সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলো আছে কি

রাজনীতি

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৮

  মহিউদ্দিন খান মোহন

২০০৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যখন অচলাবস্থা চলছিল, তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টারা বেশ পেরেশান হচ্ছিলেন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি সমঝোতা স্থাপনের জন্য। প্রায় প্রতিদিনই তারা এখানে-সেখানে ছুটে যাচ্ছিলেন। দু'পক্ষের মধ্যে সমঝোতার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে বর্ষীয়ান সাংবাদিক মাহবুবুল আলম (বর্তমানে মরহুম) ছিলেন অত্যন্ত তৎপর। তারা যখন দূতিয়ালি করছিলেন, তখন একদিন এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, আপনারা তো সমস্যা সমাধানের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন; কিন্তু কোনো সম্ভাবনা দেখছেন কি? জবাবে মাহবুবুল আলম বলেছিলেন, 'সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে।' না, শেষ পর্যন্ত সে ক্ষীণ আলো প্রজ্বলিত শিখা হয়ে রাজনীতির সেই অন্ধকার দূর করতে পারেনি। তার আগেই দপ করে তা নিভে গিয়েছিল। এমনকি যিনি সে সময় সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে ক্ষীণ আলোর রেখা দেখে ভালো কিছু আশা করেছিলেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টার পদ থেকে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক সংকটের ঘনঘোর অন্ধকার ছেয়ে ফেলেছিল চারদিক। তারপর কী ঘটেছিল, তা সবারই জানা।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সংকটও ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা। নির্বাচন নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা। একটি কথা না বললেই নয়। প্রতিবার নির্বাচন আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংকটের উদ্ভব হয়। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমনটি সাধারণত হয় না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে সংবিধান নির্দেশিত বিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট মেয়াদ পরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। একমাত্র আমাদের দেশেই নির্বাচন নিয়ে নানা রকম জটিলতার সৃষ্টি হয়। এটা কেন হয়? এটা হয় রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থাহীনতার কারণে। এখানে এক দল আরেক দলকে বিশ্বাস করে না। ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দলগুলো এমনই অস্থির হয়ে ওঠে যে, তারা যে কোনো উপায়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল, এমনকি নিশ্চিহ্ন করতে তৎপর হতে দ্বিধা করে না। ফলে তাদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব রাজনৈতিক অঙ্গনকে পরিণত করে যুদ্ধক্ষেত্রে। এখানে ভোটের আগেই জিতে যেতে চায় সবাই। ফলে পরাজয় এসে একসময় সবাইকেই গ্রাস করে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরেও সৃষ্টি হয়েছে একই পরিস্থিতি। বিরাজমান অবস্থায় অনেকের মনেই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে। নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে কিনা, নিলেও প্রচারণাসহ অন্য সব ব্যাপারে সমান সুযোগ পাবে কিনা, এসব প্রশ্নও রয়েছে। এমনি পরিস্থিতিতে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে একটি সংলাপ বা আলোচনার প্রয়োজন অনুভব করছিলেন সবাই। বর্তমানে সরকারের বাইরে থাকা বৃহৎ দল বিএনপি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করার উপায় বের করতে একটি সংলাপের দাবি জানিয়ে আসছিল প্রায় দুই বছর আগে থেকেই। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা তাতে কর্ণপাত করেনি। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে ড. কামাল হোসেন সংলাপের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেওয়ার ১৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সম্মতি জানান। প্রধানমন্ত্রীর এ ত্বরিত সম্মতি জনমনে কৌতূহল সৃষ্টি করলেও সবাই এই ভেবে আশ্বস্ত হতে চেয়েছিলেন যে, এ সংলাপ থেকে একটি ইতিবাচক ফলাফল হয়তো বেরিয়ে আসবে। তারা এটাও আশা করেছিলেন, সরকার ও ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ শেষে তেমন একটি ঘোষণা শোনা যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণের সে আশা পূরণ হয়নি। ১ নভেম্বর ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সরকার পক্ষের সংলাপের পর যা পাওয়া গেছে, তাকে আর যাই হোক আশাব্যঞ্জক বলার সুযোগ নেই। আলোচনাটি ছিল রুদ্ধদ্বার। ফলে সব খবর বিস্তারিতভাবে বাইরে আসেনি। বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে যেসব টুকরো খবর বাইরে এসেছে তাতে এটা স্পষ্ট যে, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। বিশেষত সংলাপ শেষে গণভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের 'আলোচনায় আমরা সন্তুষ্ট নই' মন্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদিও ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন একই স্থানে সাংবাদিকদের 'আলোচনা ভালো হয়েছে' বললেও তার বাসভবনে প্রেস ব্রিফিংয়ে বললেন, সংলাপ থেকে বিশেষ কোনো সমাধান পাইনি। ফলে এটা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, ঐক্যফ্রন্ট-সরকার আলোচনার ফলাফল এখনও শূন্য। এটা আরও স্পষ্ট হয়ে যায়, ওইদিন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের 'ঐক্যফ্রন্ট চাইলে আবারও সংলাপ হবে' মন্তব্য থেকে। তিনিও কিন্তু আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে এমন দাবি করেননি। সে সূত্র ধরেই সম্ভবত পুনরায় আলোচনার আহ্বান জানিয়ে ঐক্যফ্রন্ট প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে চিঠি পাঠিয়েছে গত ৪ নভেম্বর। আর তার আগের দিন তারা চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশনকে সংলাপ শেষ হওয়ার আগে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা না করার আহ্বান জানিয়ে। এ লেখাটি প্রকাশ হওয়ার আগেই হয়তো ঐক্যফ্রন্টের চিঠি দুটির বিষয়ে ফয়সালা জানা যাবে। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণায় বিলম্ব করে কিনা এবং সরকার পুনরায় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনায় বসে কিনা, সেটাও জানা যাবে।

এদিকে অনুষ্ঠিত সংলাপ নিয়ে সর্বত্র চলছে বিচার-বিশ্নেষণ। সবাই এই সংলাপ প্রক্রিয়া থেকে একটি ইতিবাচক ফলাফল আশা করছেন। তারা মনে করছেন, দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে একটি অর্থবহ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপায় খুঁজে বের করতে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আন্তরিক হবেন। দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা অভিমত প্রকাশ করেছেন, উভয় পক্ষের ছাড়ের মধ্যেই সমাধানের সূত্র লুকিয়ে আছে। তারা এটাও মনে করছেন, সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের জন্য প্রয়োজনে আরও সংলাপ হতে হবে। এ প্রসঙ্গে গত ৩ নভেম্বর সমকাল 'আশা জেগে থাক' শিরোনামে দেশের বিশিষ্টজনের যে অভিমত তুলে ধরেছে, তা প্রণিধানযোগ্য। তারা বলেছেন, ক্ষমতাসীন পক্ষ যদি নিজেদের সিদ্ধান্তের বাইরে না যাওয়ার অবস্থানে অনড় থাকে, তাহলে সংলাপে সফলতা আসবে না। সংলাপ সফল করতে বিরোধী পক্ষকেও তাদের সাত দফায় কাটছাঁট করতে হবে। তারা এও বলেছেন, সংলাপ ব্যর্থ হলে ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে দেশের সামনে। কারণ অতীতে যখনই সংলাপ ব্যর্থ হয়েছে, তখনই দেশ সংকটে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেছেন, সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়া হবে না, কারও বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা হয়ে থাকলে সরকার দেখবে, সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানে বিদেশি পর্যবেক্ষক আসায় বাধা নেই- সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর এসব প্রতিশ্রুতি বড় অর্জন। সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে এ অর্জনগুলো কাজে লাগবে। অন্যদিকে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার 'সংবিধানের বাইরে যাওয়া যাবে না- আওয়ামী লীগের এ অবস্থানকে সমস্যা সমাধানের অন্তরায় মনে করছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের এখন মূল সমস্যা হলো আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কিনা। সংলাপে এ সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়নি। তারপরও সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে। বিশিষ্ট লেখক-গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, দু'পক্ষের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। জনগণ তাদের ওপর আশা করছে সমাধানের পথ পাওয়া যাওয়ার। সংলাপ ব্যর্থ হলে তারা জনগণের আস্থা হারাবেন। একই বিষয়ে একই দিনে দৈনিক যুগান্তর কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের মন্তব্য তুলে ধরেছে। পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. সা'দত হুসাইন বলেছেন, 'একদিনের সংলাপের মাধ্যমেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে এমন মনে করা উচিত নয়। এ জন্য সময় লাগবে। তবে একটা পরিবেশ সৃষ্টির সুযোগ এসেছে। সংলাপের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছেন, এ সংলাপের বড় অর্জন দুটি পক্ষের অনমনীয় অবস্থানের বরফ গলেছে। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে শুনেছি। এটা দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেছেন, সংলাপে জনগণের জন্য কতটা লাভ হয়েছে বলার সময় আসেনি। তবে টানেলের শেষ প্রান্তে আলোর রেখা দেখতে পাই। এর সফলতা নির্ভর করছে সব পক্ষের সদিচ্ছার ওপর।

সংলাপের শেষ পরিণতি নিয়ে মন্তব্য করার সময় এখনও আসেনি। কারণ সব পক্ষই সংলাপের দরজা খোলা রাখতে চায়। কিন্তু সবকিছুরই তো একটা শেষ আছে। সেই শেষটা কেমন হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। সরকার পক্ষের কথাবার্তা থেকে এটা স্পষ্ট যে, ঐক্যফ্রন্টের এক নম্বর দাবি তারা মানতে নারাজ। আর ঐক্যফ্রন্ট তথা বিএনপির মূল দাবি এক নম্বরে। চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিটি যদি অপূর্ণ থাকে, তাহলে তারা সে দাবি আদায়ের জন্য শেষ পর্যন্ত যদি আন্দোলনের পথেই হাঁটতে শুরু করে, তাহলে দেশের রাজনীতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। আর সে জন্যই প্রশ্ন উঠেছে- সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আসলেই কোনো আলোর আভাস রয়েছে কিনা।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ