ভুল পথে যাত্রার দিন, কলঙ্কিত দিন

ফিরে দেখা

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৮

ভুল পথে যাত্রার দিন, কলঙ্কিত দিন

  অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর একটি কলঙ্কিত দিন। 'সিপাহি-জনতার বিপ্লবের' নামে এদিন ইতিহাসের চাকা উল্টোমুখী করার ভিন্নতর ঘৃণ্য একটি অধ্যায়ের সূচনা হয় সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে, যার রেশ চলে পরের ২১টি বছর। এদিন থেকে ৩০ লাখ নারী-পুরুষ-শিশুর রক্তে অর্জিত বাংলাদেশে নিষ্ঠুর সামরিক শাসন বলবৎ হয়।

৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল ১৫ আগস্ট। খোন্দকার মোশতাক আহমদ-ফারুক-রশিদ-ডালিমচক্র জাতির পিতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মীকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে। এ হত্যাকাণ্ড ছিল রাষ্ট্র ও সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায়। ১৫ আগস্ট যে অপশক্তি সংবিধান লঙ্ঘন করে, নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে বলপূর্বক ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল, তারা কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রেরিত বাহিনীর সদস্যদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়ার। রাষ্ট্রীয় মদদে আমরা সম্প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা ঘটতে দেখি তুরস্কের সৌদি দূতাবাসে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, সৌদি ভিন্নমতাবলম্বী খাসোগিকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে সৌদি আরবের ক্ষমতাসীনদের নির্দেশে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে এ হত্যাকাণ্ডের বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ধরনের সুবিধা থাকলে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কারা প্রবেশ করেছিল, কীভাবে তারা বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে এসেছিল, কীভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছিল- সবকিছু ধরা থাকত সিসিটিভির ফুটেজে।

আমরা জানি, ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের ঘাতকরা অভিন্ন। এ কারণে দুটি হত্যা মামলার বেশিরভাগ আসামি অভিন্ন। তাদের মূল টার্গেট ছিল আওয়ামী লীগকে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নেতৃত্বশূন্য করা। তবে তাদের প্রকৃত লক্ষ্য ছিল, ১৯৭১ সালে যে অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশের চেতনা ধারণ করে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, তার ওপর আঘাত হানা। কেবল ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে খোন্দকার মোশতাক আহমদ জাতীয় চার নেতাকে হত্যার আদেশই দেননি; তাদের গ্রেফতার করা হয় ২২ আগস্ট। তাদের কী অন্যায় ছিল? ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর তারা কেন মিছিল-সমাবেশ সংঘটিত করেননি। কোনো বিবৃতি দেননি। খোন্দকার মোশতাক আহমদ তাদের মন্ত্রিত্বের লোভ দেখিয়েছিলেন। মন্ত্রিসভার সদস্য হতে বলেছিলেন। তারা ঘৃণাভরে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারণ তারা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সহযোদ্ধা। জীবনের বিনিময়ে এই আদর্শ তারা রক্ষা করেছিলেন। ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব তাদের টলাতে পারেনি। আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যে দর্শন, সেটা তারা ধারণ করতে দৃঢ়সংকল্প ছিলেন।

১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের ঘাতকদের অনুসারীদের ঘৃণ্য তৎপরতা আমরা দেখি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। তারা বুঝতে পারে, আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা একই আদর্শ বহন করে চলেছেন। তিনি এ আদর্শ বাস্তবায়নে দৃঢ়পণ। তাই তাকে এবং তাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগে যে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে, তাকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী-ফ্রিডম পার্টির জোট ২০ বারের অধিক চেষ্টা চালিয়েছে। তিনি নিজেও বলছেন, ঘাতকের বুলেট সর্বদা তাকে তাড়া করে বেড়ায়। এর বিপরীতে কেউ কি একটি ঘটনারও উল্লেখ করতে পারবেন, যেখানে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর পক্ষের কোনো ব্যক্তি কিংবা সাম্প্রদায়িক অপআদর্শের অনুসারী কেউ আক্রান্ত হয়েছে? প্রকৃতপক্ষে, গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল শক্তির ওপরেই বারবার হামলা হয়েছে। ১৯৭১ সালের চেতনার ওপর একের পর এক নিষ্ঠুুর আঘাত হানা হয়েছে।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল। ৩ নভেম্বর জেলহত্যার ঘটনায় তা আরও প্রকট হয়। এ সুযোগে নানা গোষ্ঠী নিজেদের প্রভাব বাড়াতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। একটি পক্ষ ছিল বঙ্গভবনে খুনি ফারুক-রশিদের সঙ্গে অবস্থানকারী খোন্দকার মোশতাক আহমদ। আরেক পক্ষ ছিল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে। তাকে ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট খোন্দকার মোশতাক আহমদ সেনাবাহিনী প্রধান পদে নিয়োগ দেন। জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন। ধূর্ত, উচ্চাভিলাষী ও ক্ষমতালোভী হিসেবেই তিনি পরিচিত ছিলেন।

১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাসদ বা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল নামে যে হঠকারী রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব, তারাও ১৫ আগস্টের পর নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান সামনে রেখে প্রকৃতপক্ষে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর পক্ষেই কাজ করছিল। তরুণদের একটি অংশকে তারা বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়। তবে দলের মূল শক্তি হয়ে উঠেছিল ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তি। ১৫ আগস্টের পরেই জাসদ গণবাহিনী তৈরি করে। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নাম দিয়ে তারা সেনাবাহিনীর মধ্যেও কাজ করতে থাকে। এ শক্তির নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল (অব.) তাহের। ১৫ আগস্টের পর তারা অনুকূল পরিবেশ পেয়ে যায়। ৭ নভেম্বরে এসব অপশক্তির জোট আমরা দেখতে পাই। তাদের লক্ষ্য ছিল- মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির অবস্থান সংহত হতে না দেওয়া। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীও এ সময়ে ভারতবিরোধী রাজনীতি নিয়ে সক্রিয় ছিলেন।

১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের বীর সেক্টর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ২ নভেম্বর অভ্যুত্থান সংঘটিত করে সে কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাকে 'আওয়ামীপন্থি' ও 'ভারতপন্থি' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের অপর বীর নায়ক মেজর হায়দারসহ তাকে হত্যা করা হয় জিয়াউর রহমানের নির্দেশে। ক্ষমতা সংহত করে জিয়াউর রহমান জাসদের ওপরেও চরম আঘাত হানেন। তিনি জাসদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রায় সবাইকে কারাগারে নিক্ষেপ এবং প্রহসনের বিচারের পর ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই কর্নেল তাহেরের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করেন। এ সময়ে সেনাবাহিনীর অনেক জওয়ানকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ছয় বছর ক্ষমতায় থাকাকালে জিয়াউর রহমান সাম্প্রদায়িক অপশক্তির উত্থান ও বিকাশে সব ধরনের সহায়তা দেন। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি পায় নিরাপদ আশ্রয়। আলবদর-রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা গোলাম আযমকে তিনি দেশে ফিরিয়ে আনেন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেন। ১৯৯১ সালের মার্চ মাসে ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়াও একই নীতি অনুসরণ করতে থাকেন। তার আমলেই আমরা দেখি বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে প্রতিবেশী ভারতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য জঙ্গি শক্তিকে ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানায় ১০ ট্রাক অস্ত্র খালাসের ঘটনা এরই অংশ ছিল।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনায় যেসব শক্তি সক্রিয় ছিল, তারা একই মতাদর্শের অনুসারী। এখন বিএনপি যে ২০ দলীয় জোটে রয়েছে, তাদের আদর্শও অভিন্ন। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্য করলেও তারা জামায়াতে ইসলামীকে কোনো অবস্থাতেই ত্যাগ করতে রাজি নয়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারা সংলাপ চালাচ্ছেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রের ধারা থেকে সরে আসতে আন্তরিকতা আছে বলে মনে হয় না। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করার জন্য শেখ হাসিনার সরকার সর্বোচ্চ ছাড় দিতে প্রস্তুত। উৎসবমুখর হয়ে উঠুক নির্বাচনের পরিবেশ- এটাই তিনি চাইছেন। কোনোভাবেই যেন নির্বাচন কেউ ম্যানিপুলেট করতে না পারে, এটা সবার কাম্য। আমরা নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্ব দেখেছি ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনে। এর পুনরাবৃত্তি নয়। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে হবে। এটাও বুঝতে হবে যে, নির্বাচনে সব পক্ষ জয়ী হয় না। একটি বা দুটি নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে না পারলেই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে না। যে কোনো রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য রাখতে হয় অনেক দূরের প্রতি। শেখ হাসিনা আগামী ১০০ বছর পর বাংলাদেশ পরিবেশগতভাবে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে, তার প্রতিও নজর রাখতে শুরু করেছেন। তার ভিশন আছে। অন্যদেরও এ থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্য থেকে প্রধানমন্ত্রী আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে খালেদা জিয়া তার ছোট ছেলের মৃত্যুর পর সমবেদনা জানাতে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন দেখছি, গণভবনের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত। তিনি উদার মন নিয়ে যে কোনো সমস্যার সর্বোত্তম সমাধান চাইছেন। অন্যপক্ষকেও এটা উপলব্ধি করতে হবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বর যে প্রতিশোধের রাজনীতি আমরা দেখেছি, তার পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। সাংবিধানিক সংকটের পথে দেশকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়; রাষ্ট্রবিজ্ঞানী


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ