এরশাদের 'শেষ' নির্বাচনে জাতীয় পার্টির 'শুরু'?

রাজনীতি

প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮

এরশাদের 'শেষ' নির্বাচনে জাতীয় পার্টির 'শুরু'?

  শেখ রোকন

নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ বলেছিলেন- 'আমার মতো দুঃখী রাজনীতিবিদ আর কেউ নেই!' অথচ অনেক বিবেচনাতেই বাংলাদেশে শুধু নয়; বিশ্বেও তার চেয়ে সুখী রাজনীতিক আর কেউ কি আছেন? বিশ্বের আর কোনো দেশে ক্ষমতাচ্যুত একনায়ক এভাবে তিন দশক ধরে দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজনীতি করে যেতে পেরেছেন? তবুও তার দুঃখী হওয়ার একাধিক কারণ থাকতে পারে- স্বীকার করতে হবে। তারও আগে অস্বীকারের অবকাশ নেই তার সুখী হওয়ার কারণগুলো।

১৯৯০ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পরবর্তী প্রায় সব নির্বাচনেই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একাধিক আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। জনতা টাওয়ার মামলায় দণ্ডিত হওয়ার কারণে শুধু ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি। নব্বইয়ের পট পরিবর্তনের পর কারাগার থেকেই পাঁচটি আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি। আমার মনে আছে, রংপুর অঞ্চলে তখন জাতীয় পার্টির একটি স্লোগান জনপ্রিয় হয়েছিল- 'মাগো, তোমার ভোট পেলে/ মুক্তি পাবে দেশের ছেলে।' সেবার তিনি শুধু নিজের পাঁচটি আসনেই বিজয়ী হননি; রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যেও জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসনে বিজয়ী হয়ে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছিল।

প্রতিকূল পরিবেশে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি যে চমক দেখাতে পেরেছিল, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনগুলোতে 'অনুকূল' পরিবেশে যেন তা কমতে শুরু করেছিল। আমরা দেখি- সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩২টি, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪টি আসনে জয়ী হয়। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭টিতে। ওই সংসদে ক্ষমতাসীন মহাজোটের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তা বেড়ে ৩৪টিতে দাঁড়ায় বটে; ক্ষমতাচ্যুতির পর প্রথম নির্বাচনের ৩৫টির সেই মাইলফলক আর ছুঁতে পারেনি দলটি। এমনকি সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে এইচএম এরশাদ নিজেও একাধিক আসনে জয়ের রেকর্ড হারিয়ে ফেলেন। 'সিদ্ধান্তহীনতায়' তিনি দুটি আসনের একটিতে বিজয়ী হলেও আরেকটিতে পারেননি।

জাতীয় পার্টির এমন পরিস্থিতি বা পরিণতির পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। কেউ কেউ বলে থাকেন, এইচএম এরশাদের 'ডিগবাজি' এ জন্য দায়ী। একবার এই জোটে, আরেকবার ওই জোটে গিয়ে তিনি জাতীয় পার্টির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ক্রমাগত নিঃশেষ করেছেন। অনেকটা নাটকীয়ভাবে বলা যায়, ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! দলকে শক্তিশালী করতে গিয়ে তিনি যতবারই কোনো জোটে গিয়েছেন, ততবারই এক দফা ভাঙনের শিকার হয়েছে জাতীয় পার্টি।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট সরকারে যোগ দিয়েছিল জাতীয় পার্টি। যোগ দিতে গিয়ে প্রথম ভাঙনের শিকার হয় দলটি। মওদুদ আহমদসহ কয়েকজন নেতা যোগ দেন বা ফিরে যান বিএনপিতে। যেহেতু এর ফলে ব্রাকেটবন্দি আরেকটি জাতীয় পার্টি সৃষ্টি হয়নি, ওই ভাঙনের কথা অনেকের হয়তো মনে নেই। আবার পরবর্তী নির্বাচনের আগে জোট সরকার থেকে বের হয়ে আসতে গিয়েও প্রথমবারের মতো ব্রাকেটবন্দি হয় দলটি। দলটির মহাসচিব আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে 'জাতীয় পার্টি (মঞ্জু)' নামে বেশ কিছু সংসদ সদস্য ক্ষমতাসীন জোটে থেকে যান এবং পরবর্তী নির্বাচনে ওই নামেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

ওদিকে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বিএনপির সঙ্গে যোগ দিয়ে তৈরি করে 'চার দলীয় জোট'- বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোট। কিন্তু নির্বাচনের আগে আগে সেখান থেকেও যখন তিনি চলে আসতে চান, তখন দলটির তৎকালীন মহাসচিব নাজিউর রহমান মঞ্জুরের নেতৃত্বে ব্রাকেটবন্দি 'জাতীয় পার্টি (মঞ্জুর)' চার দলীয় জোটেই রয়ে যায়। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় তিনটি জাতীয় পার্টি- এরশাদ, মঞ্জু ও মঞ্জুর। কিন্তু জাতীয় পার্টির ভাগ্যাকাশে ভাঙনের নিয়তি তখনও শেষ হয়নি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ শ্যাম ও কুল দুটোই রাখতে চেয়েছিলেন, যাতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থাকলে সেখানেও জাতীয় পার্টি থাকতে পারে, আবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাতেও ভাগ বসানো যায়। দুই জোটে পা রাখতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে লিয়াজোঁ রাখা কাজী জাফর আহমদ আরেকটি 'জাতীয় পার্টি (জাফর)' গঠন করে ১৯ নম্বর দল হিসেবে যোগ দেন তৎকালীন ১৮ দলীয় জোটে। ওই জোটে থাকা 'জাতীয় পার্টি (মঞ্জুর)' আবার ততদিনে আরেক দফা ভেঙেছে। যদিও সেই 'জাতীয় পার্টি (মতিন)' এখন কোথায়, আমার অন্তত জানা নেই। সামনের দিনগুলোতে জাতীয় পার্টি আবার ভাঙবে কি-না, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলনের সুবাদে যেসব নেতা মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন, বিচ্ছেদের সময় এরশাদ তাদের পাশে পাবেন কি-না, সন্দেহ রয়েছে। সন্দেহ রয়েছে নিজের স্ত্রী ও সংসদে দলনেতা রওশন এরশাদের অবস্থান নিয়েও। নভেম্বরের গোড়ায় জাতীয় পার্টির সঙ্গে সরকারের সংলাপে তিনি তো প্রধানমন্ত্রীকে স্পষ্টতই বলেছেন- এরশাদ এবার ডিগবাজি দিলেও তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজে অবশ্য জাতীয় পার্টির ভাঙাগড়া সামান্যই পাত্তা দিতে চান। বিভিন্ন সময়ে তিনি বলেছেন, জাতীয় পার্টি মানেই এরশাদ। অন্য নেতারা কে কোথায় গেল, তাতে ভোটের বাজারে তারতম্য হওয়ার আশঙ্কা নেই। ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুই ক্ষমতায় থাকতে যেমনটি বলতেন- 'আমিই রাষ্ট্র'। ক্ষমতাচ্যুতির পরও এইচএম এরশাদ বলেন, 'আমিই জাতীয় পার্টি।' শুধু বলা নয়; তিনি এর প্রমাণ হাতেকলমেও আকছার দেখিয়ে থাকেন। দলে কারও পদ পরিবর্তন, পদোন্নতি, পদাবনতি- এসব ক্ষেত্রে তার মুখের কথাই যথেষ্ট। গঠনতন্ত্র বা গণতান্ত্রিকতার বালাই নেই। ২০১৬ সালে এরশাদ কী ভেবে তার সহোদর জিএম কাদেরকে গঠনতন্ত্রে না থাকা পদ 'কো-চেয়ারম্যান' ঘোষণা করলে বেঁকে বসেন স্ত্রী রওশন এরশাদ। তখন গঙ্গাচড়ায় এক জনসভায় ঘোষণা দিয়ে স্ত্রীকে প্রদান করেন 'সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান' পদ।

নিজের বিবেচনায় এইচএম এরশাদ 'দুঃখী রাজনীতিক' অন্য কারণে। ক্ষমতাচ্যুতির পর তার বিরুদ্ধে অন্তত ৪৩টি মামলা হয়েছিল। তিনি বলে থাকেন, এসব মামলার কারণেই তিনি কখনও 'স্বাধীন অবস্থান' গ্রহণ করতে পারেননি। একবার এ-জোটে, আরেকবার ও-জোটে যেতে হয়েছে। মনোনয়নপ্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়ই বলেছেন- 'এখনও আমার নামে মামলা আছে। একটা দিনের জন্যও মুক্তি ছিলাম না, এখনও নেই।' অবশ্য মুদ্রার অপর পিঠ যদি দেখা যায়, তার নামে এখন মাত্র একটি মামলা টিকে রয়েছে। সাজা খেটেছেন আরেকটি মামলায়। বাকি ৪১টি মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন 'ডিগবাজি' দিয়েই। সেদিক থেকে তার জোট-বদল সার্থকই বটে। ক্ষমতাচ্যুতির পর নিজ এলাকায় বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন; একাধিক আসনে বিজয়ী হয়ে সংসদে বসেছেন; পরবর্তী পাঁচটি সরকারের মধ্যে তিনটিতে শরিক হিসেবে থেকেছেন; তার আত্মীয় ও নেতাকর্মীরা মন্ত্রিত্ব উপভোগ করেছেন; তিনি ব্যাংক, ব্যবসা, বাণিজ্য করেছেন হাত খুলে। অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় পার্টিতে পদ কিংবা মনোনয়ন পেতেও মোটা অঙ্কের 'অনুদান' দিতে হয়। ব্যক্তিজীবনে 'বান্ধবীভাগ্য' নিয়ে না হয় বললামই না। রাজনৈতিক জীবনেই একজন রাজনীতিকের একজীবনে আর কী চাই?

প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনীতিকের 'একজীবন' মানে কতদিন? রাষ্ট্রপতি হিসেবে এইচএম এরশাদ ৯ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। রাজনীতিক হিসেবে তিন গুণ ২৭ বছর ক্ষমতা উপভোগ করেছেন। কিন্তু বয়স বড় বালাই। এরশাদের বয়স এখন ৮৮। আরেকটি নির্বাচন আসতে আসতে তার বয়স হতে পারে ৯৩। আগের নির্বাচনগুলোতে তিনি প্রায়শ বলতেন, সেটাই জাতীয় পার্টির ক্ষমতায় যাওয়ার শেষ সুযোগ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় পার্টির বদলে নিজের কথা বলছেন। ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ নয়, বলছেন নিজের বয়সের কথা। সর্বশেষ ১৩ নভেম্বর বরগুনার বেতাগীতে বলেছেন- 'এটাই হয়তো আমার জীবনের শেষ নির্বাচন।'

তার শেষ নির্বাচন মানেই কি জাতীয় পার্টির জন্যও শেষ? নাকি শুরু? পেছনে তাকিয়ে বিশ্নেষকদের অনেকে মনে করেন, জাতীয় পার্টি যদি কোনো জোটে না গিয়ে এককভাবেই রাজনীতিতে পথ চলত, তাহলে এত ব্রাকেটবন্দি হতে হতো না। রংপুর অঞ্চলে বিপুল জনপ্রিয়তা পুঁজি করে দেশের অন্যান্য অংশেও ক্রমে বিস্তৃত হতে পারত। অতি আশাবাদী কেউ কেউ এমনও মনে করতে পারেন- এরশাদের ক্ষমতাচ্যুতির পর দুই দফা বিএনপি ও আওয়ামী লীগ শাসন দেখার পর তৃতীয় দফায় জনমত জাতীয় পার্টির দিকে ঘুরে যাওয়াও অস্বাভাবিক ছিল না। এখনও প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়েও যখন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ক্রমেই প্রতিহিংসায় পরিণত হচ্ছে, তখন দুই দলের মনোনয়ন না পাওয়াদের প্রায় অবধারিত গন্তব্য হতে পারে 'তৃতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক দল' জাতীয় পার্টি।

জাতীয় পার্টির ভাঙা হাটেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম বিক্রি হওয়ার যে হিড়িক দেখা গেছে, তা কিন্তু অতি আশাবাদীদের ধারণাই সত্য প্রমাণ করে। এবার বিএনপি থেকে বিক্রি হয়েছিল ৪ হাজার ৫৮০টি ফরম। আওয়ামী লীগ থেকে বিক্রি হয়েছিল ৪ হাজার ২৩টি ফরম। আর জাতীয় পার্টি থেকে বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৮৬৫টি ফরম। মনোনয়ন ফরম বিক্রির সংখ্যা বিবেচনা করলে প্রধান দুই দলের সঙ্গে তৃতীয় দল হিসেবে জাতীয় পার্টির টক্করই কি স্পষ্ট হয় না?

কে না জানে, রাজনীতি একটি 'বাইনারি সিস্টেম'! এক অথবা শূন্য। আধা বলে কিছু নেই। সেই হিসাবে ক্ষমতার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে তৃতীয় আরেকটি শক্তির প্রয়োজনীয়তা কখনও ফুরাবে না। বামপন্থিদের ভোটের পরিস্থিতি যখন নাজুক; জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক পরিচিতি যখন সঙ্গিন; তখন জাতীয় পার্টির সুযোগ এখনও শেষ হয়নি। এরশাদের 'শেষ' নির্বাচন জাতীয় পার্টির জন্য নতুন শুরুও হতে পারে, দলটির বাকিরা যদি রাজনীতির হিসাব কষতে পারেন ঠিকমতো।
skrokon@gmail.com

সাংবাদিক ও গবেষক


মন্তব্য যোগ করুণ