রাজপথে জীবন-মরণের সমস্যা

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০১৮

রাজপথে জীবন-মরণের সমস্যা

  মামুনুর রশীদ

দৃশ্য-১ : দিল্লির রাজপথ জনমানবশূন্য মধ্যরাত। শুধু ট্রাফিক সিগন্যালগুলো
জ্বলছে। একটি লাল সিগন্যালের সামনে গাড়িটি এসে দাঁড়াল।
আরোহী : কী ভাই, রাস্তা তো ফাঁকা, কোনো ট্রাফিক পুলিশও নেই। গাড়ি থামালেন কেন?
চালক : দেখছেন না লাল বাতি জ্বলছে!
আরোহী : কোনো ট্রাফিক পুলিশও তো নেই।
চালক : (হিন্দিতে) কানুন তো হ্যায়।

একটি ইতিবাচক ঘটনা নিয়েই এই লেখা শুরু। যদিও আমাদের দেশে ধর্মঘট বহুবার হয়েছে। পরিবহনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আইন অমান্য করা এবং আইন হতে না দেওয়ার জন্য এই ধর্মঘট বহুবার হয়েছে। রাষ্ট্র যখন আইনকে কঠোর করতে চায়, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা আনতে চায়, তখনই বেঁকে বসে এই আইন ভঙ্গকারী ট্রেড ইউনিয়ন। বর্তমানে অবশ্য ট্রেড ইউনিয়ন কমতে কমতে একটিতে এসে দাঁড়িয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে সরকারি দলের নেতা। মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি আইন প্রণয়ন করেছে। সে আইন হতে হবে চালকদের পক্ষে, নাগরিকদের পক্ষে নয়। এই দাবি নিয়েই পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘটে নেমেছিল। শুধু ধর্মঘট নয়, রাজপথে ও দূরপাল্লার পথে পথে এক অরাজক পরিস্থিতিও সৃষ্টি করেছিল। এমনিতেই পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে মানবিকতা কম। ২৮ অক্টোবর একটি অ্যাম্বুলেন্সে বাধা দিয়ে একটি শিশুর মৃত্যু ঘটিয়েছে। পরদিনও এমন মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটেছে। পরিবহন শ্রমিকরাও এমন জীবনযাপন করে, যেখানে তাদের মানবিক হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। একজন গাড়িচালক চট্টগ্রাম থেকে বেনাপোল পর্যন্ত একাই গাড়ি চালিয়ে ঠিকমতো বিশ্রাম না নিয়ে ঘুম ঘুম চোখে আবার ফিরতিপথে রওনা দেয়। এর কারণ একটাই, অর্থ। ট্রিপ সিস্টেমে পরিবহন মালিকরা চালকদের এক নিষ্ঠুর শ্রমে বাধ্য করে। প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগে একটা সময় চালক পরিবর্তনের নির্দেশনা দিয়েছেন। সে নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না। ট্রিপ সিস্টেমস উঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তাও মানা হচ্ছে না। পত্রপত্রিকায় দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিনই দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। কিছুদিন আগে একটি স্কুলের দু'জন শিক্ষার্থীর বাসচাপায় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিশাল এক ছাত্র অভ্যুত্থান হয়ে গেল। শিশু-কিশোররা দেশের পথের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছিল। সরকার কিছু কিছু ক্ষেত্রে দৃঢ়তাও দেখিয়েছে এবং আইনও প্রণয়ন করেছে।

আমরা জানি, একটি দেশ কতটা সুশৃঙ্খল তার প্রমাণ মেলে তার পথের শৃঙ্খলা দেখে। আমরা সেই শৃঙ্খলার দিক থেকে একেবারে খাদের মধ্যে ডুবে আছি। উল্টোপথে গাড়ি আসা, একেবারে প্রাচীন কায়দায় ম্যানুয়ালি ট্রাফিক কার্যক্রম আমাদের বুকের ওপর চেপে আছে। এরপর আছে ভিআইপি চলাচল। যখন ভিআইপি চলাচল শুরু হয়, তখন অনড় হয়ে গাড়িতে বসে থাকা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকে না। বাস, টেম্পো, লেগুনায় একে তো প্রচণ্ড গরম, ঠাসাঠাসি করে বসা বা দাঁড়িয়ে থাকা; তারপর একই জায়গায় শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ঘণ্টা পার করে দেওয়া। শহরগুলোতে ভিআইপিদের জন্য আলাদা রাস্তা নির্মাণের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানি না। এ সরকারের আমলে অনেক ফ্লাইওভার নির্মিত হয়েছে। তার মধ্যে কিছু কিছু ফ্লাইওভার নতুন করে যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার কিছু কিছু ফ্লাইওভার একেবারেই শূন্য; সেখানে কোনো যানবাহনই নেই। আমাদের দেশে যান চলাচল নিয়ে কোনো সরকারি গবেষণা সংস্থা আছে কিনা আমার জানা নেই। হয়তো পুলিশই এসবের দেখভাল করে। একটি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত যান চলাচল ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এতদিনেও গড়ে ওঠেনি। আমাদের কিছু কিছু রাস্তা বেশ প্রশস্ত। সঠিকভাবে এর ব্যবহার করলে যানজট হওয়ার কোনো কারণ নেই। উত্তরবঙ্গগামী হাইওয়েগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত রাস্তাটি বেশ প্রশস্ত এবং চার লেনের কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। তবুও যানজট লেগেই আছে। এই পথে দুটি লেন গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে; যেমন- চৌরাস্তা থেকে ময়মনসিংহগামী পথটির ক্ষেত্রেও একই দৃশ্য দেখা যায়। পথ ব্যবহারের সংস্কৃতি যদি গড়ে না ওঠে, তাহলে রাস্তা যতই প্রশস্ত হোক না কেন, শৃঙ্খলা আনা সম্ভব নয়। পশ্চিমা দেশের কোনো কোনো শহরে ট্রাফিক সিগন্যাল ও ট্রাফিক পুলিশ নেই। কারণ সেখানে মাঝখানে একটি আইল্যান্ড রেখে রাউন্ড অ্যাবাউটের নিয়মে গাড়ি চলে। আমাদের সে রকম কিছু আশা করা একেবারেই দুরাশা। কারণ সেখানে গাড়ি চালান শিক্ষিত জনগোষ্ঠী এবং পেশাদার চালকরা আইনের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। আইন মানলে যে নিজেরই সুবিধা হয়, সেটা তারা বহু আগেই টের পেয়েছে।

কী নিষ্ঠুর! ২৮ অক্টোবর এক বৃদ্ধ চালকের চোখে-মুখে ধর্মঘটি শ্রমিকরা আলকাতরা মেখে দেয়। ভদ্রলোক হয়তো ওই শ্রমিকের পিতার বয়সী। আবার কলেজের ছাত্রীদের গায়ে পোড়া মবিল ছোড়া হয়েছে। এই অপসংস্কৃতির শিক্ষা তার সংগঠনই তাকে দিয়েছে। এসব সংগঠনের নেতৃত্ব কখনই সদস্যদের মানবিক আচরণের কোনো শিক্ষা দেয়নি, বরং বিক্ষুব্ধ করেছে। পারিবারিক মূল্যবোধ, সন্তানের প্রতি স্নেহ, বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধা- এসব অধিকাংশ পরিবহন শ্রমিকের মধ্যে অনুপস্থিত। একেবারেই নাবালক থেকে চালকদের লাথি-গুঁতা খেয়ে, অশ্নীল গালাগাল শুনে তারপর একসময় চালকের আসনে বসে। চালকের আসনে বসার আগেই ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য নানা কালো পথে ঘুরে ঘুরে একসময় সফল হয়। এর মধ্যে সে চিনে ফেলেছে দুটি বস্তু- একটি টাকা; অন্যটি পরিবহন সংগঠন। মালিকের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে একটা অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়। আবার পথে পথে ঘুষ দিতে গিয়ে দুর্নীতির সঙ্গেও এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে যখন সে একটা পরিবার গড়তে যায়, তখন তার বেঁচে থাকার বাস্তবতা পরিবারটা মানবিক হয়ে ওঠে না। স্ত্রীর প্রতি, সন্তানের প্রতি এবং মুরব্বিদের প্রতি আচরণটা হয়ে ওঠে যান্ত্রিক। তাই সে যখন দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যায়, তখন একবারও ভাবে না যে, কাকে সে হত্যা করল। যেহেতু সে খবরের কাগজ বা টেলিভিশন দেখার সময়ই পায় না, তাই নিহত ব্যক্তির পরিবারের আহাজারিও তার কানে পৌঁছায় না। বিপদ কেটে গেলে আবার সে কাজে যোগ দেয় এবং জীবনের প্রাত্যহিকতার কাছে ফিরে আসে। সেই প্রাত্যহিকতার পেছনে ফেরার অবকাশ নেই; শুধু নিত্যদিনের আয় এবং সামনের দিকে তাকানো। গাড়িগুলোতে লেখা থাকে- 'সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি'। কিন্তু সিরিয়াল ও প্যাসেঞ্জার ধরতে গিয়ে তীব্রগতিতে চালক গাড়ি চালায়। তাতেই রাজপথে শুরু হয় আত্মঘাতী প্রতিযোগিতা। তার এই প্রতিযোগী তারই পেশার মানুষ। তার সঙ্গে তার কোনো বোঝাপড়া নেই; নেই কোনো শ্রেণি সম্পর্ক। শুধু যখন স্বার্থে আঘাত লাগে, রাষ্ট্র যখন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে, তখনই তার সঙ্গে ঐক্য হয়। ধর্মঘটে আক্রান্ত-বিপন্ন নাগরিক দিনের পর দিন ভোগান্তির স্বীকার হয়; কিন্তু যারা আইন প্রণয়নকারী, তাদের কিছুই আসে-যায় না। হরতালে রাজনৈতিক দলগুলো সবসময়ই এই শ্রমিকদের ব্যবহার করে থাকে। দূরপাল্লার বাস বন্ধ করে দিয়ে ঢাকার রাস্তায় ভাংচুর চলে। তাই ওই দল যখন ক্ষমতায় আসে, তখন পরিবহন শ্রমিক নেতারা ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে একটা ভালো অবস্থান করে নেয়। উপরন্তু চাঁদার একটা সিংহভাগ আসে এ খাত থেকে এবং সেই চাঁদার টাকা পৌঁছে যায় অনেক ক্ষমতাসীনের পকেটে। আইন কঠোর হলে চাঁদার অঙ্কও বেড়ে যাবে।

আজকের পৃথিবীতে যানবাহন ছাড়া জীবন অচল। প্রতিদিন পথে হাজার হাজার নতুন যানবাহন নামছে। সবকিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন সবার ঊর্ধ্বে আত্মনিয়ন্ত্রণ। নাগরিকরা, চালকরা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন, সবাই যদি আইন না মানেন, সামান্য একটু সময় বাঁচানোর জন্য উল্টোপথে গাড়ি চালান বা ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে বাহাদুরি দেখান, তাহলে আমরা সভ্যতর উল্টোদিকে চলছি। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী দৃঢ়কণ্ঠে বলেছেন, আইনে কোনো পরিবর্তন হবে না। তার পক্ষে দেশের নাগরিকরাও আছেন। যদিও নাগরিকদের দাবি ছিল আরও বেশি শাস্তির ব্যবস্থা করা। বর্তমান অবস্থান থেকে কোনো অবস্থাতেই আইন প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষকে পিছু হটা একেবারেই সমীচীন হবে না।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ