উল্টোপথে যাত্রার দুঃসময়

ফিরে দেখা

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৮

  ডা. এসএ মালেক

বঙ্গবন্ধুকে নৃশংস হত্যার মাধ্যমে ১৫ আগস্ট যে প্রতিবিপ্লব সংঘটিত করা হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বরে জেলহত্যা। সে সময়ে একটানা ২-৩ বছর জেল খাটেন অনেক কেন্দ্রীয় নেতা। তৎকালীন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা মনে করেছেন, প্রতিবাদ করে জেলে যাওয়ার চেয়ে আত্মসমর্পণ করে জেলে যাওয়াই শ্রেয়। তা না হলে এত বড় ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সুযোগ কেন কাজে লাগানো হলো না? মনে হয় সেদিন বিকল্প সরকার গঠন করে আন্দোলনের ডাক দিলে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে এত দেরি হতো না। প্রথম সারির নেতারা যখন কিছুই করলেন না, তখন দ্বিতীয় শ্রেণির নেতারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যারা সেদিন দলীয় নেতৃত্ব থেকে সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি বা অন্য কোনো কারণে নীরব রয়েছেন, তারাই পরবর্তী সময়ে জেনারেল জিয়ার অনুকম্পায় রাজনৈতিক দল নিয়ে তথাকথিত নির্বাচনে অংশ নিয়ে জিয়াকে স্বীকৃতি দেন। সেই থেকে শুরু মূল ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের পালা। ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত অভ্যুত্থান ঘটে গেল একের পর এক। খোন্দকার মোশতাককে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে জিয়াকে তথাকথিত বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতার অধিকারী করা হলো। এরপর জেনারেল জিয়া নিজেই অসংখ্য সেনাসদস্যকে হত্যা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নিজের অবস্থান মজবুত করলেন। এক সময় যারা সিপাহি বিপ্লবের কথা বলে ট্যাঙ্কের পিঠে দাঁড়িয়ে জিয়াকে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন, সেই গণবাহিনীর সদস্যদের জিয়া নির্মমভাবে হত্যা করলেন। জেলখানায় চার নেতার হত্যার মূল লক্ষ্য ছিল দেশে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি। খুনিরা ভালো করেই জানত, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী চার জাতীয় নেতা বেঁচে থাকলে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় যেতে সক্ষম হবে। হত্যার পরে কী দেখা গেল? কিছুদিন পর বিচারপতি সায়েমকে রেখে জিয়া নিজেই ক্ষমতা দখল করলেন এবং তারপর শুরু হলো ইতিহাস বিকৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ড। বিএনপি নেতারা প্রায়ই বলে থাকেন, রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টির কারণে জিয়াকে ক্ষমতায় বসতে হয়েছে। আসলে ক্ষমতায় বসার জন্যই জিয়া ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি করেছিলেন। এখন তো স্পষ্ট বোঝা যায়, কেন জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার সবচেয়ে বড় সুফলভোগী। সাড়ে ছয় বছর তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। ওই সময়ে রাষ্ট্রীয় পরিচালনা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন, তিনি প্রতিবিপ্লবের নেতা ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী তিনি। তা না হলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া এবং কুখ্যাত ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করলেন কেন? খুনিদের বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দেওয়া ও দেশে এনে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিলেন, সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ সবকিছুই তো জিয়া করেছেন। কোন দায়বদ্ধতার কারণে এসব করা হয়েছে। তা কি এ দেশের মানুষ বুঝতে অক্ষম? শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করাই একমাত্র লক্ষ্য ছিল না, লক্ষ্য ছিল বিপ্লবের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীন দেশের জন্ম দিলেন এবং যে বিপ্লবের ধারায় তিনি বাংলাদেশকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন, সেই বিপ্লবের প্রতিবিপ্লব ঘটানো ছিল জিয়ার একমাত্র লক্ষ্য।

জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সংবিধান, রাষ্ট্রীয় পরিচালনা নীতি, উন্নয়ন প্রভৃতির কথা বলে সর্বক্ষেত্রেই জিয়া প্রমাণ করেছিলেন, তিনি প্রতিবিপ্লবের নায়ক ছিলেন। মনে হয় খুনি, লোভী মোশতাককেই জিয়া হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রলোভন দেখিয়েছিলেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রাণপুরুষকে হত্যা করিয়ে স্বাধীনতার শত্রুদের নিয়ে দল ও সরকার গঠন করে জিয়া কি প্রমাণ করেননি যে, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি ছিলেন না? ১৯৭১ সালে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করতে গিয়ে তিনি যে চাতুর্যতার আশ্রয় নিয়েছিলেন, পরে তার দলের নেতারা এটাকে কেন্দ্র করে ইতিহাস বিকৃতির দায়িত্বহীন কার্যকলাপ সুদীর্ঘ সময় অব্যাহত রেখেছেন এবং এখনও বলে যাচ্ছেন। আসলে যারা বাংলাদেশ চাননি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও জাতিসত্তার বিশ্বাসী নয়, এক কথায় স্বাধীনতার শত্রু, সেই জামায়াত-শিবিরচক্র আন্তর্জাতিক চক্রান্তের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট হয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে এবং সুদীর্ঘ ১৫ বছর সামরিক শাসন অব্যাহত রেখে স্বাধীনতাবিরোধী ধারায় বাংলাদেশকে পরিচালিত করে। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হয়ে সেই ধারার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। এখন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় অগ্রসরমান। তবু অতীতের গণবিরোধী রাজনীতির প্রভাব এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া ওদের লক্ষ্য নয়, ওদের লক্ষ্য রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা। বঙ্গবন্ধু পরিবারের স্বাধীনতার সপক্ষের দল আওয়ামী লীগের কোনো ব্যক্তিকে তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় দেখতে চায় না। তাই জাতীয় নির্বাচন এলে অংশগ্রহণ করে এবং এমন অবস্থার সৃষ্টি করে, যাতে ওই নির্বাচন অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। ওদের লক্ষ্য জোর-জবরদস্তি করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি এবং সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেওয়া। ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শকে ক্ষুণ্ণ করা। গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদবিরোধী শক্তিকে ইন্ধন জোগানো এবং যে অর্থে আজ বাংলাদেশ স্বাধীন তা সামগ্রিকভাবে বিনষ্ট করা। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে ওরা রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। এখনও এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। আজকের বাস্তবতা হচ্ছে, জননেত্রী শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা না করতে পারলে ওরা ওদের ষড়যন্ত্রকে দ্রুত এগিয়ে নেবে, যা দেশ ও জাতির জন্য ভয়াবহ অমঙ্গলজনক।

রাজনীতিক ও কলামিস্ট


মন্তব্য যোগ করুণ