কেমন প্রার্থী পেলাম?

নির্বাচন

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০১৮

কেমন প্রার্থী পেলাম?

দলীয় প্রাথী মনোনয়নের সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীদের ভিড়

  রোবায়েত ফেরদৌস

জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল এবং তাদের দুটি জোটের শরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় আরও কয়েকটি দল থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন ১২ হাজারের বেশি প্রার্থী। প্রতি আসনে গড়ে প্রার্থী ৪০ জনেরও বেশি। তবে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে আট হাজারেরও বেশি রয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে। বেশিরভাগ দলে যেখানে চাইলেই মনোনয়ন মেলে, এমনকি সাধ্যসাধনা করেও মনোনয়ন গছিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে এ দুটি দলের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রতি আসনে গড়ে ১৪-১৫ জন মনোনয়ন পেতে মরিয়া। তাদের মধ্য থেকে বেছে নিতে হচ্ছে ২৭০ জনের মতো প্রার্থী- বাকি আসন ছাড়তে হবে জোট শরিকদের জন্য। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকা এ দুটি দলের শক্তি-সামর্থ্যের কথা আমরা জানি। জনপ্রিয়তায় তাদের ধারেকাছেও নেই কোনো দল। অথচ তাদের আসন ছাড়তে হচ্ছে। শরিকদের বেশিরভাগই আবার বেছে নিচ্ছে আওয়ামী লীগের নৌকা কিংবা ধানের শীষ। নির্বাচনে জয়লাভের জন্য এ দুটি প্রতীকের যে বিকল্প নেই! এমনও দেখা যাচ্ছে, দলে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী রয়েছে; কিন্তু শরিকদের ছাড় দিতে গিয়ে যে প্রার্থীর প্রতি সমর্থন জানাতে হচ্ছে, তার রয়েছে অনেক বদনাম।

কেমন হলো আওয়ামী লীগের মনোনয়ন? কেমন হলো বিএনপির মনোনয়ন? ৩০০ আসনের ভোটাররা কি তাদের পছন্দের প্রার্থী পেলেন? কোনোভাবেই মনোনয়ন যেন না দেওয়া হয়, এমন জনপ্রত্যাশা ছিল বেশ কিছু আসনে। তাদের মধ্যে ক'জন মনোনয়ন পেয়েছেন? বাদ দেওয়া গেছে ক'জনকে? এসব প্রশ্নের সাধারণ উত্তর হচ্ছে, জনপ্রত্যাশার অনেকটাই পূরণ হয়নি। অথচ প্রধান দুটি দল সহজেই সন্ত্রাস, আর্থিক অনিয়ম এবং এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের বাদ দিতে পারত। রাজনীতির অঙ্গনে যারা সুবাতাসের প্রত্যাশা করেন নিরন্তর, তাদের জন্য দুই প্রধান দলের মনোনীত ব্যক্তিদের তালিকার কিছু নাম যথার্থই হতাশার। যাদের নামে অনেক মামলা রয়েছে, যারা জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী এবং এমনকি যাদের নাম উচ্চারণ করতেও অনেক এলাকার মানুষের মধ্যে ভয়ের উদ্রেক হয়, তাদের নাম জ্বলজ্বল করছে এ তালিকায়। তাদের কারণে যোগ্যরা বাদ পড়েছেন। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রয়েছে, নিজের পেশায় যারা অনন্য- এমন কিছু ব্যক্তি যেন জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হতে পারেন, এ প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু 'হুন্ডা-ডাণ্ডা-গুণ্ডার' জয় দেখতে হলো দেশবাসীকে! রাজনীতি পেশিশক্তিকে ঝেঁটিয়ে দূর করার জন্য বছরের পর বছর প্রচার চলেছে; কিন্তু তা পূরণ হলো না কেন, এ প্রশ্ন সঙ্গত।

কেন এমনটি হতে পারল? এর উত্তরে বলা যায়, ন্যায়নীতি, নৈতিকতা কিংবা আদর্শের ঝাণ্ডা সমুন্নত রাখা নয়, যিনি সংসদের নির্দিষ্ট আসনটি দলকে উপহার দিতে পারবেন বলে নেতৃত্বের বিশ্বাস, তাকেই মনোনয়ন প্রদান করা হয়েছে। দুই দলেই একই চিত্র! দশম জাতীয় সংসদে এ ধরনের অনেকে ছিলেন। সে নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল। একাদশ সংসদে বিএনপি অনেক আসনে মানি-মাসলের ওপর ভরসা রেখেছে। দুর্ভাগ্য যে, রাজনীতির গুণগত উত্তরণের প্রত্যাশা পূরণ হলো না। গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় এটা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। ভোটারদের জন্য এ এক চ্যালেঞ্জ বৈকি। তারা এখন বাধ্য হবেন মন্দ ও বেশি মন্দের মধ্যে কাউকে বেছে নিতে। মন্দের ভালো- কথাটা চালু আছে প্রবাদ হিসেবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, মন্দের ভালোও মন্দ বৈ কিছু নয়। গণতন্ত্রের প্রত্যাশা থেকে প্রায় ৪৮ বছর আগে বাংলাদেশের অভ্যুদয়। অথচ আমরা সংসদে পাঠানোর জন্য অনেক এলাকায় সৎ ও যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পেতে হা-পিত্যেশ করছি।

বাংলাদেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় তিন দশক ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ছাত্র সংসদ নির্বাচন উৎসাহিত করে না। এ কারণে শিক্ষিত তরুণদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রধান দুটি দল থেকেও গত এক-দেড় দশকে ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা যুবক-যুবতীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যককে বেছে নিতে উৎসাহ দেখা গেল না।

আওয়ামী লীগ টানা দশ বছর ক্ষমতায়। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সূচকে তারা এ সময়ে সফলতা দেখিয়েছে, এমন কথা বলা হয়। তারা আরেক দফা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার জন্য কোমর বেঁধে লেগেছে। মনোনয়ন প্রদানের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো এবং ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচনে তাদের প্রতিপক্ষ নয়। বরং অনুকূল অবস্থায় থেকেই তারা নির্বাচন করছে, এমন ধারণা জনমানসে রয়েছে। শিক্ষাজীবনে বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন যারা, শিল্প-সংস্কৃতি-বিজ্ঞানের অঙ্গনে অগ্রণী যারা, বিভিন্ন পেশায় যারা ঈর্ষণীয় দক্ষতা প্রদর্শন করে চলেছেন, তাদের একটি অংশকে জাতীয় সংসদে পাঠাতে তারা উদ্যোগী হতে পারতেন। বিএনপিও চলতে পারত এ পথে। কিন্তু হায়! সব ভালো প্রত্যাশা যে পূরণ হওয়ার নয়। একাদশ জাতীয় সংসদে এ ধরনের একশ' নতুন মুখ থাকলে গণতন্ত্রের জন্য কতই না সুখবর হতো! আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় ছিলাম বহু বছর। এখন উঠতে চলেছি উন্নয়নশীল দেশের সারিতে। উন্নত বিশ্বের তালিকাতেও স্থান করে নিতে সংকল্প ব্যক্ত করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে জাতীয় সংসদেও চাই তরুণ-মেধাবী-চৌকস নারী-পুরুষ। কিন্তু যে দুটি দলের এ সুযোগ গ্রহণ করার সক্ষমতা ছিল, তাদের প্রার্থী তালিকা থেকে এমন ব্যক্তিদের সন্ধান তেমন মিলছে না।

বিএনপি টানা ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে। তাদের অনেক নেতাকর্মী জেলে কিংবা পুলিশি হয়রানির শিকার বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। এ কারণে তারা নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়নে ঝুঁকি নিতে চায়নি, এমন যুক্তি দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগের তো এ সমস্যা ছিল না। তবে এ দলের তরফেও বলা হচ্ছে, বিএনপি যেহেতু নির্বাচনে এসেছে, তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে হাড্ডাহাড্ডি। তাদের মোকাবেলা করার জন্য চাই 'শক্ত' প্রার্থী। অতএব, পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্থান নেই। নতুন মুখ এলে প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় খেই হারিয়ে ফেলতে পারেন। তাই যত বদনামই থাকুক, ভরসা করতে হয়েছে চেনামুখের ওপর। তাতে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হতে থাকলেও কিছু করার নেই।

নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে শেষ মুহূর্তে প্রতিপক্ষের দুয়ারে হাজির হওয়ার ঘটনা এবারেও দেখা গেল। আদর্শের কোনো বালাই নেই, নীতি চুলায় যাক- মনোনয়ন চাই এমন কোনো দল থেকে, যা দেবে জয়ের নিশ্চয়তা। কিন্তু এমন সংসদ সদস্য দেশের কী মঙ্গল করবেন? বছরের পর বছর যে দলের পক্ষে বলেছেন, এখন বলবেন সম্পূর্ণ উল্টো কথা। তাদের কাছে রাজনৈতিক আদর্শ কোনো বিষয় নয়। যেভাবেই হোক, সংসদে যেতে হবে।

ড. কামাল হোসেন এখন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রধান নেতা। তিনি দশকের পর দশক ধরে রাজনীতিতে ন্যায়নীতির পক্ষে সোচ্চার। অসাম্প্রদায়িক আদর্শের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারের কথা বলেন সর্বদা। কিন্তু গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য জোট বেঁধেছেন যাদের সঙ্গে, তারা একই সঙ্গে বাঁধা পড়ে আছেন একাত্তরে মানবতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে। ঐক্যফ্রন্টে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে যুক্ত কাউকে নেওয়া হবে না- এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ড. কামাল হোসেনের গণফোরামসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বিএনপির ধানের শীষ মার্কা নিয়ে, যে প্রতীক নিয়ে লড়তে চাইছে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সন্ত্রাসীদের দল হিসেবে ধিক্কৃত এ দলটি কিন্তু এভাবেই পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তিনি বিবেকের ভূমিকায় ছিলেন এবং আগামীতেও থাকবেন- এ বিশ্বাস আমরা রাখতে চাই। কিন্তু যে কোনো মূল্যে যারা সংসদে যেতে চাইছেন, তাদের সঙ্গে আপস করে চললে এ লক্ষ্যে পৌঁছানো দুরূহ বৈকি।

রাতারাতি দলবদল যেমন ঘটছে, তেমনি দলের মনোনয়নের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের ঘটনাও ঘটছে। অনেক স্থানে বিক্ষোভের খবর দেখছি। জ্বালাও-পোড়াওয়ে যুক্ত হয়ে পড়ছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও। অথচ তারাই কিন্তু এ ধরনের ঘটনার জন্য বিএনপিকে অভিযুক্ত করে চলেছেন। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করার এ প্রবণতাও কিন্তু কাঙ্ক্ষিত নয়।

অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ