বিএনপির আসল সিদ্ধান্তদাতা ও এক শিখণ্ডী

রাজনীতি

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮

বিএনপির আসল সিদ্ধান্তদাতা ও এক শিখণ্ডী

  ড. মইনুল ইসলাম

একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সংসদ সদস্যপ্রার্থী মনোনয়নের সাক্ষাৎকারে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধী পলাতক তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মূল সিদ্ধান্ত প্রদানকারীর ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে দিয়েছেন- বিএনপির আসল নাটের গুরু তিনিই রয়ে গেছেন। অতএব, কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়া উচিত নয় যে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কথিত নেতৃত্বের ভূমিকায় ড. কামাল হোসেনকে সামনে শিখণ্ডী হিসেবে খাড়া করা হলেও আগামী নির্বাচনে যদি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আসল সুবিধাভোগী বিএনপি জয়ী হয়ে তাদের ২০ দলীয় জোটের সাঙ্গাত স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোয়ালিশন করে সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে তারেক রহমানই কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ দখল করতে চলেছেন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হত্যাযজ্ঞকে আমি একটি নারকীয় গণহত্যা বলে অভিহিত করতে চাই। সম্প্রতি বিচারিক আদালতে এই হত্যাযজ্ঞের মামলার বিচারের রায় ঘোষিত হয়েছে দীর্ঘ ১৪ বছর পর। রায়ে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়েছে, তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে এবং আরও কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। দণ্ডিত অপরাধীদের কয়েকজন জেলে বন্দি থাকলেও তারেক রহমানসহ কয়েকজন পলাতক। মামলাটি এখন উচ্চতর আদালতে আপিলের অপেক্ষায়। আদালতের রায়ে আদালত মন্তব্য করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে যতই বিরোধ থাকুক, প্রতিপক্ষকে এমন নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি মহাকলঙ্কজনক অধ্যায়।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের ২২ জন নেতাকর্মী নৃশংস খুনের শিকার হয়েছিলেন এবং চার শতাধিক নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছিলেন। এই আহত নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন গ্রেনেডের শত শত স্পিল্গন্টার শরীরের ভেতরে বছরের পর বছর ধারণ করার কারণে নানা ধরনের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পরে মারা গেছেন, যার মধ্যে জননেতা আবদুর রাজ্জাক ও ঢাকার জননন্দিত মেয়র হানিফ ছিলেন শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড হামলা থেকে রক্ষা করার জন্য মানবঢাল রচনাকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। আর ডজনদুয়েক নেতাকর্মী গত ১৪ বছর ধরে সারা শরীরে গ্রেনেডের অসংখ্য স্পিল্গন্টার বহন করার কারণে দিনরাত নরক-যন্ত্রণা ভোগ করে চলেছেন। বেশ কয়েকজন চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন।

২০০৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়া ও তার আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন ক্ষমতায় আসীন থাকার সময় এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের তদন্ত ও বিচার কাজকে কতভাবে যে বাধাদান ও ভুল পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তার পুরো কাহিনী ওয়াকিবহাল মহলের অজানা থাকার কথা নয়। গ্রেনেড হামলা ঘটনার যাবতীয় আলামত রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ মহলের আদেশে বিনষ্ট করা হয়েছে। একই মহলের নির্দেশে হাস্যকরভাবে জজ মিয়ার কাহিনী সাজানো হয়েছে। আবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে এমন এক প্রহসনমূলক বিচার বিভাগীয় তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে, যেখানে ওই বিচারপতি তার বানোয়াট রিপোর্টে কাহিনী সাজিয়েছিলেন- গ্রেনেড হামলাটি আওয়ামী লীগ এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা 'র'-এর কীর্তি! ভারতে পালিয়ে থাকা জনৈক সন্ত্রাসীর নামও উল্লেখ করা হয়েছে হামলার নাটের গুরু হিসেবে (ওই রিপোর্ট দাখিলের কিছু দিনের মধ্যেই বিচারপতি জয়নুল আবেদীনকে খালেদা জিয়া সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি বানিয়েছিলেন)! ডিজিএফআই, এনএসআই ও পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মামলার অসংখ্য আলামত ও অকাট্য প্রমাণকে এমনভাবে গায়েব করে ফেলা হয়েছে যে, ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার মামলার তদন্ত পুনরায় শুরু করার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও যথাযথ আলামতের অভাবে সঠিকভাবে মামলার চার্জশিট দেওয়া যায়নি। এমনকি প্রথম চার্জশিটে তারেক রহমান ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মতো মূল পরিকল্পনাকারীর নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল না। যে জন্য পরে একটা অতিরিক্ত চার্জশিট প্রদান করতে হয়েছে। ওই অতিরিক্ত চার্জশিটে তারেক রহমানকে হামলার আসল নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করার কারণেই বিএনপি ওটাকে 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' আখ্যায়িত করে তারেক রহমানকে 'মাসুম' দাবি করে চলেছে! আদালত তাদের এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এই মামলার অভূতপূর্ব যে বৈশিষ্ট্য আমরা পর্যবেক্ষণ করলাম তাহলো, দীর্ঘ ১৪ বছর মামলার বিচার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে বিএনপির ধুরন্ধর ব্যারিস্টার ও উকিল বাহিনীর কুটিল চাণক্য-বুদ্ধির মহড়া। বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘসূত্রতার দুষ্টচক্রে বন্দি করার জন্য তারা কত রকম চালাকি ও ধূর্ততার আশ্রয় নিয়েছেন, তা দেখে দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর আমি যারপরনাই বিরক্ত। তবু মহান আল্লাহতায়ালাকে হাজার হাজার শোকরিয়া যে, এত রকম চাণক্য-বুদ্ধির লজ্জাকর প্রদর্শনীকে বানচাল করে বিচারক মহোদয় শেষ পর্যন্ত মামলার রায় প্রদান করতে সমর্থ হয়েছেন। অবশ্য অন্যান্য আসামিকে এ মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েও এহেন নারকীয় গণহত্যা মামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও আদেশদাতা হিসেবে তারেক রহমানকে সাব্যস্ত করা সত্ত্বেও আদালত কেন তাকে শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করলেন, তা বোধগম্য নয় (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে এমএ পড়ার সময় আমি ১৯৭২ সালে এলএলবি কোর্স সম্পন্ন করে সার্টিফিকেটও পেয়েছিলাম। কিন্তু উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯৭৫ সালে বিদেশে চলে যাওয়ায় এলএলবি পরীক্ষা আর দিতে পারিনি। অতএব, ফৌজদারি আইন সম্পর্কে আমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে)। আশা করি, হাইকোর্টে সরকারপক্ষ তারেক রহমানের মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করবে। নইলে এই পৈশাচিক গণহত্যার সঠিক বিচার হয়েছে- বলা যাবে না। যার নির্দেশে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে আদালতের রায়; সবার আগে তারই তো মৃত্যুদণ্ড হওয়ার কথা!

আজকের কলামে দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, ২১ আগস্টের হত্যাযজ্ঞের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত একজন খুনির রাজনীতির মারপ্যাঁচে দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসন দখল করে নেওয়ার যে প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, তা কোনোভাবেই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের সংবিধানের ৭০ ধারার কারণে বিএনপি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে; আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার জমিদারিতে পরিণত হয়েছে আর জাতীয় পার্টি স্বৈরাচারী সমরপ্রভু এরশাদের সম্পত্তি হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রতিটি দলের নেতাকর্মীদের দণ্ডমুণ্ডের একক কর্তৃত্ব কুক্ষিগত করে ফেলেছেন ৭০ ধারার অসীম ক্ষমতাবলে। কোনো রাজনৈতিক দলের যে কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মী কেউ যদি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অপছন্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, তাহলে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এক কলমের খোঁচায় বরবাদ হওয়ার ব্যবস্থা রয়ে গেছে এই ৭০ ধারায়। বিএনপির সংসদ সদস্যের মনোনয়ন নির্ধারণে লন্ডনে পলাতক খুনি তারেক রহমানের অসীম ক্ষমতার প্রকাশ যেভাবে জাতি প্রত্যক্ষ করেছে, তার মাধ্যমে এবার প্রমাণ হয়ে গেল- দেশের প্রতিটি বৃহৎ দলেই দলীয় প্রধান কিংবা তার ঘোষিত উত্তরাধিকারীর এহেন 'একনায়কত্ব' প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক সুব্যবস্থা আমাদের সংবিধানের মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ ৭০ ধারারই অবদান। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের কোনো ক্ষমতাই নেই একজন খুনের অপরাধে দণ্ডিত অপরাধীকে মনোনয়ন প্রদান থেকে বারিত করার কিংবা বিএনপিকে এহেন গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখার। বিএনপির কার ঘাড়ে ক'টা মাথা আছে এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস দেখাবেন?

কিন্তু আমি ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, কাদের সিদ্দিকী ও সুলতান মনসুরের জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না। তারা শেখ হাসিনাকে ভীষণ অপছন্দ করেন, সেটা বোধগম্য। কিন্তু তারা কেন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তারেক রহমানের মতো একজন গণহত্যায় দণ্ডিত আসামিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে বসাতে চাচ্ছেন? কোন বিবেচনায় বা কী যোগ্যতার কারণে তাদের কাছে তারেক রহমান শেখ হাসিনার চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য? শুধু ক্ষমতার রাজনীতির স্বার্থে যে ব্যক্তি দেশের পরাজিত শত্রু পাকিস্তানের ভয়ঙ্কর যুদ্ধাস্ত্র গ্রেনেড সংগ্রহ করে ঠাণ্ডা মাথায় 'জঙ্গি কিলিং স্কোয়াড'-এর সহায়তায় তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পৈশাচিক পন্থায় হত্যা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে; তাকে একটি সভ্য দেশে কোনো সুস্থ মস্তিস্কের মানুষ কি প্রধানমন্ত্রী বানাতে পারে? তাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার বিরোধের ব্যাপারে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আমি বুঝতে পারি, তারা শেখ হাসিনার ওপর ক্ষুুব্ধ হতেই পারেন। তারা নিজেদের বঞ্চিত মনে করলে আমি কোনো দোষ দেখি না। কিন্তু তারা যে একটি মরণাপন্ন বিএনপি-জামায়াত জোটকে তাদের অবিমৃষ্যকারী পালাবদলের রাজনীতির মাধ্যমে নবজীবন দিয়ে গেলেন, দেশের জন্য তার ভবিষ্যৎ পরিণতি কী হবে, তা কি তারা ভালো করে চিন্তা করেছেন? জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রশংসায় তারা যতই মুখে ফেনা তুলুন না কেন; বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন কি তাতে এতটুকুও বদলাবে? বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে জিতলে তাদের ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলতে এক মুহূর্তও দেরি হবে না বিএনপির।

এ দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন কোনো দল বা জোট অবাধ, নিরপেক্ষ ও জালিয়াতিমুক্ত নির্বাচনে জয়ী হয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়ে আসা আরও বহুদিন দুরূহ থেকে যাবে। কারণ প্রতিটি ক্ষমতাসীন দল বা জোট গত ৪৭ বছর ধরে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন ও ক্ষমতার বেধড়ক্‌ অপব্যবহারের 'কালচার' থেকে আজ বেরোতে পারেনি। তাই 'অহঃর-রহপঁসনবহপু ংবহঃরসবহঃ্থ এ দেশের ভোটের রাজনীতিতে একটি দুরারোগ্য ব্যাধির মতো গেড়ে বসে থাকবে আরও বহুদিন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গত ১০ বছরে দেশের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী বহু সাফল্য অর্জন সত্ত্বেও এই সেন্টিমেন্টকে সফলভাবে উতরাতে পারবে কিনা, তা বলা যাচ্ছে না। তাই এবারের নির্বাচনে আবার 'আওয়ামী লীগ ঠেকাও'-এর নেতিবাচক ভোটের রাজনীতির জোয়ার সৃষ্টি হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ওই জোয়ারের বেনো জলে বিএনপি-জামায়াত চক্র নির্বাচনে বাজিমাত করলে তারেক রহমানের খপ্পরে পড়বে বাংলাদেশ। ড. কামাল হোসেনরা কি সেটাই চাইছেন? সাধু সাবধান!

একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ