যেনতেন প্রকারে নির্বাচন নয়

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮

যেনতেন প্রকারে নির্বাচন নয়

  এমাজউদ্দীন আহমদ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হলেও নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রার্থীদের মূল প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়নি। প্রার্থী চূড়ান্ত করতে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো সময় নিচ্ছে। দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি ইতিমধ্যে শেষ হলেও জোটগত প্রার্থীর বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি। অর্থাৎ সব মিলিয়ে নির্বাচনের মূল প্রচার-প্রচারণা শুরু হতে এখনও বাকি। কিন্তু মূল কথা হলো নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে। অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের জন্য কিছু অপরিহার্য শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দল কিংবা জোটের প্রার্থীদের জন্য সমানাধিকার নিশ্চিত করা।

সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা ইসির দায়িত্ব। কিন্তু তাদের ভূমিকায় ইতিমধ্যে এ কথা উঠেছে, তারা যেনতেন প্রকারে নির্বাচন করতেই আগ্রহী। এই অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ কম। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি এক মাসেরও কম। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' নিশ্চিত হয়নি- এ অভিযোগ শুধু প্রধান প্রতিপক্ষ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নয়; আরও অনেকেরই রয়েছে। এই অভিযোগ অসত্য নয় যে, ক্ষমতাসীন জোটের পুরনো ও নতুন শরিকরা যে ধরনের সুবিধা ভোগ করছেন, এর বিপরীতে বিরোধীরা ততটাই প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছেন এখনও।

এও অভিযোগ আছে, সংলাপের টেবিলে সরকারের তরফে আশ্বাস প্রদানের পর প্রধান বিরোধী জোটের প্রতিপক্ষ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব দানকারী দল বিএনপির নেতাকর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে, মামলায় জড়ানো হচ্ছে। নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে কৌশলে। এমন প্রতিবেদন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন সংক্রান্ত সব বিষয়েই সর্বেসর্বা নির্বাচন কমিশন। তাদের নিয়ন্ত্রণে বিধি মোতাবেকই অনেক কিছু চলে গেছে। কিন্তু এখনও তাদের আচরণ পক্ষপাতমুক্ত নয়- এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, এসবই হলো সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় রকমের প্রতিবন্ধক। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের যেসব শর্ত রয়েছে এবং যে রকম পরিবেশ দরকার; এর যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তাই সঙ্গতই উদ্বেগ ও শঙ্কা পিছু ছাড়ছে না। আমরা মন্দের ভালো নয়; চাই স্বচ্ছ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কিন্তু সরকারি জোটের কারও কারও কর্মকাণ্ড এখনও বিতর্ক সৃষ্টি করছে।

এ ধরনের আচরণ সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে বড় ধরনের বাধা- তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির যে আহ্বান বারবার জানানো হচ্ছে, তা তৈরির ক্ষেত্রেও এমন কর্মকাণ্ড অশনিসংকেত। কেউ কেউ ইতিমধ্যে বলেছেন কিংবা এখনও বলার চেষ্টা করছেন, বিএনপির নির্বাচনে না এসে উপায় ছিল না। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না- তা অতীতে কখনও বলেনি। বিএনপি নেতারা নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে কথা বলেছেন এবং তারা এও বারবার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, প্রশ্নমুক্ত অবাধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী কী প্রতিবন্ধকতা কিংবা বাধা বিদ্যমান। জাতীয় নির্বাচনের মতো এত বড় একটি আয়োজন সম্পন্ন করতে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলো কতটা প্রস্তুত- এ প্রশ্ন উঠেছিল নানা মহল থেকে কিছুদিন আগে। এই প্রশ্নের পটভূমিও বর্ণনা করা হয়েছে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে যখন দেশ-বিদেশের নানা মহলে শঙ্কা রয়েছে, তখন এসব বিষয় নতুন করে আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ইতিমধ্যে। ইসি ও সরকারের ওপর নানা মহল থেকে যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, নির্বাচন সুষ্ঠু যাতে হয়, তা নিশ্চিত করার এর পটভূমিও তাদেরই কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা ১৩ নভেম্বর রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেছেন, 'নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখবেন। প্রার্থী ও দলকে প্রতিপক্ষ হিসেবে নেবেন না। আইনের মধ্যে থেকে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলবেন এবং সহযোগিতা করবেন। আপনাদের কাজ যেন ভোটারদের মনে কোনো সন্দেহের সৃষ্টি না করে।' এসবই ভালো কথা। কিন্তু গত সিটি নির্বাচনে এমন নির্দেশনার পরও অনেক ক্ষেত্রেই যে অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে, তারপর শুধু এমন কথায় কতটা আশ্বস্ত হওয়া যেতে পারে- ভুক্তভোগীদের এ নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। সিইসি মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের যে নীতি মেনে চলতে কিংবা অনুসরণ করতে বলেছেন, সেই নীতি যথাযথভাবে মানা হবে কি-না, সংশয় থেকে যায় এ নিয়েও। সুষ্ঠু, অবাধ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যে পরিবেশ নিশ্চিত করা সর্বাগ্রে জরুরি, তা কি এখন পর্যন্ত করা সম্ভব হয়েছে? আবারও বলি, আমরা তো মন্দের ভালো নয়, চাই দৃষ্টান্তযোগ্য একটি নির্বাচন। তা ছাড়া এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট যেহেতু সম্পূর্ণ ভিন্ন, সেহেতু এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলদের ভাবনাও সে রকম দূরদর্শী হওয়া তো বাঞ্ছনীয়।

নির্বাচনে সংঘাতের আশঙ্কা করছেন অনেকেই। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ উদ্যোগে যে ঘাটতি রয়েছে তা দৃশ্যমান- এ কথাও ইতিমধ্যে অনেকে বলেছেন। নির্বাচনের মাঠে ক্ষমতাবানরা প্রভাব বজায় রাখতে শক্তির মহড়া দিতে পারেন। যদি এ আশঙ্কা মিথ্যায় পরিণত হয় তবেই মঙ্গল। যদি সত্যে পরিণত হয়, তাহলে বহুবিধ বিপদ দেখা দেবে; অভিজ্ঞতা থেকে আমরা তাই বলতে পারি। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সুযোগ-সন্ধানী চক্র অর্থাৎ পেশিশক্তি ও অপরাধীচক্র মাথাচাড়া দিতে পারে। নির্বাচনের আগে-পরের পরিবেশ নিয়ে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের আরও দূরদর্শী পদক্ষেপ নেওয়া, সজাগ-সতর্ক থাকার ব্যাপারে কোনো রকম উদাসীনতা যেন না পরিলক্ষিত হয়- এই দাবি অত্যন্ত সঙ্গত। দায়িত্বশীল কারও অদূরদর্শিতা কিংবা অবহেলায় জনপ্রত্যাশা যেন মাঠে মারা না যায়, তা সময়ক্ষেপণ না করে নিশ্চিত করতেই হবে। নির্বাচন কমিশনের সামনে এই নির্বাচন অনেক চ্যালেঞ্জ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে- তাদের এই কথাটা ভুলে গেলে চলবে না।

বিএনপি নির্বাচনবিরুদ্ধ রাজনৈতিক দল নয়। ১৬ নভেম্বর ঢাকায় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মতবিনিময় সভায় এ কথাটাই পুনর্বার উচ্চারণ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে কী কী বাধা রয়েছে, সেসব পত্রপত্রিকায় প্রায় নিত্যই প্রকাশিত-প্রচারিত হচ্ছে। এর পরও দায়িত্বশীলরা কেন যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেননি কিংবা পারছেন না- এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় তারা এড়াতে পারেন না। 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' কেন অত্যন্ত জরুরি, এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। প্রত্যাশিত শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধাগুলো কী, তা সচেতন মানুষমাত্রই জানা। এই বাধাগুলা কি দূর করা গেছে? এবারের নির্বাচন শুধু যে নির্বাচন কমিশনের জন্যই কঠিন পরীক্ষা, তাও নয়। সরকারের জন্যও বড় রকমের পরীক্ষা বটে। নির্বাচন পরিচালনাকারী শক্তি কিংবা সহযোগী শক্তি হিসেবে তাদের শুধু নিরপেক্ষভাবে কাজ করলেই চলবে না; তাদের কাজ জনগণের কাছেও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। নির্বাচনটি যদি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রশ্নমুক্ত হয়, তাহলে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সবাই অভিনন্দন পাবেন। কিন্তু নির্বাচন যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয় তাহলে এর বিরূপ প্রভাব কতটা বহুমুখী হতে পারে, তা তারা ভুলে না গেলেই মঙ্গল।

নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলতে হবে এবং তা যাতে কেউ অমান্য না করতে পারেন, এ ব্যাপারে ইসিকেই সব ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা এসব ব্যাপারে এমন কোনো দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেনি, যা আস্থার সংকট কাটাতে সহায়ক। এটা অপ্রিয় হলেও অসত্য নয় যে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের কারণে নির্বাচনী মাঠ সমতল রাখার ধারণায় যে বিরাট ঘাটতি রয়েছে, তা কার্যকরভাবে এখনও দূর করা যায়নি। সংসদ বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনে যেহেতু নির্বাচন হচ্ছে, সেহেতু বিষয়টি নানা শঙ্কা জিইয়ে রয়েছেই। এ অবস্থায় বিরোধী পক্ষের মনে আস্থা তৈরির জন্য এবং তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব রকম পদক্ষেপ নেওয়াটাই এ মুহূর্তে জরুরি। ইসির উচিত, পক্ষপাতহীন দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ দেওয়া তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। এখন তারা সরকারের মুখাপেক্ষী নয়। বিধি মোতাবেক তারাই অনেক কিছুর নিয়ন্ত্রক। কাজেই তাদের কাজ তাদেরকে করতে হবে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে। গোঁজামিল দিয়ে কোনো কিছুর চেষ্টা না করাটাই হবে শ্রেয়। মিডিয়াকেও এসব ব্যাপারে আরও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

নির্বাচন সংক্রান্ত এবং নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষতা বজায় রেখে যথাযথ ভূমিকা পালন করা গণমাধ্যমের বিশেষ দায়িত্ব। সাংবাদিকরা যাতে পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা প্রতিপক্ষ যাতে কোনো রকম রাজনৈতিক বৈরিতার মুখোমুখি না হয়, তাও নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনকেন্দ্রিক যে কোনো সংঘাত-সহিংসতা ঠেকাতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত হোক, এও কাম্য। আমাদেরই শুধু নয়, বিদেশের নানা মহলেরও আহ্বান ছিল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হোক। এখন কথা হলো, অংশগ্রহণমূলকই শেষ কথা নয়। নির্বাচন যাতে অবাধ হয়, তাই মুখ্য বিষয়। সুশাসন, ন্যায়বিচারের পথ মসৃণ হোক। জনগণ ভোট দিতে পারবে তো- এমন প্রশ্ন কিন্তু এখনও নানা মহল থেকে উঠছে। ভোটাররা যাতে বাধাহীনভাবে তাদের মতামতের প্রতিফলন ঘটাতে পারে- কণ্টকমুক্ত হোক সেই পথটা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ