বরফ গলতে শুরু করেছে

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০১৮

বরফ গলতে শুরু করেছে

  ডা. জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সংলাপ সহৃদয় পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য বিএনপিসহ আরও কয়েকটি দল অনেক দিন ধরেই সরকারের কাছে অনুরোধ কিংবা দাবি জানিয়ে আসছিল। রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরেও সব পক্ষের প্রতি আলোচনায় বসার তাগিদ ছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে যারাই মুখ খুলেছেন, তারা বলেছেন সংলাপের কথা। কিন্তু সরকারের দিক থেকে সাড়া মিলছিল না। বরং সংলাপ কী কারণে হওয়া উচিত নয়, সেটাই ক্ষমতাসীনদের তরফে আমরা বারবার শুনেছি। কিন্তু জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে সংলাপে বসার জন্য চিঠি দিতেই তাৎক্ষণিক সাড়া মেলে। প্রধানমন্ত্রী চিঠি দিয়ে ১ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় সংলাপে বসার জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের আমন্ত্রণ জানান। ঐক্যফ্রন্ট নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে প্রতিনিধি দলের নাম প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকেও জানানো হয়, তারা ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের নিয়েই ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। এ জোটের পক্ষে কে কে সংলাপে অংশ নেবেন, সেটাও সংবাদপত্র ও টেলিভিশন-বেতারে প্রচার হয়ে যায়।

১ নভেম্বর নির্ধারিত সময়ের কিছু আগেই ঐক্যফ্রন্ট নেতারা গণভবনে পৌঁছে যান। আমরা দেখেছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূর্ণ আন্তরিকতা নিয়েই আমাদের স্বাগত জানিয়েছেন। এভাবে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবৎ কথা না বলার যে দেয়াল গড়ে উঠেছিল, তা কিঞ্চিৎ হলেও অপসারিত হয়েছে বলে আমি মনে করি। বলা যায়, বরফ গলতে শুরু করেছে।

প্রধানমন্ত্রী যেন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসেন- সে দাবি আমাদের ছিল। আলোচনার সময় খাবার তালিকায় কী থাকবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। সংবাদপত্রে দেখেছি, কত পদের খাবার থাকবে সেটা নিয়ে লেখা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আলোচনা চলেছে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। আলোচনার মধ্যেই খাবার পরিবেশন করা হয়। খেতে খেতেই কথা হয়েছে। এর মধ্যে কোনো চালাকি ছিল না। এটাকে আমরা বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হিসেবেই ধরে নেব। শহর কিংবা গ্রাম, স্বল্প আয়ের কিংবা ধনবান; যে কোনো পরিবারে কেউ যখনই যায়, সাধ্যমতো আপ্যায়ন করা হয়। কারও বাড়ি গিয়ে এমনকি অফিসে গিয়ে খালি মুখে ফিরে আসার ঘটনা একেবারেই বিরল। খাবার বিরতি না থাকায় সময়ের অপচয় হয়নি।

আলোচনার প্রথম দিকে ড. কামাল হোসেন সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির করণীয় নিয়ে অপূর্ব বক্তৃতা করেন। তার বক্তব্যে জাতির প্রত্যাশা, মর্মকথা ফুটে উঠেছে। এতে যুক্তি যেমন ছিল, তেমনি প্রকাশ ঘটেছে আবেগের। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। নির্বাচনের জন্য সুষ্ঠুু পরিবেশ সৃষ্টিতে এর বিকল্প নেই। তিনি এর যৌক্তিকতা মেনে নিয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে আর কত হামলা-মামলা? সরকারের সমালোচনা করতে দিতে হবে। সব সমালোচনা যে যৌক্তিক- সেটা বলা যাবে না। কিন্তু সমালোচনা শুনতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বাধা থাকবে না। এ জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিকে নির্দেশও দিয়েছেন। এটা লিখিতভাবে করা হয়েছে কি-না, জানা নেই। তেমন নির্দেশ যাওয়া দরকার। কোনো অজুহাতে এর যেন ব্যত্যয় না ঘটে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সংলাপের এটাকেই বড় অর্জন বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে কথা হয়েছে। সেনাবাহিনী মোতায়েন নিয়ে কথা হয়েছে। সেনাবাহিনীকে নির্বাচনকালে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদানের ব্যাপারে তার আপত্তি রয়েছে। তবে আমরা জানি, র‌্যাব যখন ভেজালবিরোধী অভিযান চালায়, তখন তাদের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট থাকেন। নির্বাচনের সময়েও এ ধরনের সমন্বয়ের কথা ভাবা যায়। সংলাপে বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি তোলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এবং তার ১৪ দলীয় জোটের নেতাদের পক্ষ থেকে কিছু বিষয়ে সংবিধানের বাধ্যবাধ্যকতার কথা বলা হয়েছে। আমি বলেছি, এসব নিয়ে ড. আসিফ নজরুল ও শাহ্‌দীন মালিক কাজ করতে পারেন। ১৪ দল থেকেও কাউকে কাউকে এ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। সবাই এক টেবিলে বসলে সমাধান-সূত্র মিলবেই। নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষক উপস্থিত থাকার প্রসঙ্গ এসেছে। দেশি পর্যবেক্ষকরাও থাকবেন। গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন বিষয়ে তাদের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

আমরা ছাত্রদের কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলনের সময় যেসব মামলা হয়েছে, তা প্রত্যাহারের দাবি করেছি। খ্যাতিমান আলোকচিত্র শিল্পী শহিদুল আলমের জামিন চেয়েছি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের জামিনে মুক্তি দাবি করেছি। তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলতেই পারে। দোষী প্রমাণ হলে শাস্তি হবে। কিন্তু এ সময়ে জামিনে থাকতে কোনো বাধা নেই।

আলোচনার এক পর্যায়ে আমি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে জমি বরাদ্দ করেছিলেন, সে জন্য পুনরায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ক্যান্সার হাসপাতালের জন্য ১৪ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছেন। তবে তা এখনও হস্তান্তর করা হয়নি।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা


মন্তব্য যোগ করুণ