বিচিত্র রাজনীতি...

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৮

  আনোয়ার হোসেন

একের পর এক ঘটনা সর্বদা ঘটে চলে বাংলাদেশে, যা চাপা দেয় আগের এমনকি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর বিবেচিত ঘটনাও। খালেদা জিয়াকে দ্বিতীয় একটি দুর্নীতির মামলায় সাজা দেওয়া হলো। তার সাজা হয়েছে সাত বছর। এ ঘটনা নিয়ে সব মহলে আলোচনা চলবে, সেটাই স্বাভাবিক। তিনি নির্বাচন করতে পারবেন কি-না, সে প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসার কথা। কিন্তু মামলার রায় হলো দুপুরে, সন্ধ্যায় জানা গেল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপে বসার জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। মোক্ষম রাজনৈতিক কৌশল প্রধানমন্ত্রীর, সন্দেহ নেই। পরদিন সর্বোচ্চ আদালতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে একটি মামলায় ১০ বছর সাজা দেওয়া হলো, যে মামলায় এর আগে নিম্ন আদালতে সাজা হয়েছিল পাঁচ বছর। বাংলাদেশে এমন নজির খুব একটা নেই।

এ ধরনের দণ্ডের পর বিএনপি গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সংলাপে বসবে কি-না সে শঙ্কা তৈরি হয়। গণভবনের এ সংলাপে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সবাইকে খাওয়াবেন, সেটাও বলা হয়। কিন্তু দলের প্রধান নেতাকে যে সরকারের আমলে কারাদণ্ড দেওয়া হয়, তার প্রধানের আহ্বানে খেতে বসার বিষয়টিকে সবাই কীভাবে মেনে নেবে, সে প্রশ্ন উঠতে থাকে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এক নেতা মিডিয়াকে জানিয়ে দেন- সংলাপে বসব, তবে খাব না। কিন্তু দেখা গেল, যে দলের নেতা বন্দি সেই দলের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনাকালে পরিবেশিত খাবার গ্রহণ করছেন। তাদের মনে হয়েছে, এটা বাঙালির চিরায়ত আতিথেয়তার অংশ। দু-একজন অবশ্য ধরি মাছ না ছুঁই পানি- এমন আচরণ করেছেন। তবে সংলাপের পরিবেশ ছিল চমৎকার- এটা সবাই বলেছেন।

সংলাপ নিয়ে কয়েকদিন আলোচনা চলবে, টক শোতে অন্য কোনো বিষয় প্রাধান্য পাবে না- এটা বলা হতে থাকে। কিন্তু ফের বড় ঘটনা- হেফাজতে ইসলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘটা করে সংবর্ধনা দিল। যদিও এর নাম দেওয়া হয়েছে শোকরানা মাহফিল। ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করে বাংলাদেশে, তাদের অনেকের কাছেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান খুব পছন্দের স্থান নয়। সেখানে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের জনগণকে প্রস্তুত হতে বলেছিলেন। এখানেই ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসসমর্পণ করেছিল। এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই এখন রয়েছে স্বাধীনতা স্তম্ভ, যা স্বাধীনতাবিরোধীদের একেবারেই পছন্দের কিছু নয়। সেখানে ৪ নভেম্বর যারা সমবেত হয়েছিলেন তাদের অনেকে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে সমবেত হয়েছিলেন। সেখানে দিনভর চলে উস্কানিমূলক বক্তৃতা। ঘটনার খবর সংগ্রহ করতে গেলে নারী সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করা হয়। অথচ গতকাল রোববার দেখা গেল, প্রধানমন্ত্রী যখন মঞ্চে উঠছেন তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তার নিরাপত্তা বাহিনীর এক নারী সদস্য। কেউ তাতে আপত্তি করেনি। ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে খাবার-পানি ইত্যাদি নিয়ে হাজির হতে দলীয় কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি চেয়েছিলেন, শেখ হাসিনার সরকার ফেলে দিতে এ সমাবেশকে ব্যবহার করবেন। এ ঘটনার পর সাড়ে পাঁচ বছর ধরে শেখ হাসিনা ক্ষমতায়। তিনিই হেফাজতে ইসলামের রোববারের সমাবেশ নির্বিঘ্ন করার জন্য যাবতীয় আয়োজন করলেন। খালেদা জিয়া এখন বন্দি। তবে তাকে রাখা হয়েছে হাসপাতালে, যার অবস্থান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে। তিনি কি মাইকের আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন, যেখানে তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে 'কওমি জননী' উপাধি দেওয়া হয়েছে?


মন্তব্য যোগ করুণ