সুন্দরবনের নদী-প্রাণবৈচিত্র্য সংকট

পরিবেশ

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৮

সুন্দরবনের নদী-প্রাণবৈচিত্র্য সংকট

  নূসরাত খান

সুন্দরবনের অস্তিত্ব নদী আর নদীনির্ভর জীববৈচিত্র্যের ওপর বিদ্যমান। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন আজ বিপন্নপ্রায়। কখনও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবার কখনও মানুষের অসাধু কর্মের কারণে সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ থেকে সুন্দরবন যদিও ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে। ২০০৯ সালের আইলার পর সুন্দরবনকে নতুনভাবে জেগে উঠতে দেখেছি আমরা। কিন্তু মানুষের লাগাতার দুর্নীতিকর্ম আজ সুন্দরবনের অস্তিত্বকে প্রশ্নের সম্মুখীন করছে।
সুন্দরবনের নদী-খালগুলো নানা প্রজাতির মাছ, জলজ প্রাণীসহ অসংখ্য অণুজীবের এক অনন্য আধার। মূলত মৎস্যকেন্দ্রিক জীবিকানির্ভর অধিবাসীর সংখ্যাই সুন্দরবনপাড়ের গ্রামগুলোতে বেশি। হাজার বছর ধরে তারা বনের ওপর নির্ভর করেই নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কখনও মাছ, কখনও কাঁকড়া ধরা, কিংবা মধু সংগ্রহের মাধ্যমে। কিন্তু বনের অভ্যন্তরে প্রতিদিন আসছে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা। এমনকি বনবিবির পূজার মতো একটি প্রাচীন চর্চাও বনের ভেতর পালনে এসেছে বাধা। সাধারণ মানুষ সবকিছুই মেনে নিয়ে নিজেদের জীবনে ক্রমান্বয়ে সুন্দরবনের অন্তর্ভুক্তি কমিয়ে ফেলছে বিনা প্রতিবাদে। কিন্তু তাতে কি সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে?
সুন্দরবনের প্রতিটি নদী-খালকে পরিকল্পিতভাবে বিষাক্ত করে তোলা হচ্ছে। ছোট-বড় বেশিরভাগ খালের মুখে খাল গড়া জাল পেতে খালের মুখ বন্ধ করে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে মাছ ধরার ভয়াবহ চর্চা সুন্দরবন অঞ্চলে রয়েছে। অন্যদিকে বনের ভেতরে অবস্থান নেওয়া ডাকাতের কবলে পড়ে একেকটি জেলে পরিবারের সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ায় পরোক্ষভাবে সুন্দরবনই অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। সমাজের দরিদ্রতম জনগোষ্ঠী আরও দরিদ্র হয়ে পড়ছে এবং একটি দারিদ্র্যের চক্রে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল এসব মানুষের অর্থনৈতিক সমাধানে উল্লেখযোগ্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
কিছু অসাধু জেলে, মাছ ব্যবসায়ী প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় সুন্দরবনের অভ্যন্তরে নানা ধরনের অপকর্ম করছে। প্রশাসনের আড়ালে থেকে নানা ধরনের ফসলের কীটনাশক নদী-খালে প্রয়োগ করে পাঁচ-ছয় গুণ গলদা চিংড়ি ও সাদা মাছ ধরছে তারা। একসময় এ অঞ্চলে জাল ফেললেই মাছ পাওয়া যেত। তা কমতে কমতে এখন প্রায় সারাদিন নদীতে থাকলেও কখনও মাছ ধরা পড়ে, কখনও পড়ে না। বিভিন্ন কারণে মাছ কমে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো বিভিন্ন খালের মুখে বিষ দিয়ে প্রায়ই মাছ, মাছের পোনাসহ নানা অণুজীব মরে প্রতিটি নদী মাছশূন্য হয়ে পড়ছে। সক্রিয় জোয়ার-ভাটার কারণে যদিও এসব নদী-খালে পুনরায় স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসে; তাও সময়সাপেক্ষ।
সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী মানুষের সঙ্গে কথা বলে এর ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পেরেছি। বেশ কয়েক বছর ধরে গবেষণার কাজেই সেখানকার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের জীবন ব্যবস্থা নিয়ে আলাপ হয়েছে। দাকোপ উপজেলার ঢাংমারী ইউনিয়নের পশ্চিম ঢাংমারী গ্রামের বাসিন্দা হিমাংশু (৬৫) কয়েক বছর আগেও পেশাগতভাবে জেলে ছিলেন। তিনি বলেন, আনুমানিক ২০ বছর আগে ভারতে রিপকড নামে একটি ধানের কীটনাশক নিষিদ্ধ করে দেওয়ার পর এ দেশে কিছু অসাধু জেলে তা মাছ ধরার কাজে ব্যবহার শুরু করল। রিপকড ছাড়াও রটেনন, ডায়ামগ্রো, ফাইটার প্রভৃতি কীটনাশক নিষিদ্ধ হলেও নদীতে প্রয়োগ করে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এক প্রকার প্রকাশ্যে চলছে এই অপকর্ম। উদ্দেশ্য অধিক মুনাফা। মাঝেমধ্যে নদীর উপরিভাগ পুরো সাদা হয়ে যায়। হাজার হাজার মাছ ভেসে যেতে দেখা যায়। কারণ, যারা এই প্রক্রিয়ায় মাছ ধরে তারা বড় মাছ কিংবা চিংড়ি ছাড়া অন্যান্য মাছ সংগ্রহ করে না। আর এ ধরনের বিষ প্রয়োগে সব ধরনের প্রজাতি ও আকারের মাছ আক্রান্ত হয়।
এই বিষ একই সঙ্গে নদীদূষণ ও সুদূরপ্রসারী ক্ষতিসাধন করছে। বনের নিজস্ব খাদ্যশৃঙ্খল ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। তাতে কমতে শুরু করেছে ডলফিনের মতো প্রাণীর খাদ্যের পরিমাণ। ডলফিনের প্রধান খাদ্য হলো মাছ এবং চিংড়ি জাতীয় প্রাণী। তাই এ পদ্ধতিতে মাছ ধরা ডলফিনের খাদ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। একই সঙ্গে সুন্দরবনের নদীগুলোর প্রতিবেশ ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। নানা ধরনের অণুজীব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে তা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। অর্থাৎ বিলুপ্তি ঘটছে। সে ক্ষেত্রে নদী-খালের প্রাণবৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

বিষ প্রয়োগের এই দুর্নীতিকে নজরে আনতে কিছু জেলে অভিযোগ জানালেও সে অভিযোগের ভিত্তিতে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে নানা সময় ব্যর্থ হয় বন রক্ষাকারী বাহিনী। যখনই কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়, উল্টো নির্দেশ দেওয়া হয়, যারা বিষ দেয় তাদের ধরিয়ে দিতে।

অন্যদিকে, জীবিকার তাগিদে স্থানীয় জেলেদের মাছ ও কাঁকড়া ধরেই বাঁচতে হয়। যেহেতু নদীতে বিষ প্রয়োগের কারণে মৎস্য আহরণের পরিমাণ দিন দিন কমে আসছে, তাই বনের একটু গভীরে তাদের ঢুকতেই হয়। আর গহিন বনের নদী-খালে প্রবেশের ঝুঁকি বর্তমান সময়ে অনেক বেশি। সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে লুকিয়ে থাকে বনদস্যু বা এলাকাবাসীর কথায় 'ডাকাত'। কিছুদিন আগেও নরেন (ছদ্মনাম) নামে এক জেলেকে অস্ত্রের মুখে আটক করে ডাকাতরা মাছ ধরা দলের আরও সাতজনের সঙ্গে। প্রত্যেককে ছাড়িয়ে আনতে ১৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ 'ডিজিটাল ব্যাংকিং'-এর মাধ্যমে তাদের অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হয়েছিল। এর পরই নরেন ছাড়া পায়। কিন্তু ১৫ দিন অন্তর ডাকাতদের হাতে ৫০০ টাকা পৌঁছে দেওয়া লাগে। না হলে বনে প্রবেশ এক অর্থে নিষিদ্ধ। বন বিভাগ থেকে পাওয়া অনুপতিপত্র এখানে বনে প্রবেশের জন্য যথেষ্ট নয়। আর যদি ডাকাতদের নিজেদের মধ্যে দল ভেঙে দু'ভাগ হয়, তবে একজনকে নয় বরং একাধিক ডাকাতকে মুক্তিপণ দেওয়ার চাপ নিতে হয় এসব মৎস্যজীবীকে।

ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে চাঁদাবাজি আরও সহজ হয়েছে। আগেও বনের ভেতর বনজীবীরা ডাকাতের কবলে পড়ত। কিন্তু এখন এই চক্রটি অনেক বেশি সংঘবদ্ধ। মোবাইলের নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধার কারণে তাদের কর্মকাণ্ড অনেক দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে।

দারিদ্র্যের চক্র যেন প্রতিদিন আষ্টেপৃষ্ঠে ধরছে বনজীবী ভুক্তভোগীদের। তারা জানেন না পরবর্তী মাসে পরিবার কীভাবে চলবে। সুন্দরবনকে আজ তাদের আপন ভাবতে কষ্ট হয়। এ ভয় যেন বাঘের ভয়ের চেয়েও বেশি। বাঘের আক্রমণ থেকে বেঁচে ফিরে আসা দেবেন্দ্রনাথ রায় আজও বাঘকেই বনের রক্ষাকবচ বলে বিশ্বাস করেন। কথা বলতে গিয়ে তিনি আমাকে বলেন, বাঘের ভয়ে নয়, বরং ডাকাতের ভয়ে গভীর অরণ্য আজ আর তার কাছে নিরাপদ ঠেকে না। এ বনের পরিবেশ তার কাছে খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবে। এত অনিশ্চয়তার মাঝেও তিনি এ বনকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করেন, নির্ভর করেন। এ বিশ্বাস থেকে তিনি নির্ভয়ে গানও বাঁধেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা মাছ-কাঁকড়া আহরণের পেশাতেই তিনি সর্বোচ্চ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

একদিকে নদীতে মাছের ঘাটতি, অন্যদিকে প্রায় প্রত্যেক মাসেই ডাকাতের কবলে পড়ে ঋণের বোঝা টানতে হচ্ছে প্রায় প্রতিটি জেলে পরিবারকে। কখনও ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার কাছে, কখনও চড়া সুদে মহাজনের কাছে ধার করে এ ধরনের মুক্তিপণের দাবি মেটাতে হচ্ছে জীবনের নিরাপত্তার তাগিদে। ফলাফল, দরিদ্র জনগোষ্ঠী দিন দিন আরও দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে আর সুন্দরবনকে চোখের সামনে নষ্টদের দখলে চলে যেতে দেখছে।

কখনও শেষ না হওয়া সমস্যাগুলোর সমাধান আসবে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায়, তা প্রশাসনসহ সবার কাছে একটি বড় প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলে হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে সুন্দরবন সুরক্ষার প্রাণভোমরাটি।

গবেষক; পরিচালক, রিভারাইন পিপল


মন্তব্য যোগ করুণ