কীভাবে নির্বাচনে জয়ী হবেন?

সময়ের কথা

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০১৮

কীভাবে নির্বাচনে জয়ী হবেন?

  অজয় দাশগুপ্ত

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জমে উঠেছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্জন-প্রতিহতের স্লোগান ছিল জোরালো। এবারে চিত্র একেবারেই ভিন্ন। ১২ হাজারের বেশি প্রার্থী বিভিন্ন দলের মনোনয়ন চেয়েছিল ৩০০ আসনের জন্য। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জোট থেকে মনোনয়ন মিলেছে ৬০০ জনের। ভোটারদের মন জয় করতে তারা তৎপরতা শুরু করেছেন। কীভাবে নির্বাচনে জয়ী হবেন তারা? এ নিয়ে প্রার্থী, তার ঘনিষ্ঠজন এবং সর্বোপরি দল থেকে ছক কষা শুরু হয়েছে। কার ছক কতটা সফল হবে, সেটা অবশ্য জানা যাবে ৩০ ডিসেম্বর ভোট গ্রহণ শেষে।

জাতীয় ফ্রন্টের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না নির্বাচনে জয়লাভের জন্য একটি উপায় বাতলে দিয়েছেন শনিবার জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। তিনি বলেছেন, 'আওয়ামী লীগ সরকারকে আমরা দুই পয়সা দিয়েও বিশ্বাস করি না। এমন কৌশল প্রয়োগ করব, যাতে এবার একটা কিছু হবেই।'

কোনো রাজনৈতিক দল তার নির্বাচনী কৌশল আগেভাগে প্রচার করে না। কারণ তাতে প্রতিপক্ষের সুবিধা। আমরা অপেক্ষায় থাকব, মাহমুদুর রহমান মান্না শেখ হাসিনার সরকারকে নির্বাচনে কুপোকাত করার জন্য এমন কী পথনির্দেশনা দেন, সেটা দেখতে। তিনি যে পথ বাতলে দেবেন, সেটা কি বিএনপি অনুসরণ করবে, সেটাও কিন্তু প্রশ্ন।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান 'পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের ৬ দফা দাবির প্রশ্নে গণভোট' হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। জনগণ তার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল- পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৬০টি আসন- যে ম্যাজিক সংখ্যা এ দলকে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রতি এত বিপুল সমর্থন মিলবে, সেটা ভাবতে পারেনি পাকিস্তানের শাসকরা। কীভাবে নির্বাচনে জয়ী হওয়া যায়, এটা হচ্ছে তার চমৎকার উদাহরণ- মানুষের মন বুঝতে হয়। শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মন বুঝেছিলেন- তারা স্বাধীন বাংলাদেশ চায়।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি সামনে এনেছিলেন এবং তাতে মিলেছিল ব্যাপক সাড়া। 'হাওয়া ভবনের' দুর্নীতি-অনিয়মও বাংলাদেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছিল। এই ধাক্কায় বিএনপি এবং তার ঘনিষ্ঠ মিত্র জামায়াতে ইসলামী একটানা ১২ বছর বা একযুগ ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (৫ জানুয়ারি, ২০১৪) দলটি সহিংসতার ওপর জোর দিয়েছিল বেশি। তাতে শেখ হাসিনার সরকারকে কাবু করা যায়নি, উল্টো নিজেরাই প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানি-নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। তারা নির্বাচন বয়কট করেছিল, প্রতিহত করার ডাক দিয়েছিল। সে লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হতে তারা কী কৌশল নেবে?

আমরা জানি, প্রতিবেশী ভারতের বিজেপি নামের দলটি নরেন্দ্র মোদিকে সামনে রেখে উন্নয়ন-সমৃদ্ধির স্লোগান তুলেছিল। 'দরিদ্র ভারতের' জনগণ তাতে উৎসাহিত হয়েছিল। কিন্তু গত পাঁচ বছরে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটেনি। তাই ২০১৯ সালের প্রথম দিকে নির্ধারিত লোকসভা নির্বাচনে উগ্র হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসী দলটি উন্নয়নের স্লোগান পরিত্যাগ করে ফের ধর্মান্ধতার স্লোগানে ফিরে গেছে। তারা অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের কথা বলছে। সরযু নদীর তীরে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু রামের মূর্তি স্থাপনের জন্য নকশা অনুমোদন করেছে।

বাংলাদেশের চিত্র কিন্তু ভিন্ন। আওয়ামী লীগের টানা দশ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি ঘটাতে পেরেছে, সেটা তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি নেতাকর্মীরাও অস্বীকার করে না। তাদের আপত্তি অন্য ইস্যুতে- যেমন, গণতন্ত্র নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘিত। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের প্রতি বেশি ঝুঁকে থাকা ইত্যাদি। একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ এই উন্নয়নের স্লোগানকেই সামনে রাখছে। তবে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ'-এর মতো কোনো সহজে গ্রহণযোগ্য নতুন স্লোগান তারা সামনে আনতে পারে কিনা, সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকব।

নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য দলটির আরেকটি শক্তির দিক হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি। তিনি বা তার পরিবারের কেউ দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িত, এমন অভিযোগ নেই। আন্তর্জাতিক সমাজেও তিনি সমাদৃত। দলে তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন নেই। বিএনপিতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন নেই। আপাতভাবে বিএনপিতে তারেক রহমানকে নিয়েও প্রশ্ন নেই। তিনি দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পরও দলের যে চার হাজারের বেশি নেতা সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে চেয়েছেন, তারা তার কাছেই সাক্ষাৎকার দিয়েছে স্কাইপেতে। বলা যায়, এভাবে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের ভেতরে নিজের কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। তার নেতৃত্ব প্রশ্নে দলের কয়েকজন প্রবীণ নেতার 'দ্বিধা-আপত্তি' আছে, এমন কথা শোনা যায়। কিন্তু প্রকাশ্যে তার প্রতিফলন নেই। নির্বাচনে দলটি নতুন কী স্লোগান সামনে আনে, সেটা দেখার বিষয়। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে দলটি 'ভারত বিরোধিতাকে' মূলধন করেছিল। ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে 'আদর্শগত বন্ধুত্বও' তারা উপেক্ষা করতে পারে না। আবার জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের 'স্বাধীনতার ঘোষক' দাবিও তারা করে থাকে। বলা যায়, বড় রাজনৈতিক দল হয়েও বিএনপি আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক অধিকার দেয় না, এ দাবি যখন তারা করে, তখন পাল্টা বক্তব্য আসে- বিএনপিও কি একই কাজ করেনি? তাদের প্রতিষ্ঠাও সামরিক শাসনামলে। সে সময়ে রাজনৈতিক অধিকার ছিল না, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছিল না। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- বিএনপি তার শাসনামলে অর্থনীতিতে এমন কোনো বড় অর্জন করতে পারেনি, ভোটের বাজারে যা 'বিক্রয়যোগ্য'। আওয়ামী লীগ 'গণতন্ত্র হত্যা করেছে'- তাদের এ অভিযোগ মেনে নিতে প্রস্তুত রয়েছেন যারা, তারাও কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছেন না- যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে অর্থনীতির চাকা বর্তমানে যেভাবে সচল রয়েছে, সেটা বজায় থাকবে কিনা। অথচ দলটিতে বাংলাদেশের ধনবান শ্রেণির বড় অংশ যুক্ত রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শাসনামলের অবসানের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সরকারের হাতে থাকা অনেক কারখানা ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ধনবানদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন এবং এ জন্য তাদের কাছে অনেকের রয়েছে কৃতজ্ঞতা। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের বড় অংশও টানা প্রায় দুই দশক আওয়ামী লীগের ওপর ভরসা রাখতে পারছিল না। বলা যায়, শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে যত্নবান হয়েছেন এবং এখন তার সুফল ভোগ করছেন। আর বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পথে এ বিষয়টিকেই সবচেয়ে বড় বাধা মনে করছে।

নির্বাচনে ধর্মীয় কয়েকটি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। কয়েকটি বামপন্থি দলও মাঠে আছে। তবে প্রধান দুই জোটের প্রবল ঢেউয়ে তারা বড়ই অসহায়। ধর্মীয় বিষয় সামনে রেখে যারা রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয়, তাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা সৃষ্টির চেষ্টাও লক্ষণীয়। এতে বিএনপির সুবিধা হতে পারে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্নেষক মনে করেন। বামপন্থিরা আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সমান শত্রু বলে প্রচার করছে। তবে তাদের অনেকের মধ্যেও আওয়ামী লীগের বিরোধিতার পাল্লা কিছুটা ভারী। এ জোটের প্রধান সমস্যা অবশ্য নিজেদের আইডেনটিটি প্রতিষ্ঠা করতে না পারা। গরিব মানুষের পক্ষের রাজনীতি করছেন- এ কথা বলছে তারা। কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসনামলে দরিদ্র লোকেরা আগের চেয়ে তুলনামূলক ভালো আছে, এটাও তো বাস্তবতা।

নির্বাচনে জয় পেতে চায় সবাই- এমনকি যে প্রার্থীর পক্ষে পাঁচ-দশটা ভোট পড়বে না, তিনিও মনে করেন- জয় পেতেও পারি। নির্বাচনে জয় পেতে কী করণীয়, সেটা নিয়ে দুই হাজারেরও বেশি বছর আগে কুইনটাস টুলিয়াস সিসেরো নামের এক ইতালীয় পরামর্শ দিয়েছিলেন তারই অগ্রজ মারকুস টুলিয়াস সিসেরোকে। খ্রিস্টপূর্ব '৬৪ সালে বড় ভাই মারকুস রোমের কনসাল পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। তখন অনুজ কুইনটাসের দশটি টিপস ছিল নিম্নরূপ- এক. পরিবার ও বন্ধুদের সমর্থন নিশ্চিত করুন। পরিবারের কেউ বিরোধিতা করলে ভোটাররা সেটা ভালোভাবে গ্রহণ করে না; দুই. নিজের চারপাশে যোগ্য ব্যক্তিদের রাখুন; তিন. আপনি অতীতে যার জন্য যা করেছেন, সেটা স্মরণ করিয়ে দিতে ভুলবেন না। যাদের জন্য কিছু করেননি, তাদেরও বলবেন- ভোট দেওয়ার জন্য আপনার কাছে ঋণী এবং ভবিষ্যতে তা মনে রাখব; চার. নিজস্ব শক্ত ভিত গড়ে তুলুন। বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট থাকুন। এমনকি ভালো লোক হিসেবে সমাজে পরিচয় নেই, তিনিও কিন্তু ভোটের প্রচারে ভূমিকা রাখতে পারেন; পাঁচ. নির্বাচনের প্রচারের সময় ভোটারদের আশ্বাস প্রদানে দরাজ দিল থাকুন। ভোটাররা মুখরোচক প্রতিশ্রুতি পছন্দ করে; ছয়. মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা অর্জন করুন। এ ক্ষেত্রে বক্তৃতা প্রদানের বিষয়টির প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী থাকুন; সাত. নিজের এলাকা ছেড়ে যাবেন না; আট, প্রতিপক্ষের দুর্বলতা জানুন এবং সেটা যত বেশি সম্ভব কাজে লাগান; নয়. ভোটারদের কথায় তুষ্ট করুন; দশ. মানুষকে আশা-ভরসা দিন। প্রতিটি মানুষ, এমনকি যারা সন্দেহবাতিক- তারাও কারও ওপর বিশ্বাস রাখতে চায়।
সে ব্যক্তি কিন্তু আপনিও হতে পারেন।

সাংবাদিক
 ajoydg@gmail.com



মন্তব্য যোগ করুণ