শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলি, কাণ্ডারি হুঁশিয়ার

কালের আয়নায়

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮

শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলি, কাণ্ডারি হুঁশিয়ার

  আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

আমার একটা আশা ছিল, আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে তাদের বর্তমান এমপিদের অন্তত অর্ধেককে মনোনয়ন দেবে না। নতুন প্রজন্মের নতুন মুখদের আধিক্য দেখব মনোনয়নপ্রাপ্তদের মধ্যে। আমার সে আশা পূর্ণ হয়নি। অবশ্য বিএনপি-জামায়াত জোটের মনোনয়নেও (এখনও চূড়ান্ত হয়নি দুই জোটের মনোনয়নই) সেই থোড় বড়ি খাড়া। যুগ বদলেছে, রাজনীতি বদলেছে, তার ছাপ নেই কোনো জোটের মনোনয়ন দানে বা প্রার্থী বাছাইয়ে। অর্থাৎ অতীতের রাজনৈতিক গোলকধাঁধা থেকে দেশটা বেরিয়ে আসতে পারল না। তাতে কিছুটা আশা ভঙ্গ হয়েছে; কিন্তু নিরাশ হইনি।

আমার আরেকটা ধারণা ছিল, ড. কামাল হোসেন যখন এই বৃদ্ধ বয়সে হাঁটুর ব্যথা নিয়ে নির্বাচনী রণাঙ্গনে নেমেছেন, তখন সম্ভবত শেষবারের মতো যুদ্ধের মাঠে নেমে নির্বাচনে নিজেও অংশ নিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করবেন। অতীতে তিনি কোনো নির্বাচনে জয়ী হননি। এবারও গণফোরামের নেতা হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তার জেতার আশা আছে, মনে করি না। কিন্তু এখন তার পেছনে বিএনপি ও জামায়াত। তাদের ভোট পেলে এবার দলীয়ভাবে না হলেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে জয়ী হতে পারতেন বলে অনেকের ধারণা।

তারপরও তিনি বয়সাধিক্যের দোহাই পেড়ে নির্বাচনে নিজে প্রার্থী না হওয়ার ঘোষণা দিলেন কেন? অনেকের ধারণা, অতীতের ভয় তার মনে কাজ করছে। আমার ধারণা, অতীতের ভয় আগের মতো তার মনে নেই। ঐক্যফ্রন্ট গঠন করার পর প্রচার-প্রপাগান্ডার দিক থেকে তিনি তো জিরো থেকে হিরো। রোজই মিডিয়ায় তার ছবি ছাপা হয়, বিদেশি কূটনীতিকরা তার বাড়িতে যাচ্ছেন। তারপরও তিনি নির্বাচনী যুদ্ধে সেনাপতি হওয়ার সাহস দেখাবেন অথচ নির্বাচনে প্রার্থী হতে ভয় পাবেন, তার কারণটা কী?

আমার সন্দেহ, ড. কামাল এখন যতই দিন যাচ্ছে, ততই বুঝতে পারছেন, নেতৃত্বহীন বিএনপি-জামায়াত এখন উপায় নেই দেখে তাকে নেতা সাজিয়ে মাথায় তুলে নাচছে বটে; কিন্তু তারা তাকে ভোট দিয়ে জয়ী করবে না। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আগে যেমন ডা. বদরুদ্দোজার কদর ছিল, গঠনের পর আর নেই; অনুরূপভাবে নির্বাচনের আগে ড. কামালেরও ফ্রন্টে কদর থাকবে অনেক বেশি। কিন্তু ফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে এই কদর আর থাকবে না। নেপথ্য থেকে তারেক রহমান বেরিয়ে আসবেন। বানরের পিঠা ভাগের গল্পের বিড়ালের অবস্থা হবে ড. কামালের। এ জন্য ড. কামালকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য এখন বিএনপি-জামায়াত উৎসাহ দেবে। কিন্তু তাকে ব্যালটে সমর্থন দেবে না। তারা চাইবে না, ঐক্যফ্রন্ট যদি নির্বাচনে জয়ী হয়, তা হলে সংসদে নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য তারেকের প্রতিদ্বন্দ্বী আর কেউ নির্বাচিত হয়ে আসুক। ড. কামাল সম্ভবত এই সূত্রটি জেনেছেন অথবা বুঝে ফেলেছেন।

ভালোয় ভালোয় যদি সব জোটেরই নির্বাচন প্রস্তুতি এবং প্রার্থী মনোনয়ন দান শেষ হয়, তারপরও নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে, এমন আশা ষোলোআনা করতে পারছি না। তারেক রহমান বলেছেন, 'নির্বাচনের দিন প্রতিটি ভোটকেন্দ্রকে তারা রণাঙ্গনে পরিণত করবেন।' হুমকিটিকে তাচ্ছিল্যভরে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তারেক রহমান যদি নির্বাচন চলাকালে আঁচ করেন, তাদের ফ্রন্ট বা জোটের জয় হচ্ছে না, তাহলে সবগুলোতে না হলেও অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে সন্ত্রাস সৃষ্টির দ্বারা নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করবেন, এ আশঙ্কা পুরোপুরি আছে।

লন্ডনের বাজারে গুজব, তারেক পাকিস্তানের আইএসআইয়ের কর্তাদের সঙ্গে লন্ডনে গোপন বৈঠক করছেন এবং মৌলবাদী সন্ত্রাসী গ্রুপের কোনো কোনোটির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। আমেরিকার এফবিআই গোয়েন্দা সংস্থা নাকি ব্রিটেনে তারেক রহমানের ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছে। এসব খবর কতটা সত্য, তা জানি না। তবে তারেক রহমান, যাকে বলা হয় 'লাইক ফাদার লাইক সান', তিনি লন্ডনে বসে ধর্মশাস্ত্র পাঠ করছেন- এ কথা ভাবলে ভয়ানক ভুল করা হবে। বাংলাদেশ সরকারের উচিত ব্রিটিশ সরকারকে অনুরোধ জানানো, তারেক রহমানের গতিবিধি ও কার্যকলাপের ওপর কঠোর দৃষ্টি রাখার; যাতে লন্ডনে বসে কোনো ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনায় তিনি সফল হতে না পারেন।

ড. কামাল, কাদের সিদ্দিকী, রব, মান্না প্রমুখ বাতিল রেসের ঘোড়ারা নির্বাচনের রেসের মাঠে আওয়ামী লীগের জন্য কোনো চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারবে, তা মনে করি না। বিশ্বরাজনীতিতে, বিশেষ করে উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে যে পরিবর্তন ঘটেছে

এবং বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় শ্রেণিচরিত্রের ও তার অবস্থানের যে বিরাট বদল ঘটেছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তার সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে নিজেকেও বদলাতে

পেরেছে। আওয়ামী লীগ এখন আর নিম্নমধবিত্তের আদর্শবাদী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দল নয়, বরং একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দল।

বর্তমান নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দানেও আওয়ামী লীগের এই চরিত্রের আভাস পাওয়া গেছে। এই চরিত্রের জোরে সিভিল মিলিটারি বুরোক্রেসিতেও আওয়ামী লীগের সমর্থন বিস্তৃত হয়েছে। আগে যেটা বিএনপির একচেটিয়া কর্তৃত্বে ছিল। অন্যদিকে শেখ হাসিনার কুশলী নেতৃত্ব বিএনপির মতো ধর্মীয় রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণ দ্বারা নয়, আপস দ্বারা নিজেদের একটা অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। পশ্চিমা শক্তির কাছেও আওয়ামী লীগ এখন আর অচ্ছুত নয়।

ফলে ২০০১ সালের মতো আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বাংলাদেশে নেই এবং তাতে বিএনপিরও কোনো শক্ত ও প্রতিযোগিতাবিহীন অবস্থান নেই। তার ওপর বিএনপি-জামায়াত জোট এখন নেতৃত্বহীন। এই অবস্থায় ড. কামাল হোসেনের মতো প্রায় অবসরভোগী নেতাকে সাময়িকভাবে নেতা হিসেবে 'হায়ার' করে এনে বিএনপি-জামায়াত জোট বা তাদের ঐক্যফ্রন্ট কতটা সুবিধা করতে পারবে, সে সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটানো দূরের কথা; বিএনপি-জামায়াত জোট এবারের নির্বাচনের দাবা খেলায় তাদের ঘোড়া সামলাতে পারবে বলে অনেকের মতো আমিও ধারণা করি না।

আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের (চূড়ান্ত নয়) তালিকায় আমি নতুন মুখ কম দেখতে পাওয়ায় একটু হতাশ হয়েছি বৈকি; কিন্তু আমার বিশ্বাস, রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতার কারণেই শেখ হাসিনা প্রার্থী বাছাইয়ে বড় রকমের পরিবর্তন আনেননি। প্রতিপক্ষ যে রণনীতি গ্রহণ করেছে, তিনিও সেই রণনীতি পাল্টা অস্ত্র হিসবে গ্রহণ করেছেন। হয়তো তাতে তিনি সফল হবেন। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সব বাধা অতিক্রম করে আমি আওয়ামী লীগের জয়ের সম্ভাবনাই দেখছি। এই জয় বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক অগ্রগতির জন্য এখন আরও বেশি প্রয়োজন।

নির্বাচন যখন একেবারেই দোরগোড়ায়, তখন আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী জোটের জন্য

বিএনপি-জামায়াত জোট কিংবা তাতে ড. কামাল হোসেন ও রব-মান্নাদের নেতৃত্ব আমি কোনো বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছি না। কিন্তু আওয়ামী লীগের জন্য বিপদ ওত পেতে আছে আওয়ামী লীগের ঘরের ভেতরেই। আওয়ামী লীগের যে শয়ে শয়ে মনোনয়নপ্রার্থী নিরাশ হয়েছেন, তারা কি সবাই দলের নির্দেশ মেনে তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নামবেন? না, তাদের অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে জয়ী না হন, আওয়ামী লীগের ভোট কাটবেন? অনেকে হয়তো বিএনপি-জামায়াত জোটের মনোনীত প্রার্থীর পাশে চলে যাবেন।

ইতিমধ্যেই খবর পেয়েছি, আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীদের অনেকে কোনো কেনো কেন্দ্রে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াতে শুরু করেছেন এবং অনেক স্থানে (বিশেষভাবে সিলেটে) আওয়ামী লীগের এক যোগ্যপ্রার্থী এক কেন্দ্রে মনোনয়ন না পাওয়ায় স্থানীয় জনগণ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। এই বিক্ষোভ বহু এলাকায় ভোটদাতাদের মধ্যে ছড়াচ্ছে। এই অবস্থার মোকাবেলা করা যায় দলের সাংগঠনিক শক্তি দ্বারা। কিন্তু আওয়ামী লীগ দীর্ঘকাল ক্ষমতায় আছে বটে; তাদের সাংগঠনিক শক্তি ততটা সবল নয়। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার বহু আগে দলের সাংগঠনিক শক্তি জোরালো করা এবং হাইব্রিডদের দল থেকে উৎখাতের ব্যাপারে দলের হাইকমান্ডের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত ছিল।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শেখ হাসিনার এত সাফল্য সত্ত্বেও এই 'সাইবেরিয়ান পাখিরা' তার অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ দলে অনুপ্রবেশকারী জামায়াতিরা। আওয়ামী লীগের নাম ভাড়িয়ে এরা বহু উপজেলা ও পৌরসভায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এবং আওয়ামী লীগারের ছদ্মবেশে জামায়াতের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বহু স্থানে বহু আওয়ামী নেতা ও এমপি, যারা জামায়াতি নন, স্থানীয় জামায়াত নেতারা টাকা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জোরে তাদের কাঁধে চেপে আওয়ামী লীগের জন্য দুর্নাম কুড়াচ্ছে। শোনা যায়, সংসদ নির্বাচনেও বহু জামায়াতি আওয়ামী লীগার সেজে এবং প্রভাব-প্রতিপত্তির জোরে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরিকল্পিত চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা কতটা সফল হয়েছে বা হতে পারবে, জানি না। তবু শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলি, 'কাণ্ডারি হুঁশিয়ার।'

লন্ডন, ২৯ নভেম্বর বৃহস্পতিবার, ২০১৮


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ