সৌহার্দ্যের পরিবেশ বজায় থাকুক

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৮

সৌহার্দ্যের পরিবেশ বজায় থাকুক

  ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সংলাপে বসেছিলেন ৭ নভেম্বর বুধবার। ১ নভেম্বর এ ফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপ। সংলাপ শেষ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, 'প্রধানমন্ত্রী ঐক্যফ্রন্টভুক্ত দলগুলোকে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য অনুরোধ করেছেন। তিনি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের যে অঙ্গীকার করেছেন, সেটা রক্ষা করবেন।'

১ নভেম্বরের সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা তাদের সাত দফা দাবির ওপর জোর দিয়েছিলেন। গণমাধ্যমে দেখেছি, ফ্রন্টের নেতারা বিভিন্ন সময়ে এটাও বলেছেন যে, সংবিধানের মধ্যে থেকেই সরকার তাদের দাবি মেনে নিতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় দফা সংলাপের যে খবর গণমাধ্যমে এসেছে তাতে দেখা যায়, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অতিরিক্ত প্রস্তাব ও সুপারিশ তারা করেছেন। যেমন তারা বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। এতে থাকবেন প্রধান উপদেষ্টা ও ১০ জন সদস্য। তারা আরও বলেছেন, রাষ্ট্রপতি দশম জাতীয় সংসদ ভেঙে দেবেন এবং এর ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানে নির্দলীয় প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের নিয়ে সরকার গঠনের কোনো বিধান নেই। এ রকম করা হলে সেটা আদালতে টিকবে না, নাকচ হয়ে যাবে।

তারা সাধারণ নির্বাচন পেছানোর যে প্রস্তাব করেছেন, সেটাও গ্রহণযোগ্য হবে না। জনগণ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। দেশের বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা জনসংযোগ শুরু করেছেন। তাহলে নির্বাচন পেছানোর দাবি কেন তোলা হচ্ছে?

আশির দশকে এইচএম এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের এক পর্যায়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়েছিল। এটা ছিল সেনাশাসকের কবল থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি পর্যায়ে বিশেষ ব্যবস্থা। ওই সরকার অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল। পরের কয়েকটি নির্বাচনেও আমরা এ ব্যবস্থা দেখেছি। ২০০৭ সালে এ সুবিধা গ্রহণ করেই দেশের ওপর চেপে বসে বিশেষ ধরনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যারা দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। ওয়ান-ইলেভেন হিসেবে পরিচিত এ ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি কেউ চায় না। সর্বোচ্চ আদালত নির্বাচনকালে কিংবা অন্য কোনো সময়ে অনির্বাচিত সরকারের হাতে দেশ যেন না যায়, সে জন্য সুস্পষ্ট রায় দিয়েছেন। এ থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

আমরা বারবার দেখছি, নির্বাচন এলেই সংবিধান পরিবর্তনের দাবি তোলা একটি মহলের জন্য অনেকটা ফ্যাশনের মতো হয়ে পড়েছে। বারবার এভাবে সংবিধান পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

প্রথম ও দ্বিতীয় দফা সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ওপর জোর দিয়েছেন। সবার জন্য নির্বাচনী মাঠে সমান সুযোগ সৃষ্টি কোনো বিশেষ দল বা জোটের দাবি নয়, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সবার দাবি। কখনও কখনও এর ব্যত্যয় ঘটতে আমরা দেখেছি। যেমন ঘটেছিল ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের সময়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু এর পরপরই দেখা গেল, বিচারপতি লতিফুর রহমানের সরকার পক্ষপাতপূর্ণ আচরণ করছেন, যার রেশ চলে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত। এখন সমান সুযোগের ইস্যুটি তুলছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আজ বৃহস্পতিবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। আজই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপের বিষয়ে দল ও জোটের অভিমত সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরবেন। বলা যায়, নির্বাচনের রোডম্যাপের চূড়ান্ত পর্যায় শুরু হয়ে গেছে।

কেউ আর এখন নির্বাচনের বাইরে থাকবে না, এমন পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব সংশ্নিষ্ট সবার। তবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক। তফসিল ঘোষণার পর তাদের নিয়ন্ত্রণে অনেক কিছু চলে যাবে। সব দল ও প্রতিটি আসনের প্রার্থীরা সমান সুযোগ পাচ্ছেন কিনা, কেউ বেশি সুযোগ পাচ্ছেন কিনা, কারও সঙ্গে বৈরী আচরণ করা হচ্ছে কিনা- সবকিছু দেখার দায়িত্ব তাদের। প্রথম দিনের সংলাপে ড. কামাল হোসেন সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সেটাই দ্বিতীয় দফার সংলাপের শুরুতে স্পষ্ট করেন। এর যদি কোনো ব্যত্যয় ঘটে, সেটা নিয়ে যে কোনো দল কিংবা প্রার্থীরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে রিটার্নিং অফিসার কিংবা নির্বাচন কমিশনে গিয়ে আলোচনা করতে পারেন। অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। অতীতে আমরা দেখেছি, প্রধান দলগুলোর প্রতিনিধিরা নির্বাচনী প্রচারাভিযান চলাকালে বারবার নির্বাচন কমিশনে গিয়েছেন। এমনকি স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেও এটা দেখা গেছে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের সংস্কৃতি চালু হয়েছে, এটা ভালো দিক। টানা ৭ দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার জোট ১৪ দলের নেতাদের নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রতিটি আলোচনা শেষে অংশগ্রহণকারীরা চমৎকার পরিবেশে আলোচনার কথা জানিয়েছেন। সব পক্ষ নিজ নিজ অবস্থান তুলে ধরেছেন। বিপক্ষের কথা শুনেছেন। প্রধানমন্ত্রী সবার কথা বিশেষ মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। এ ধারা আগামীতে অব্যাহত থাকবে, এটাই কাম্য। সামনে নির্বাচন। নির্বাচনের প্রচারকালে এ ধরনের সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকবে, এটাই কাম্য। বিশেষভাবে প্রত্যাশা থাকবে, নির্বাচনের ফল যেন সব পক্ষ মেনে নেয়। নতুন যে সরকারই আসুক, তারা যেন জনগণের কাছে প্রদত্ত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ করতে পারে, তার পরিবেশ বজায় রাখার কথাও ভাবতে হবে।

সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ