হামেদ মিয়ার নির্বাচন ও আজকের গল্প

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৮

হামেদ মিয়ার নির্বাচন ও আজকের গল্প

  মামুনুর রশীদ

নির্বাচনমুখী বাঙালির জীবনে আজ উৎসব। একদা যেমন উৎসবগুলো সংক্ষিপ্ত হতো, এখন আর তা নয়। এক সপ্তাহের নিচে কোনো উৎসবই হয় না। কখনো তা মাসে দাঁড়ায়। মাসব্যাপী বা মেলার শেষে ভাঙা মেলা উৎসবও হয়। নির্বাচনী উৎসবের সূচনা দলীয় মনোনয়ন ফরম কেনা থেকে একেবারে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত। এলাকায় এ সময় নির্বাচনী প্রচারের অফিস। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চা, পান, সিগারেট সহকারে আনন্দের সময়। ভোটারদের এ সময় ভীষণভাবে দাম বেড়ে যায়। মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন ধরনের গাড়ির যাতায়াত, স্লোগান, মিছিলে মিছিলে একাকার এলাকা। কোথাও কোথাও সামান্য উস্কানিতেই হাতাহাতি, মারামারি থেকে একটা বড় উচ্ছৃঙ্খল ঘটনা পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। আবার নির্বাচনগুলো হয় শীতকালে। বাঙালির রোমান্টিক সময়ে। ঈদের সময় বাঙালি যেমন ঘরমুখো, তেমনি নির্বাচনের সময়ও ভিন্ন মাত্রার উত্তেজনা লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে নানা রসিকতার গল্প, বিরোধী পক্ষের চরিত্র হনন, কুৎসা সবই চলতে থাকে। আবার ভোটার ও প্রার্থীর মাঝখানে একদল ক্যানভাসার। নানাভাবে প্রার্থীর গুণ বর্ণনা, অতীতের সাফল্যগাথা, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি- এসব অত্যন্ত দক্ষভাবে বলা এবং বিজয়ের সুনিশ্চয়তার মধুর বয়ানও এর মধ্যে পড়ে। এ তো গেল উৎসবমুখরতার একটা বহিরঙ্গের বয়ান।

ময়মনসিংহের একজন হামেদ মিয়া বহুবার এক অভিনব কায়দায় নির্বাচনে জিততেন। তিনি প্রথমে গ্রামে যাত্রার প্যান্ডেলের মতো একটি মঞ্চ করতেন। গ্রামের মানুষ সবাই চারদিকে জড়ো হতেন। তিনি গেঞ্জি গায়ে, গলায় গামছা ও মাথায় মাথাইল নিয়ে মঞ্চে অবতীর্ণ হতেন। এসেই বলতেন, 'আমারে চিনছুইন? আমি হামেদ, আপনেগো সন্তান, কিরষকের পোলা। আমারে ভোট দেইন বা না দেইন, তাতে আমার কোনো কথা নাই। তবে একখান সত্য ঘটনা না কইয়া পারতাছি না। কিছুদিন আগে আপনেরার ঋণের টেকা মওকুফ হইছে না?' সমবেত কৃষকের সম্মিলিত কণ্ঠের উল্লাস ধ্বনি :'অইছে অইছে।' এবারে হামেদ মিয়া কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন- কিরষক ভাইয়েরা, এইডা তো কেউ বুঝবার চান নাই। আমি কইলকাতা, দিল্লি ঘুরছি আর সবাইরে বুঝানোর চেষ্টা করছি, ছোটলাট-বড়লাটের হাত-পাও ধরছি, এক কথাই কইছি আমরার কিরষক বাঁচতো না ভাই। কিরষকের মাথায় ঋণের বোঝা, কিরষকের ঘরে দানাপানি নাই, পরনের কাপড় নাই। সেদিন কেউ যহন কিরষকের দুঃখ বুঝলো না, তহন আমি এলকা সেরপাঁচেক চিড়া আর আধা সের গুড় কিন্যা নাও ভাসাইলাম সপ্তডিঙ্গা মধুকর। হেই নাও ভাসাইয়া সাতসমুদ্র তেরো নদী পার হইয়া পৌঁছাইলাম লন্ডনের জিলাত। নাওখান ভিড়াইয়া মাঝিগো কইলাম, কাইল সহালে আবার ফিরা যামু। তুরা খাওয়া-দাওয়া কইরা নিস। সেইহান থিকা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছাইলাম রানীমার (ইংল্যান্ডের রানী) বাড়িত। রানীমার বাড়ির দাওরান আমারে ঢুকতেই দিবো না। আমি বারবার বেগার্তা (অনুরোধ) করতাছি আর কইতাছি, দাওরান ভাই, রানীমারে কইন যে ময়মনসিংহের হামেদ আইছে। দাওরান কতাই হোনে না। হঠাৎ রানীমা গোলমাল হুইনা বাইর অইছুন। রানীমার পরনে একখান সাদা থানের শাড়ি, মুনে অইতাছে মিশির শহরের পরীডা য্যান খাড়াইয়া আছে। দূর থিকাই রানীমা আমারে চিনছুইন। দাওরানরে একটা ধমক দিলেন, দাওরান কেলা তুই চিনস না ময়মনসিংহের হামেদ আইছে। দাওরান তহনি গেট খুইলা দিলো। রানীমা আমারে দেইখ্যাই কইলাইন, হামেদ তর মুখ শুকনা ক্যারে? কয়দিন খাওয়া-দাওয়া করস না। আমি চুপ কইরা আছি। রানীমা তহনি কইলাইন, আগে খাইয়া ল, যা ঐ বরহন্দাজের ঘর থিকা একটা লুঙ্গি আর গামছা নিয়া গোছলডা কইরা ল, তারপর চাইরডা খাবি। কইয়াই ডাকলাইন আরেক বরহন্দাজরে, ঐ তাড়াতাড়ি পুরান বাজারে যা। হামেদের জন্য বাজার কইরা আন। ঐ বরহন্দাজ আমার আগেই চিনাজানা। বাজারের ব্যাগখান নিয়া দিলো একখান দৌড়। আমি তো শানবান্ধাইল পুকুরে ফটিকের লাহান পানিতে অনেকক্ষণ ধইরা গোছল কইরা রানীমার কাছে আইলাম। রানীমা ভাত, তরহারি বাইরা বইসা আইছুন। কাঁসার বড় থালির ওপর চিকন লাল বিরুইয়ের ভাতে ধুয়া উঠতাছে। ছোট ছোট বাটিতে আছে টাকি মাছের ভর্তা, লাউ শাকের ওপর শুকনা মরিচ ভাজা, কালিজিরা ভর্তা, ছোট লাল আলুর ভর্তা, বাতাসি মাছের চচ্চড়ি, শিম ভর্তা, বড় দুইখান কই মাছ ভাজা, আলু কুচি কুচি কইরা ভাজা, ট্যাংরা মাছের শুকনা ঝোল, নারকেলের দুধ দিয়া চিংড়ি মাছ, রামপাবদার ঝোল, তারপর রুই মাছের পেটি। তারপর ওহো খেয়ালই করি নাই কোনায় আবার কাসন্দ, চিতল মাছের পেটি, তারপর মাষকলাইয়ের ডাইল। এতোগুলি খাওন সামনে রাইখা আমি খালি চোখের পানি ফালাইতাছি। রানীমা পাংখা দিয়া বাতাস করতাইছুন আর কইতাছুইন, ক্যারে হামেদ খাস না ক্যারে? হামেদ মিয়া খাচ্ছে না দেখে দর্শকের মধ্যে কোলাহল, কেউ কেউ চিৎকার করে বলে ফেলছে, আরে আগে খাইয়া লইন না। হামেদ মিয়া অশ্রুসজল চোখে বলে ওঠে, রানীমা আমার কিরষক ঋণের জালে আটকা পড়ছে, আমার গলা দিয়া খাওন কেমনে নামবো? রানীমা এইবার কইতাছুন, হামেদ তুই খাছেন আগে। বিহালে দরবার বইবো। দরবারে একটা ফয়ছালা করনই যাইবো। রানীমা কথা দিলাইন তো? রানীমার কথায় আমি খাইতে বইলাম। খাওন শেষ করতে করতে প্রায় বিহাল। খাওন শ্যাষ না করতেই আইলো চমচমের লাহান এক পিঠা। এতো খাওন খাইছি এহনে উঠতেই কষ্ট। কষ্ট, কষ্ট, কষ্ট। বহুকষ্টে উইঠা আবার বরহন্দাজের ঘরত। চোহে ঘুম। কিন্তু না, ঘুমানোর কোনো উপায় নাই। সময় কাটে না। হ্যাষে আইয়া খাড়াইলাম দরবার ঘরের সামনে। সইন্ধ্যাটা পার হইলো। এবার একটা বিড়ি ধরালেন হামিদ মিয়া। সমবেত কৃষকগণ উদ্বিগ্ন, এবারে কী হবে? বিড়িটায় সুখটান দিয়া শুরু করলেন। আমি লুহাইলাম, দেখতাছি এহের পর এক মানুষ আইতাছে সুট-কোট পরা, সব ইংরজ আর ইংরজ। এর মধ্যে দেখলাম তিনজন খালি বাঙালি- গান্ধী সাব, জিন্না সাব, ফজলুল হক সাব। তারা গিয়া বইছুন, আমি দরবারের সামনে আইতেই রানীমা আমারে একটা ইশারা দিলাইন আর আমি গিয়া তেনার পায়ের উপর পইড়া গেলাম। রানীমা কইলেন, ঐ হামেদ আমার পাও ছাড়, পাও ছাড়, তুই তো আমার দরবারডাই নষ্ট কইরা দিলি, পাও ছাড়, ক কী চাস?

আমি তহন ঋণের কথা কইতেই ফজলুল হক সাব শুরু করলেন, তুমারির (তুবরিবাজি) লাহান ইংরাজি। রানীমা তহন কলমখান দাঁতে কামড় দিয়া কইলেন, যাও সব মওকুফ। এরপর ফজলুল হক সাব আমার কাছে আইসা কইলেন, হামেদ তুই একটা বাপের ব্যাটা, তুই পারছস। তারপর এই যে সেই অর্ডার আপনেগো সামনে। একটা কাগজ দেখালেন দর্শকদের। এরপর নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করতেন হামেদ মিয়া। গল্পটি সাজিয়ে দিলেন তারমতো করে। কিন্তু কিছুটা সত্যতাও ছিল, ফজলুল হক সাহেব ঋণ সালিশি বোর্ড করে কৃষকের ঋণ মওকুফ করিয়েছিলেন। সে কৃতিত্বটায় যে তার কত বড় ভূমিকা, সেটি তার অবস্থান থেকেই বর্ণনা করেছেন।

এ ঘটনা অনেক আগের। তারপর অনেক নির্বাচন হয়েছে। বিষয়গুলো এখন আর গল্প বলা বা রসিকতার মধ্যে নেই। একটা নিরাপত্তাহীনতা বরং বিরাজ করে। হাজারো প্রশ্ন মানুষের মধ্যে। এক নম্বর প্রশ্ন, নির্বাচন হবে তো? তারপর ভোট দিতে পারব তো? তারপর ভোটের পরে কী হবে? ইত্যাকার নানা প্রশ্ন শেষ করে আসে, নির্বাচনে যে রক্তারক্তি হবে, তার কী হবে? হাওয়ায় ঘুরছে নানা প্রশ্ন। নমিনেশন নিয়েই ইতিমধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। হামেদ মিয়া আষাঢ়ে গল্প ফেঁদে জিতে গেছেন; কিন্তু এখন আর গল্পের অবকাশ নেই, আছে অ্যাকশন। মোদ্দা কথা, অ্যাকশনের বিনাশ চাই, ভোট নিরাপদে হোক, আমার ভোটটি আমাদের পছন্দের প্রার্থীকে যেন দিতে পারি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও আসুক, যেখানে আমাদের সবার ভূমিকা আছে।

সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব


মন্তব্য যোগ করুণ