এক মিনিটের সমাধান এবং চমকের অপেক্ষা

সময়ের কথা

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৮

এক মিনিটের সমাধান এবং চমকের অপেক্ষা

  অজয় দাশগুপ্ত

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন ৩০ অক্টোবর (২০১৮) বলেছেন, 'অবশ্যই নির্বাচন সংবিধানসম্মত হবে। অসাংবিধানিকভাবে তো নির্বাচন করা যায় না। লক্ষ্য তো একটা- সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন। সংবিধান ও আইন পরিবর্তন তো কোনো ব্যাপারই না- এক মিনিটেই হতে পারে।'

তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের প্রণেতা-রচয়িতা বলে দাবি করেন। তিনি নিজে যতটা বলেন এ বিষয়ে, তার গুণমুগ্ধরা বলেন আরও জোরে। তিনিই চাইছেন- এক মিনিটে সংবিধান পরিবর্তন করা হোক! তবে এখন তিনি যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তার মূল শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। এ দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। তিনি অবশ্য এক মিনিটেই দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আবির্ভূত হন। ড. কামাল হোসেন যে সংবিধান রচনা করেছেন, তা ছিল সংসদীয় ধাঁচের। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি এ সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে- প্রতিষ্ঠা হয় এক দল 'বাকশাল' এবং রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন। এ সংশোধনী উত্থাপন করেছিলেন সে সময়ের চিফ হুইপ, বর্তমানে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন (বঙ্গবন্ধুর খুনের প্রধান হোতাদের একজন খোন্দকার মোশতাক আহমদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন তিনি)। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে সংবিধানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছিলেন এবং সেটা করেছিলেন ১৯৭৭ সালে কলমের এক খোঁচায়। ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী অনুমোদন হয়েছিল। কিন্তু জিয়াউর রহমান সংবিধান সংশোধন করেন সামরিক শাসক হিসেবে, ১৯৭৭ সালে। বলা যায়, ড. কামাল হোসেন এক মিনিটেই সংবিধান সংশোধনের জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত পদ্ধতিটি বেশ পছন্দ করেন। ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর যেমন 'এক মিনিটে সংবিধান সংশোধন' করা যায় বলে তিনি মন্তব্য করেছেন, একই ধরনের কথা বলেছিলেন ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর। সে সময়ে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছিল। অন্যদিকে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট চাইছিল শেখ হাসিনার পদত্যাগ। তারা একের পর এক মিছিল-সমাবেশ-হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছিল। ২৭ নভেম্বর ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী চাইলে এক মিনিটে সংকটের সমাধান হতে পারে। এখন তার পদত্যাগের কথা বিবেচনা করা উচিত।'

পপশিল্পী ফিরোজ সাঁইয়ের একটি গানের কলি- এক সেকেন্ডের নাই ভরসা/ বন্ধ হইবে রঙ তামাশা/ চক্ষু মুদিলে- হায় রে দম ফুরাইলে।'

মঞ্চে এ গান গাইতে গাইতেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এক সেকেন্ড নয়, ড. কামাল হোসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দুই দফায় এক মিনিট বা ৬০ সেকেন্ড সময় দিয়েছেন। এখন দেখা যাক, প্রধানমন্ত্রীর দম ফুরায় কিনা। চলমান সংলাপ নিয়ে একজন খ্যাতিমান কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক বলেছেন, "নার্ভের খেলা চলছে। ড. কামাল হোসেন এবং তিনি বিএনপিসহ যেসব দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের নেতাদের ধারণা ছিল, শেখ হাসিনাকে সংলাপের জন্য যে চিঠি দেওয়া হয়েছে 'তা পত্রপাঠ নাকচ' করে দেওয়া হবে। এটাকেই তারা ইস্যু করবেন। কিন্তু শেখ হাসিনা এক মিনিটেই সংলাপের দাবি গ্রহণ করে নিলেন।"

সম্ভবত এ কারণেই ১ নভেম্বর গণভবনে গিয়ে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা সবকিছু আউলিয়ে-গুলিয়ে ফেলেন। তারা এখন বলছেন, সব কথা বলা হয়নি। ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের মতো ঝানু সংবিধান বিশেষজ্ঞ (একজন তো সংবিধান প্রণেতাই) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তারা নাকি বিষয়টি ঠিক বোঝাতে পারেননি। এখন তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাতে হবে 'বিশেষভাবে জ্ঞাত, যুক্তিতর্কে পারদর্শী ব্যক্তিদের'। তাদের নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতারা ইতিমধ্যে বৈঠকও করেছেন। দেখা যাক, ৭ নভেম্বর ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের চেয়েও 'বড় ঝানু সংবিধান বিশেষজ্ঞরা' প্রধানমন্ত্রীর সামনে কী যুক্তি উপস্থাপন করেন। তারাও কি 'এক মিনিটেই সমাধানের' যে পথ সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও এইচএম এরশাদ (এবং পাকিস্তান আমলে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ও জেনারেল ইয়াহিয়া খান) দেখিয়ে গেছেন, সে পথেই চলবেন?

জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন। তবে একই বছরের ২৪ আগস্ট তাকে সেনাবাহিনীর প্রধান পদে নিয়োগ দিয়ে খোন্দকার মোশতাক আহমদ এর সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সে সময়ের নেতা ছিলেন মেজর (অব.) এমএ জলিল ও আ স ম আবদুর রব। জিয়াউর রহমানকে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তারাই ক্ষমতায় এনেছেন, এমন দাবি তারা করছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ নভেম্বর এই দুই নেতা 'জঙ্গি জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার' জন্য যেসব করণীয় নির্ধারণ করেন, তার এক নম্বরটি ছিল নিম্নরূপ- 'ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে জনতার প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন করতে হবে। যেন কোনো ভারতীয় চর, চোরাচালানি ও পাচারকারী এ দেশের মাটিতে পা ফেলতে না পারে, যেন বাংলাদেশের কোনো গ্রামে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, মজুদদারি, খুন, রাহাজানি, চুরি, ডাকাতি সংঘটিত হতে না পারে।' তাদের দাবি ছিল, 'বাকশাল ব্যতীত সকল প্রকাশ্য ও গোপন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকার গঠন করা হোক।'

একই দিনে সামরিক আইন বিধি জারি করে নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান করেন জিয়াউর রহমান। বলা বাহুল্য, এর প্রধান টার্গেট ছিল কর্নেল তাহের, মেজর এমএ জলিল ও আ স ম আবদুর রবের সমর্থকরা। কর্নেল তাহেরসহ অনেকের প্রাণ যায় এ বিধানের কারণে।

এখন আ স ম আবদুর রব নতুন করে জাতীয় ঐক্যের কথা বলছেন। কাদের সিদ্দিকীও বলছেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চাইছেন শেখ হাসিনার কাছে। জিয়াউর রহমানের আমলে এই প্রতিবাদকারীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করা হয়েছিল।

মেজর জলিল ও আ স ম রবের দল জাসদের ওপর জিয়াউর রহমান চরম আঘাত হেনেছিলেন ১৯৭৫ সালের ২৫ নভেম্বর। এই দুই নেতাসহ জাসদের ১৯ জন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল জিয়াউর রহমানের নির্দেশে। পরদিন জাসদ সে সময়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার সমর সেনকে অপহরণের এক দুঃসাহসী অভিযান চালায়। ঘটনাস্থল ধানমণ্ডি দুই নম্বর সড়কে ভারতীয় দূতাবাস। সেখানে জাসদের চারজন কর্মীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পর জাসদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। এ সময়ে জিয়াউর রহমানের সমর্থকরা একটি লিফলেট বিতরণ করে; যাতে বলা হয়- '৭ নভেম্বর ছদ্মবেশে ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করে সকল সামরিক অফিসারকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল জাসদ। তারা সেনাবাহিনীকে নেতৃত্বহীন শক্তিতে পরিণত করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রবেশের পথ নিস্কণ্টক ও সুগম করতে চেয়েছিল। এ কাজের জন্য তারা রাশিয়া ও ভারতের কাছ থেকে পেয়েছিল লাখ লাখ টাকা।'

'রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই'- এটা প্রবাদের মতো হয়ে গেছে। এখন সংবিধান রচয়িতা বলছেন, এক মিনিটেই সংবিধান ওলটপালট করা সম্ভব। এক মিনিটে সংবিধান তছনছ করে দেওয়া ব্যক্তি জিয়াউর রহমান যাদের নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছেন, তারা বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধেছেন। দেখা যাক, সামনের দিনগুলো আরও কী চমক নিয়ে আসছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত ফ্যাক্টর দশকের পর দশক ধরে চলছে। ১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর গভীর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে খোন্দকার মোশতাকের নির্দেশে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়। সে রাতেই ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান সংঘটিত করেন। জেলহত্যার মতো ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটতে পারে, সে বিষয়টি তার মনেও আসেনি। তখন সর্বত্র গুজব- ভারত সবকিছু করছে। জাসদ নেতাদের কণ্ঠে ভারতবিরোধিতা। জিয়াউর রহমান বলছেন, বাংলাদেশের সব সমস্যার জন্য দায়ী ভারত। খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পেছনেও ভারত। এ জন্য বিপুল অর্থ বিলি করা হচ্ছে, এমন গুজব রটানো হয় পরিকল্পিতভাবে। সে সময়ে (১০ নভেম্বর, ১৯৭৫) ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস একটি গোপন বার্তা পাঠায় তাদের ওয়াশিংটনস্থ পররাষ্ট্র দপ্তরে। টেলিগ্রাম নম্বর ৫৪৭০-এর বিষয় ছিল 'গত সপ্তাহের বাংলাদেশ'। এতে উপসংহারে বলা হয়, খালেদ মোশাররফকে 'প্রো-ইন্ডিয়ান' বলা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ মেলেনি, যা থেকে এটা বলা যায়- 'We have no evidence that India was responsible for any of the weekÕs actionsÕ.

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনও ভারত ফ্যাক্টর গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কেউ তো বলেন, দিল্লিই সব কলকাঠি নাড়াচ্ছে। দেখা যাক, ভবিষ্যৎ এ বিষয়ে কী বলে।

ajoydg@gmail.com

সাংবাদিক


মন্তব্য যোগ করুণ