল বোঝাই যাচ্ছে। আমার দুঃখ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ এই ফাঁদে ধরা দিয়েছে। প্রশাসন, পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, মাস্তান, মাসলম্যান- সবই তো ক্ষমতাসীন সরকারের ভোট জালিয়াতির হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহূত হতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল জনগণের, হয়েছেও তা-ই। সাংগঠনিক ক্ষমতার বিচারে আওয়ামী লীগের ধারেকাছে যাওয়ার সাধ্য নেই বিএনপির। কিন্তু এসবকে ছাপিয়েও এবারের নির্বাচনী প্রচারের পর্যায়ে যে সত্যটা ফুটে উঠেছিল তাহলো, দেশের অর্থনৈতিক অর্জনগুলোর কৃতিত্ব জনগণ শেখ হাসিনাকেই দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে এবারের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ে অভিষিক্ত করতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং তার চাণক্যপ্রবর উপদেষ্টারা জনগণের এই নাড়িস্পন্দন ধরতে পারলেন না কেন?

এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ায় সফল হওয়ায় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর কয়েকদিন ধরে বিরোধী রাজনীতিতে একটা প্রবল জোয়ার দেখা গিয়েছিল। কিন্তু একের পর এক ভুল করে বিএনপি এই জোয়ারকে মিইয়ে দিয়েছে। তাদের প্রথম মারাত্মক ভুল হয়েছে বিএনপি অফিসের সামনের সড়কে পুলিশের ওপর অহেতুক আক্রমণের তাণ্ডব চালিয়ে বেশ কয়েকটি গাড়ি পোড়ানো, ভাংচুর ও পুলিশকে মারধর করা। দেশের জনগণ ২০১৩-১৫ সালের সন্ত্রাসী তাণ্ডব ফিরে আসুক, তা আর কখনও চাইবে না অথচ বিএনপির অতি-উৎসাহী নেতাকর্মীরা ওই অন্ধকার দিনগুলোর স্মৃতিকে আবার জাগিয়ে দিয়েছিল তাদের শক্তি মদমত্ত নর্তন-কুর্দনের মাধ্যমে। বিএনপির দ্বিতীয় ভুল, প্রার্থী মনোনয়নে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে তারেক রহমানকে সিদ্ধান্তদাতার ভূমিকায় নামানো। বিএনপিকে বুঝতে হবে, দুর্নীতি মামলায় জেলে যাওয়া সত্ত্বেও খালেদা জিয়া এখনও জনপ্রিয়তা অনেকখানি ধরে রাখতে পারলেও দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কাছে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধী তারেক রহমান ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর নির্বাচনে জয়লাভ করলে ফ্রন্টের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, সে প্রশ্নের জবাব দিতে না পারায় জনগণ বুঝে নিয়েছিল যে, তারেক রহমান তাদের পরিকল্পিত প্রধানমন্ত্রী। এই ভয়ঙ্কর উপলব্ধি ফ্রন্টের জয়ের সম্ভাবনাকে বরবাদ করেছিল বলা চলে। এরপর যখন বিএনপি নিলামে মনোনয়ন বিক্রির ন্যক্কারজনক বাণিজ্যে মেতে উঠল, তখন জনগণ তারেক রহমানের 'হাওয়া ভবনের রাজত্বের' পুনরাবির্ভাব দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। এই নিলামের কারণে বিএনপির অনেক যশস্বী প্রার্থী শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মনোনয়ন থেকে ছিটকে পড়েছিলেন। জনরব হলো, চট্টগ্রামের মোর্শেদ খান এবং সিলেটের এনাম আহমদ চৌধুরীও নাকি ঘৃণাভরে এহেন নিলামকে প্রত্যাখ্যান করায় এই নিলাম বাণিজ্যের শিকার হয়েছেন! চতুর্থ ভুলটা ছিল বিএনপির জামায়াত কানেকশন। এই কানেকশন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধাদের চরিত্রকেও কালিমালিপ্ত করেছে। এমনকি নির্বাচনের কয়েকদিন আগে ড. কামালকেও পরিতাপ করতে হয়েছে যে, বিএনপি জামায়াতকে ছাড়বে না জানলে তিনি কখনোই ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব নিতে রাজি হতেন না। আরও গুরুতর হলো, জামায়াতে ইসলামীর আবদার মেটাতে গিয়ে যুদ্ধাপরাধীর বিচার অব্যাহত রাখা সংক্রান্ত ঐক্যফ্রন্টের অঙ্গীকার থেকে পরদিনই আলাদাভাবে প্রদত্ত বিএনপির ইশতেহারে সরে আসা। এই নিকৃষ্ট মোনাফেকি বিএনপির আসল রূপটাকে জনগণের কাছে নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে। তারেক রহমানের ভাষ্যমতে, বিএনপি ও জামায়াত 'আপন মায়ের পেটের ভাই'। এই সম্পর্ক যে 'অবিচ্ছেদ্য' সেটা বুঝতে পারায় জনগণ বিএনপিকে পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ভবিষ্যতে আর কখনও জামায়াত-শিবিরকে এ দেশের রাজনীতির মাঠে মেনে নেবেন না। জামায়াত-শিবিরের সূতিকাগারে জন্ম নেওয়া রক্তপিপাসু জঙ্গি কিলিং স্কোয়াডগুলোকে নির্মূল করাই এখন জাতির পরম কর্তব্য মনে করি।

ঐক্যফ্রন্টের আরেকটি ভুল ছিল, তাদের একাধিক ক্ষমতা কেন্দ্রের কারণে সৃষ্ট অন্তর্কোন্দল। ড. কামাল হোসেন শিখণ্ডী হিসেবে সামনে থাকলেও বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত যে তারেক রহমানই চাপিয়ে দিচ্ছিলেন, সেটা বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল না। এমনকি ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অজান্তে সরাসরি তারেক রহমান অনেক সিদ্ধান্ত 'ডিকটেট' করার প্রমাণ মিলছিল অহরহ। সবশেষে বলতেই হবে, বিএনপি নেতাদের কারও কারও সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর যোগাযোগ এবং আর্থিক সংশ্নেষের প্রমাণ পাওয়ায় বিএনপি যে এখনও পাকিস্তানের দালালি থেকে সরে আসেনি, সেটাও বোঝা গেছে। এসব কারণে নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছিল, ততই বোঝা যাচ্ছিল যে, নির্বাচনটা অংশগ্রহণমূলক হলেও নির্বাচনী ফলাফল ভূমিধস বিজয় এনে দেবে মহাজোটকে (আর পুলিশের পাইকারি গ্রেফতার অভিযান, ছাত্রলীগ-যুবলীগের হুমকি-ধমকি এবং বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের পলায়নপর মনোবৃত্তি নির্বাচনের মাঠকে মহাজোটের একচ্ছত্র দখলে রেখেছিল আগাগোড়াই। বলা চলে, হারার আগেই হার মেনে নিয়েছিল বিএনপি)। এ জন্যই আমার আফসোস, শেখ হাসিনা প্রহসনমূলক নির্বাচনের বদনামটি খামাখাই নিজের ভাগে নিলেন।

একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ