শোকরানা মাহফিল কৃতজ্ঞতার নজির

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৮

শোকরানা মাহফিল কৃতজ্ঞতার নজির

  ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তরের স্বীকৃতি দিয়ে আইন পাস করায় রোববারের রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শোকরানা মাহফিল দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। দেশের কর্ণধার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ মাহফিলের প্রধান অতিথি হিসেবে ইতিবাচক ও আন্তরিক কথা বলেছেন। এ বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার সনদের স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয় সংসদে আইন পাস হয়। কওমি মাদ্রাসাগুলোর সর্বোচ্চ সংস্থা 'হাইয়াতুল উলা লিল জামিয়াতুল কওমিয়া বাংলাদেশ'-এর চেয়ারম্যান ও হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সভাপতিত্বে এ মাহফিলে দেশের আলেম-ওলামারা অংশ নেন।

কওমি মাদ্রাসার যে স্বীকৃতি আজ আমরা দেখেছি, তার সূচনা বলা চলে বঙ্গবন্ধুই করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংক্ষিপ্ত ক্ষমতাকালে (১৯৭২-৭৫) ইসলামের সম্প্র্রসারণ, ইসলামী মূল্যবোধের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন, তা সমকালীন মুসলিম বিশ্বে বিরল দৃষ্টান্ত। তিনি শাশ্বত ও কল্যাণময় শান্তির ধর্ম ইসলামের সঠিক রূপ সমাজ ও জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ধর্মীয় অনুভূতি ও চিন্তা-চেতনার অবাধ বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের অবমূল্যায়ন নিরসনকল্পে তৎকালীন 'বায়তুল মোকাররম সোসাইটি' ও 'ইসলামিক একাডেমি'কে একীভূত করে বৃহত্তর পরিসরে ১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ 'ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ' প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও ভাষাসংগ্রামী মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ (১৯০০-১৯৮৬) এবং প্রথম সেক্রেটারি ছিলেন আব্দুল কুদ্দুস। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন করেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশে ইসলামকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য বঙ্গবন্ধু অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় আজ তারই সুযোগ্য কন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনা পরম মমতাভরে দেশের বিজ্ঞ ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় আলেমদের একই কাতারে নিয়ে আসতে পেরেছেন। বিশেষ করে দেশের কওমি ঘরানার আলেমরা আজ প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কীভাবে দেশের ধর্মীয় অঙ্গনের এই শীর্ষ ব্যক্তিবর্গকে সন্তুষ্ট রেখে সমাজের মূলধারার সঙ্গে একীভূত করা যায়, তারই অনবদ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

দ্বীনি এলেম ও আমলের সমন্বয় ঘটিয়ে আবহমানকাল থেকেই এ অঞ্চলে দারসে নেজামি তথা কওমি ধারার সংশ্নিষ্ট আলেম ও কর্তৃপক্ষ অনেকটা অবজ্ঞা-অবহেলা আর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে থেকেই স্বকীয়তা বজায় রেখে শিক্ষা ও জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করে আসছেন। সমাজের একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন এই কওমি ধারার কর্তৃপক্ষ। দাওরায়ে হাদিসের সনদকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমান দেওয়ার মাধ্যমে অবশেষে তাদের সুদীর্ঘ দিনের প্রত্যাশার সফল বাস্তবায়ন ঘটেছে। এ জন্য বর্তমান সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী অশেষ প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। মূলত তার দূরদর্শী চিন্তা, মমতাময়ী দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক দর্শনের ফলেই সমাজের এই বিরাট অংশটি দীর্ঘদিনের অবজ্ঞা-অবহেলার আঁধার ভেদ করে নতুন সূর্যালোকে প্রবেশ করেছে এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূলধারার সঙ্গেও একীভূত হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ লাভ করেছে।

জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিষয়টি কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক নয়; বরং আমাদের বিশ্বাসমতে, সব জ্ঞানই হচ্ছে খোদা প্রদত্ত এবং তা সার্বজনীন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বিচরণ রয়েছে; কিন্তু মাদ্রাসাতে তা নেই বা কওমি ধারায় জ্ঞান-প্রজ্ঞার অনুপস্থিত- এমন ধারণা অবান্তর। সব ধরনের জ্ঞান সবার কাছে বা সব প্রতিষ্ঠানে থাকে না বা থাকবে না; কোনো বিষয়ে জ্ঞানের মাত্রা সবার কাছে সমানও হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় হোক, সরকারি মাদ্রাসা হোক আর কওমি ধারার প্রতিষ্ঠান হোক- এসবই হচ্ছে বিশেষায়িত জ্ঞানের কেন্দ্র। কওমি ধারায় পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বিশুদ্ধ জ্ঞানের শিক্ষাদান ও অনুশীলনের কাজটি অতীব গুরুত্বের সঙ্গে সম্পন্ন হয়ে আসছে। তাই এ ধারায় ইসলামের মৌলিক বিষয়ে আলেম, পণ্ডিত ও গবেষক সৃষ্টি হবে- এটিই স্বাভাবিক।

কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি প্রদানের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্নিষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু প্রয়োজনীয় সংস্কার অত্যাবশ্যক। সময়ের চাহিদা পরিপূরণ এবং সংশ্নিষ্ট শিক্ষার্থী ও কর্তৃপক্ষের স্বার্থেই এ ধারার সামগ্রিক সিলেবাস, কারিকুলাম ও শিক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন-পরিবর্ধন, সংযোজন-বিয়োজন প্রয়োজন। পাশাপাশি সনদের সরকারি স্বীকৃতি ও আইনের অনুমোদনসহ এ সংক্রান্ত কার্যক্রমে যেন ফাঁকফোকর বা গোঁজামিলের কোনো বিষয় না থাকে, সেটিই আমাদের কাম্য। এটি স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, কোনো বোর্ড স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদানে সমর্থ নয়। সে জন্য এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয় অপরিহার্য। নয়তো এ সনদের স্বীকৃতি ও সনদের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। তাই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় অথবা নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সুবিধা অনুযায়ী অন্য যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এ সনদ প্রদান করলে এটি বাস্তবসম্মত ও মানসমৃদ্ধ হবে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যুৎপন্নমতি সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য নীতিনির্ধারকের সদিচ্ছার বিষয়টি বাঙালি জাতি-রাষ্ট্রের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে। অন্যদিকে, কওমি কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের এই অবদানকে স্বীকৃতি প্রদান করে যে শোকরানা সমাবেশের আয়োজন করেছে, তা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। স্বাধীনতার মহান স্মৃতিবিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সারাদেশ থেকে আগত কওমি শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ অজস্র আলেমের স্বতঃস্ম্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও গগনবিদারী আওয়াজে মহান আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি হৃদয় নিংড়ানো কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার যে নজির তারা প্রদর্শন করেছেন, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টি হয়ে থাকবে।

দেশের আপামর জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনমানে কওমি ধারার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আলেম, ফকিহ, ইমাম, মুফতি ও এসব প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের যে বিরাট প্রভাব রয়েছে, সেই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে বিবেচনা করলে কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতিকে বর্তমান সরকারের এক যুগোপযোগী পদক্ষেপ ও প্রজ্ঞাময় সিদ্ধান্ত হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। নিঃসন্দেহে এটি সরকারের এক সাফল্যের পালক হয়েই থাকবে, আমরা সেই প্রত্যাশা করি। তাই রাষ্ট্রের সব শ্রেণির মানুষকে অনুরোধ করব, কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি ও অবহেলিত কওমি ধারার মূল্যায়নের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে এই বিরাট অংশের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও অবদান রাখার সুযোগ করে দিন।

অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব পারসিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ