আলোচনার দরজা খোলা রাখুন

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৮

আলোচনার দরজা খোলা রাখুন

  এমাজউদ্দীন আহমদ

দেশে রাজনৈতিক সংকট চলছে- এই সত্য এড়ানোর অবকাশ নেই। এই সংকট মূলত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক। এর মধ্যে অন্যতম হলো নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা এবং এর সঙ্গে আছে অন্য আরও কিছু বিষয়। বিদ্যমান সংকট নিরসনের লক্ষ্যে আমরা আগে থেকেই সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আসছিলাম। তারপর এক পর্যায়ে রাজনীতির মেরুকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানালে প্রধানমন্ত্রী আকস্মিক সাড়া দিয়ে সংলাপ প্রক্রিয়া শুরু করে শুভবোধের পরিচয় দেন। ইতিমধ্যে ঐক্যফ্রন্টসহ বিভিন্ন জোটের সঙ্গে আলোচনা হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপ হয় সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে। অর্থবহ সংলাপের প্রত্যাশা আমরা সবাই পোষণ করছি বটে; কিন্তু এ বিষয়ে নানা রকম সংশয়-শঙ্কাও তাড়া যে করছে না, তাও নয়। আমরা চাই আলোচনার টেবিলে তর্ক-বিতর্ক হোক; কিন্তু একটা সমাধান সূত্র বের হয়ে আসুক। স্বচ্ছ, অবাধ, গ্রহণযোগ্য, প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চার পথটা সুগম হোক। নানা রকম সীমাবদ্ধতা আমাদের আছে বটে; কিন্তু রাজনীতি-সংশ্নিষ্ট সবাই যদি আন্তরিক হন, দায়বদ্ধ থাকেন, তাহলে আমাদের কাঙ্ক্ষিত অর্জনের মাত্রা স্পর্শ করা কিংবা প্রত্যাশার পূর্ণতা প্রাপ্তি দুরূহ নয়।

সংলাপের মাধ্যমে সমাধান সূত্র বের করে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা আন্তরিকতা প্রদর্শন করেছেন- এ কথা সংশয়াতীতভাবেই বলা যায়। সরকারের তরফে আগেই এ ক্ষেত্রে আরও নমনীয় হওয়ার অবকাশ ছিল। দ্বিতীয় দফার সংলাপে প্রধানমন্ত্রী ঐক্যফ্রন্টের মঙ্গলবারের জনসভা সম্পর্কে ইতিবাচক কথা বলেছেন এবং ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের ওই সভার জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। কিন্তু এ কথাও তো সত্য, ঐক্যফ্রন্ট বাধাহীনভাবে এই সমাবেশ করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়েই তারা সভা করেছেন। গণতন্ত্রে তো এসবের অবকাশ নেই। গণতন্ত্রে সভা-সমাবেশ, মতপ্রকাশের অধিকার ইত্যাদি সবকিছুর পথই উন্মুক্ত। এসব ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া মানেই গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করা এবং এমনটি এ দেশে বারবারই সৃষ্টি হচ্ছে, যা অনভিপ্রেত। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার সংলাপ ঘিরে সঙ্গতই জনপ্রত্যাশা ছিল তুঙ্গে। ঐক্যফ্রন্ট নেতা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংলাপ শেষে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, 'সংলাপ ভালো হয়েছে।' অর্থাৎ আমরা তাহলে কি ধরে নিতে পারি, আশা জিইয়ে আছে? আমরা চাই, সংলাপের মধ্য দিয়েই বের হয়ে আসুক সম্মানজনক সমাধান সূত্র। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা এও বলেছেন, সংলাপ অব্যাহত থাকবে এ রকম প্রতিশ্রুতি তারা পেয়েছেন।

সংবিধান দেশ-জাতির কল্যাণের জন্যই। এই সংবিধানে ইতিমধ্যে বহুবার সংশোধনী আনা হয়েছে এই লক্ষ্যেই। নির্বাচনকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্বাচনে সমতল ভূমি নিশ্চিতকরণ, রাজনৈতিক মামলাগুলোর তালিকা হস্তান্তর ও প্রত্যাহার দাবি ইত্যাদি বিষয় দ্বিতীয় দফার সংলাপে আলোচনার মুখ্য বিষয় হিসেবে স্থান পায়। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে আস্থার সংকট যেখানে সঙ্গত কারণেই প্রকট হয়ে উঠেছে, আলোচ্য বিষয়গুলো সেখানেই নিঃসন্দেহে গুরুত্ববহ। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অপরিহার্য যেসব শর্ত রয়েছে এসবই এর অংশও বটে। আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ মনে করি যে, বিদ্যমান সংকটের নিরসন না করে কোনোভাবেই যেন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা না হয়। তফসিল ঘোষণার আগে সংকটের নিরসন জরুরি। ইতিমধ্যে কোনো কোনো মহল থেকে বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার তারিখ যেন পেছানো না হয়। আমরা মনে করি, এর ফলে সংকট আরও বাড়তে পারে। যেহেতু সমস্যা-সংকট নিরসনের উদ্যোগটা শেষ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে, সেহেতু নতুন করে আর বিতর্ক কিংবা সংকট সৃষ্টি না করাটাই হবে শ্রেয়। তবে মানসিকতা যদি উদার থাকে, তাহলে তফসিল ঘোষণার পরও আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসন করে পুনঃতফসিল ঘোষণা করা যেতে পারে। সবকিছুই নির্ভর করছে রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে ১০ জন উপদেষ্টা নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের যে প্রস্তাব ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট দ্বিতীয় দফা সংলাপে দিয়েছে, এ নিয়ে উভয় পক্ষের দূরত্বও ঘুচতে পারে আলোচনার মধ্য দিয়েই। শান্তি, সহাবস্থান, স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র ও দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থ কিংবা কল্যাণের জন্য এবং অংশগ্রহণমূলক প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের স্বার্থে যদি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনে কিছুটা সময়ও নিতে হয়, এ ব্যাপারেও নতুন করে ভাবা যেতে পারে। সংলাপের দরজা খোলা থাকুক। আমরা চাই, আলোচনার মধ্য দিয়েই শান্তিপূর্ণ সমাধান বের হয়ে আসুক। গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চার পথ যেন কণ্টকাকীর্ণ না হয়, নিশ্চিত হোক সেই বিষয়টি। মামলা-হামলা, সভা-সমাবেশে বাধা, অধিকার হরণের সব রকমের নেতিবাচকতার পথ রুদ্ধ যেন না হয়, তা নিশ্চিত হোক। বৈরিতার মধ্য দিয়ে কখনোই সৃজনশীল কিংবা শুভপ্রদ কিছু আশা করা দুরাশারই নামান্তর। পরমতসহিষুষ্ণতা ও শ্রদ্ধা, উদার মানসিকতা এবং গণতন্ত্রের সব শর্ত মেনেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির অনুশীলন করতে হবে।

আমাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে হঠাৎ করে এই যে আলোচনার টেবিলে বসার উদ্যোগ, এটা শুভ লক্ষণ। যেখানে রাজনীতিবিদদের মধ্যে মুখ দেখাদেখিটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং একে অন্যের প্রতি বিষোদ্গারের চর্চা অনেক ক্ষেত্রেই ক্রম পুষ্ট রূপ নিচ্ছিল, সেখানে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের পথ খোঁজা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সরকার চাইলে কিংবা আন্তরিক হলে বিদ্যমান সংকট নিরসন দুরূহ কোনো বিষয় নয় এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, প্রশ্নমুক্ত, দৃষ্টান্তযোগ্য করা সম্ভব যদি বিদ্যমান নেতিবাচকতাগুলো দূর করা যায়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ