চাকরিতে আবেদন

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৮

  নাজমুল হোসেন 

সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়স বাড়াতে সাত বছর ধরে মাঠে নেমে আন্দোলন করছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী। ২৭ অক্টোবর রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী আন্দোলন প্রাঙ্গণ শাহবাগে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছরের দাবিতে মাঠে জড়ো হয়েছিল কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। বলা চলে, এই বয়স বৃদ্ধির আন্দোলনের ইতিহাসে এটাই ছিল সম্ভবত সবচেয়ে বড় কর্মসূচি।

এর আগেও জাতীয় বড় কর্মসূচি ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলায় কম পালিত হয়নি। দেশের ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলনের বহু সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যতগুলো আন্দোলন হয়েছে, সবগুলোতেই মুখ্য ভূমিকা রাখার অবদান ছাত্রদেরই দখলে। প্রতিটা আন্দোলনেরই শুরুর কেন্দ্রবিন্দু ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সময়ে সময়ে বিভিন্ন আন্দোলনে সেখানকার ছাত্ররাই এসব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। বলা চলে, প্রায় সব আন্দোলন সফল হয়েছে। তেমনিভাবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছরকরণের আন্দোলনটাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়। বিশেষ করে ২০১২ সাল থেকে এই আন্দোলন জনপ্রিয়তা পেতে থাকে দেশব্যাপী। যার ফলে বিগত বছরগুলোতে এ দাবিতেই সারাদেশের ৬৪টি জেলায়ও বিক্ষিপ্তভাবে আন্দোলন হয়েছে বহুবার। এখন এ আন্দোলন দমন হবে বোকামি।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি যেখানে ২০১২ সাল থেকে চলতি বছরেও সময়ে সময়ে কয়েকবার বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩৫ বছর করতে সুপারিশ করেছে, সেখানে তবুও কেন কোনো কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি? তাহলে কি এমন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সুপারিশও সরকারের কাছে মূল্যহীন? কিছুদিন আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আন্দোলনকারীরা মেধাকে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতীকী ফাঁসি নামক কর্মসূচিতে কয়েকজন ফাঁসিতে ঝুলে ক্ষোভ প্রকাশ করলে তার চিত্র স্বনামধন্য বিদেশি টেলিভিশন আলজাজিরাও প্রচার করে। তাহলে প্রশ্ন আসে, বহির্বিশ্বের কাছে আমাদের গণতান্ত্রিক নীতি ও দেশের ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াল? যতদূর জানি, বিশ্বের কোথাও চাকরির বয়স বাড়ানো নিয়ে আন্দোলন হয়নি। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই একটি শান্তিপূর্ণ বিরল আন্দোলন। আন্দোলনের মানে যদি জ্বালাও-পোড়াও বা ভাংচুর হতো, তাহলে হয়তো তারা সেটাই করে দেখাত। বুঝতে হবে, এখানে আন্দোলনকারীরা সিংহভাগই উচ্চশিক্ষিত। তারা সচেতন বলেই এমন ধ্বংসাত্মক বা সহিংস আন্দোলন করেনি।

আমাদের সরকার তো বারবারই বিভিন্ন সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলনে বলছে, তরুণরাই দেশ গড়ার হাতিয়ার। তরুণরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাহলে কেন তরুণদের এভাবে দমিয়ে রাখা হচ্ছে বয়সের শৃঙ্খলে? গত কয়দিন আগে প্রধানমন্ত্রী তরুণদের কাছে ভোট চেয়েছেন। আর তরুণদেরই তিনি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তার হিসাবের খাতায় বড় ভোটব্যাংক হিসেবে ধরে নিচ্ছেন। বাস্তবেও তাই, দেশে অনূর্ধ্ব ৩৫ বছর বয়সী বর্তমান ভোটার সংখ্যা দুই কোটি ২৫ লাখ। তরুণদের বয়স বাড়ানোর দাবির যে ক্ষুধা দৃশ্যমান হচ্ছে, তাতে ৩৫ করে দিলে নিশ্চয় তারা নিজেরাসহ তাদের পরিবারের ভোটও বর্তমান সরকারকেই দেবে। আর এতে করে স্বাভাবিকভাবে তরুণদের দখলে থাকা ভোটব্যাংকের সংখ্যাটা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি ক্ষমতাসীন সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী ও সরকার-সংশ্লিষ্টদের ভাবা উচিত। গত নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকার তরুণদের বয়স বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। কিন্তু বর্তমান মেয়াদের ক্ষমতার এই শেষ সময়েও কি তার বাস্তবায়ন হবে না?

প্রকৌশলী, লেখক ও প্রাবন্ধিক

nazmulhussen@yahoo.com


মন্তব্য যোগ করুণ