একাত্তরের ময়দানে ব্যতিক্রমী সমাবেশ

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৮

একাত্তরের ময়দানে ব্যতিক্রমী সমাবেশ

  ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

রোববার রাজধানী ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ব্যতিক্রমী সমাবেশ প্রত্যক্ষ করল বাংলাদেশ। কওমির দাওরায়ে হাদিস সনদকে মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতি দেওয়ায় বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্মাননা প্রদান করে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ বোর্ড আল হাইয়াতুল উলা লিল জামিয়াতুল কওমিয়া বাংলাদেশ। দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা এসেছেন সমাবেশে। সুশৃঙ্খলভাবে সমাবেশের কাজ পরিচালনা করা হয়েছে। একের পর এক বক্তা যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। মঞ্চে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শফী, মন্ত্রিসভার সদস্যসহ অনেকে। সাড়ে পাঁচ বছর আগে ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে যে তিক্ত অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়েছিল, তা কেউ স্মরণ করিয়ে দেয়নি। বরং নতুন এক অধ্যায়ের সূচনার আমরা সাক্ষী থাকলাম।

আমরা জানি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ধর্ম নির্বিশেষে নারী-পুরুষ সবাই অংশ নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু চেয়েছেন অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালের সংবিধানে চার রাষ্ট্রীয় নীতির অন্যতম ঘোষণা করা হয় ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা চেয়েছি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, যেখানে যে যার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবে। ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার- এটাই ছিল আমাদের মূলমন্ত্র। হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বিদায় হজের বাণীতে বিশ্ব মানবকুলকে সম্বোধন করেছিলেন, কেবল ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের নয়। অসাম্প্রদায়িকতাকে ভিত্তি করে ধার্মিকতার আদর্শ ধারণ করা- এটাই ইসলামের শিক্ষা। এক ধর্মের অনুসারীদের প্রতি অন্য ধর্মের অনুসারীদের শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে, সহনশীল হতে হবে। প্রকৃত ইসলাম সর্বদা বলে, সম্প্রদায়কে নয় বরং ধর্মকে প্রাধান্য দিতে হবে। যারা নষ্ট চরিত্রের, তারা ইসলাম ধর্মের এই সৌন্দর্য থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। তারা সহিংসতার উস্কানি দেয়, জঙ্গি-সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উৎসাহ জোগায়। এ ধরনের দুষ্ট প্রকৃতির মানুষ বাংলাদেশে আছে, বিশ্বের আরও অনেক দেশে আছে। তারা ধর্মের নামে সন্ত্রাস লালন করে। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সমবেতদের একটি অংশেরও তেমন অভিলাষ ছিল। সেখানে অপশক্তির প্রভাব ছিল স্পষ্ট। ইসলাম ধর্মকে তারা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছিল। কিন্তু উপস্থিত সবাই এর সমর্থক ছিল না। তবে অনেককে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হয়েছিল। গুজব রটানো হয়েছিল। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রতিটি মানুষ চেয়েছে, এই বিভ্রান্তির চোরাবালিতে ধর্মপ্রাণ কেউ যেন আটকা না পড়ে। মাওলানা আহমদ শফী সাহেব সে চেষ্টা আন্তরিকভাবে করে গেছেন। তিনি সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য স্থাপনে যত্নবান। যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' অবিনাশী উচ্চারণ করেছিলেন, সেখানেই তার সভাপতিত্বে সমবেত হয়ে নবযাত্রার দৃঢ়সংকল্প ঘোষণা করা হলো।

আমি হাটহাজারীর মাদ্রাসায় বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্রদের সংবর্ধনায় উপস্থিত ছিলাম। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন সংগ্রাম ও ত্যাগের কথা বলি। বাংলাদেশে তিনিই যে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠান করেন, ইসলামী সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের পেছনে প্রধান ভূমিকা যে তারই ছিল, সেসব অনেকেই জানতেন না। তিনি মদের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। জুয়া খেলা নিষিদ্ধ করেছিলেন। তাদের এসব কথা বলি। ৩০ লাখ নারী-পুরুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মদান করেছে, নারীরা নিগৃহীত হয়েছে, পাকিস্তানি সৈন্যদের গণহত্যায় এ দেশের কিছু লোক সহায়তা দিয়েছে- এসবও তাদের খুব একটা জানা নেই। এর পেছনে দুষ্টচক্রের কারসাজি ছিল। কুখ্যাত আলবদর ও রাজাকার বাহিনীর মূল শক্তি ছিল গোলাম আযম-মতিউর রহমান নিজামীর দল জামায়াতে ইসলামী। তারা স্বাধীনতার পরও রগ কাটার রাজনীতি করেছে। ধর্মের নামে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চেয়েছে। দুর্ভাগ্য, স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের অপকর্ম চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি গণহত্যায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগী মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদকে মন্ত্রিসভায় স্থান করে দেওয়া হয়েছিল। তারা এখনও রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে ধর্মীয় চরমপন্থিদের অপতৎপরতা সম্পর্কে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষভাবে সক্রিয় হতে বলেছেন আলেম-ওলামাদের। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এই অপশক্তির বিরুদ্ধে এক জোট থাকলে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি শক্ত জমিন পাবেই। আমার ধারণা, রোববারের সমাবেশ বাংলাদেশের রাজনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ধর্মপ্রাণ মানুষরা আধুনিক বাংলাদেশ গঠনের সংগ্রামে দলে দলে এগিয়ে আসুক, এটা সময়ের দাবি।

উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ