হেফাজত ও আওয়ামী লীগ :প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শোকরানা সমাবেশে উপস্থিত আলেম-ওলামাদের একাংশ

  লীনা পারভীন

বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা দলটির নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যে দলটির নেতৃত্বে এই মুহূর্তে আছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমরা সবাই জানি, তিনি এখন বিশ্বদরবারে পরিচিতই নন কেবল, একজন অনুকরণীয় নেতাও বটে। তার রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা এই মুহূর্তে বাংলাদেশ, বিভুঁইয়ে বিদেশেও প্রসারিত। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে যিনি পেয়েছেন 'মাদার অব হিউম্যানিটি' খেতাব। আমরা উচ্ছ্বসিত হয়েছি, আপল্গুত হয়েছি আমাদের নেতার এমন বিশ্বস্বীকৃতিতে। একই নেতা আজকে আবারও ভূষিত হলেন 'কওমি জননী' হিসেবে। হতেই পারেন। তার প্রতি ভালোবাসা থেকে অনেকেই অনেক কিছু খ্যাত করলে তাতে কোনো সমস্যা নেই; কিন্তু প্রশ্ন থাকে, তিনি কেন একটি বিশেষ গোষ্ঠীর জননী হতে যাবেন? হলে তো তিনি গোটা বাঙালির জননী হবেন।

আজ ছিল অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জেএসসি পরীক্ষা। প্রজ্ঞাপনে জানানো হলো, অনিবার্য কারণবশত পরীক্ষা পেছানো হলো। কী সেই অনিবার্য কারণ? দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমরা কেউই সেটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জানতে পারলাম না। কেন? শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন প্রকাশ করতে পারল না যে, হেফাজতের শোকরানা সমাবেশ উপলক্ষে পরীক্ষা পেছানো হচ্ছে? ভয় বা লজ্জা? কাকে ভয়, কিসের লজ্জা? মুষ্টিমেয় কিছু লোকের সমাবেশের জন্য কেন পরীক্ষা পেছানো হবে? মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সমাবেশে আনার জন্য কি? কিন্তু অষ্টম শ্রেণিতে পড়া কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা তো ভোটার না। তাহলে কেন পরীক্ষা পেছানো লাগল? হেফাজতের সমাবেশে এর আগেও আমরা দেখেছি উপস্থিত জনতার ৯০ ভাগ ছিল মাদ্রাসার ছাত্র, যারা এখনও রাজনীতির কিছুই বুঝে না।

তাহলে জননী কাদের স্বার্থকে সামনে রেখে ২৬ লাখ ৭০ হাজার শিক্ষার্থীকে এমন শিক্ষা দেওয়া হলো? উত্তর জানা নেই। সংবর্ধনা দেওয়ায় কোনো সমস্যা নেই। যে কেউই দিতে পারেন; কিন্তু সেটাও কেন এমন পরীক্ষা স্থগিত রেখে? কেন শুক্রবার বা যে কোনো বন্ধের দিনে করা গেল না? আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কি এই বিষয়টি করতে পারত না? হয়তো করতে পারত; কিন্তু করেনি। সামনে নির্বাচন। নির্বাচনের হিসাবের কাছে অনেক কিছুই গোনায় আসে না আমাদের এই দেশে। নির্বাচনের কথাও যদি ধরে নিই, তাহলে ইতিহাস কী বলে? অতীতে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনের পরিসংখ্যান কী সাক্ষ্য দেয়? হেফাজতের কাণ্ডের কথা এখনও আমাদের সবার স্মৃতিতে তাজা।

আমাদের দেশের প্রগতিশীল ধারাটি বরাবরই এক ধারার শিক্ষার জন্য লড়াই করে আসছে। বহুধা বিভক্ত সেই ধারার মধ্যে একটি ধারা হচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষা, যাদের সিলেবাস তৈরি হয় নিজেদের মতো করে, সেখানে জাতীয় পতাকা ওড়ে না, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না। বাংলাদেশের ইতিহাস যেখানে অবহেলিত, সেখানকার মানুষগুলো বেড়ে ওঠে বাংলা ও বাংলাদেশকে বাইরে রেখে। এমন অবস্থায় রাষ্ট্র কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমান মর্যাদায় স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এই যে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে তারপরের ফলোআপ কী? তারা কি তাদের সিলেবাস পরিবর্তনের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে? সেখানে কি মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষ গড়ে তোলার জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? নাকি কেবল প্রধানমন্ত্রীকে জননী বলে নিজেদের দল ভারী করার পরিকল্পনা করা হয়েছে?

আওয়ামী লীগের কাছে আমাদের মতো সাধারণ জনগণ যারা আর কিছুই চাই না, কেবল একটি অসাম্প্রদায়িক ও উন্নত চিন্তার বাংলাদেশ চাই, যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় এগিয়ে যাবে আমার সন্তানরা। আমরা চাই, আজকের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এগিয়ে যাক এই পরিবর্তিত বাংলাদেশ। কিন্তু সেই ভরসায় কোথায় যেন আশঙ্কার বলিরেখা দেখা দিল।

শোকরানা সমাবেশ থেকে দাবি উঠেছে আলল্গামা শফীকে স্বাধীনতার পদক দেওয়ার। প্রধানমন্ত্রী যিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা, যিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে আমাদের কাছে বেঁচে আছেন, তিনি বসা থাকা অবস্থায় কেমন করে এই দাবি করার সাহস দেখাতে পারে, ভেবে পাই না। স্বাধীনতা পদক কী এবং কাদেরকে দেওয়া হয়? মাওলানা শফীর ভূমিকা কবে কোথায় কী ছিল? স্বাধীনতা পদক আমাদের রাষ্ট্রীয় পদকের সবচেয়ে বড় একটি পদক। এমন একটি পদকের দাবি যখন মাওলানা শফীর জন্য করা হয়, তখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কতটা অসম্মান করা হয়, সেটাও কি একবার ভেবে দেখবেন মানবতার জননী? ভোটের হিসাবের কাছে কি পদকও ছোট হয়ে যেতে পারে? একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি এই প্রশ্নটি রাখতেই চাই। মানবতার জননী কেমন করে একটি ধর্মীয় ভাবাদর্শের দলের জননী হতে পারেন, যারা এই বাংলাদেশটাকেই স্বীকার করে না? স্বাধীনতার পদক কেমন করে চাইতে পারে, যারা এই দেশের স্বাধীনতায় কোনো ভূমিকা রাখেনি বরং উল্টো ভূমিকাতেও পাওয়া যায়?

হ্যাঁ, হয়তো যুক্তির খাতিরে ধরে নিলাম, শেখ হাসিনা একটি বিভ্রান্ত দলকে লাইনে আনতে চাইছেন। নারী নেতৃত্বকে অস্বীকার করা দলকে দিয়ে নারী নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য করেছেন; কিন্তু এই প্রাপ্তি কি শেষ প্রাপ্তি? এতে দেশের কী প্রাপ্তি হবে? ক্ষমতায় আসার জন্য এই প্রাপ্তি কি খুব বেশি কিছু? হেফাজত কয়টা ভোটের নিশ্চয়তা দিয়েছে, সেটুকু কি জানতে পারি আমরা? কয়জনকে বাংলাদেশের ইতিহাস জানতে দেবে তারা? কয়জনকে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে বাধ্য করবে? জননী হিসেবে আপনারও তো কিছু দাবি থাকা উচিত। তাই নয় কি?

কলাম লেখক


মন্তব্য যোগ করুণ