শ্রীশ্রী শ্যামাপূজা ও এর তাৎপর্য

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৮

শ্রীশ্রী শ্যামাপূজা ও এর তাৎপর্য

  স্বামী দেবধ্যানানন্দ

'কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন'- শ্যামারূপে মুগ্ধ হয়ে এরূপ অসংখ্য শ্যামাসঙ্গীত রচনা করেছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত প্রমুখ সাধক শ্যামারূপ হৃদয়ে লালন করে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছেন। শ্রীশ্রী শ্যামাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মচর্চার অন্যতম পর্ব। ভক্ত ও সাধকের কাছে পূজা ও উপাসনার অন্যতম ভিত্তি 'প্রতিমা'। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, 'বাপের ফটোগ্রাফ দেখলে যেমন বাপকে মনে পড়ে, তেমনি প্রতিমায় সত্যের উদ্দীপন হয়।' তার সাধনপ্রসূত উপলব্ধ সত্য- মাতৃভাব শুদ্ধভাব, সাধনার শেষ কথা। শ্যামাপূজা প্রতিমায় মাতৃভাবে ঈশ্বরীর বা মহাশক্তির আরাধনা।

কালী নাম কালের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। জগতের সবকিছু কালে আসে, কালে যায়। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেন, 'কালই ব্রহ্ম, যিনি কালের সঙ্গে রমণ (লীলা) করেন, তিনি কালী।' কালী স্বরূপত এক, কিন্তু সাধকের অভীষ্ট অনুসারে কালিকাদেবীর বিভিন্ন রূপ যেমন দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী প্রমুখ শাস্ত্রে নির্দিষ্ট হয়েছে। শ্যামা বা কালীমূর্তি তত্ত্বময়ী। কালী শবরূপী শিবের বক্ষোপরি অবস্থিতা। শব নির্গুণ ব্রহ্মের প্রতীক। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেন, 'কালীই ব্রহ্ম, ব্রহ্মই কালী! একই বস্তু, যখন তিনি নিষ্ফ্ক্রিয়- সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় করছেন না- এই কথা যখন ভাবি, তখন তাকে ব্রহ্ম বলি। যখন তিনি এসব কার্য করেন, তখন তাকে কালী বলি, শক্তি বলি। একই ব্যক্তি নাম-রূপভেদ।' আমারটাই একমাত্র সত্য, অন্যেরটা সঠিক নয়- এমন সংকীর্ণতা আমাদের বিভেদ ও বৈষম্য সৃষ্টি করে। এক সত্য অনেক রূপে প্রকাশিত হতে পারে। সমন্বয় ও সম্প্রীতি চেতনার উন্মেষ ঘটায় প্রতিমা। এতে সত্যানুসন্ধানে পথচলা সহজ হয়।

কালীর বর্ণ কৃষ্ণ সম্পর্কে মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে- শ্বেত, পীতাদি বর্ণ যেমন কৃষ্ণবর্ণে বিলীন হয়ে তেমনই সর্বভূত কালীর মধ্যে বিলীন হয়। তিনি সবকিছু সংহার করেন বলে তার রূপ করালবদনা। গলায় মুণ্ডমালা পঞ্চাশৎ মাতৃকাবর্ণের প্রতীক। মাতৃকাবর্ণগুলো নামরূপাত্মক জগতের প্রতিনিধি। নামরূপাত্মক জগৎ কালিকা থেকে উদ্ভব হয়ে আবার তাতেই লয় হয়। তার পীনোন্নত স্তন সমস্ত জগৎ-প্রকৃতির প্রতিরূপ; প্রকৃতির মাধ্যমে তিনি সমস্ত জীবকে লালন করছেন। দেবীর ডানদিকে উপরের হাতে অভয় মুদ্রা আমাদের ভয়শূন্য হতে এবং নিচের হাতের বরমুদ্রা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে প্রেরণা জোগায়। দেবী বাম দিকের উপরে হাতে বিবেকরূপ খÿ দিয়ে নিচের হাতে মুণ্ডরূপ মোহ ছিন্ন করে আমাদের স্ব-স্ব কর্তব্যকর্মে প্রেরিত করছেন। দেবীর উল্লিখিত রূপ বিশ্বজগতে সৃষ্টি, স্থিতির সঙ্গে সংহার বা মৃত্যুর ব্যাপারে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আমাদের অন্তর্জগৎ বিশ্নেষণের সুযোগ করে দেয়। স্বভাবত সৃষ্টি ও স্থিতি, ভোগ, সুখ, প্রাচুর্য, উৎকর্ষ আমাদের প্রত্যাশিত হলেও মৃত্যু আমাদের প্রত্যাশিত নয়। স্বাস্থ্য সুরক্ষার নানা উপায় উদ্ভাবন করে আয়ু বৃদ্ধি করা গেলেও মৃত্যু নামক অবশ্যম্ভাবী ব্যাপারকে এখনও রোধ করা সম্ভব হয়নি। প্রজননের মাধ্যমে বংশ রক্ষা কিংবা সৃজনশীল কর্মের মাধ্যমেও আমরা বেঁচে থাকতে চাই দীর্ঘকাল। বেঁচে থাকার এসব প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে মন্দ নয়। সাধক ভক্ত মনে করেন, এভাবে মৃত্যুকে জয় করা সম্ভব নয়। তার কাছে মৃত্যু মানে পরিবর্তনশীলতা; শরীর বা সংশ্নেষিত বস্তুর উপাদান কারণে বিশ্নেষিত হওয়া। আমরা যখন জগতের সাপেক্ষে বিভিন্ন ব্যক্তি বা বস্তু চিন্তা করি, তখন বস্তু বা ব্যক্তির পরিবর্তনশীলতা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু সমস্ত জগৎ চিন্তা করলে কোনো বস্তু বা পরিবর্তনশীলতার প্রশ্ন আসে না। সমস্ত জগতের সঙ্গে কিংবা কালের সঙ্গে একাত্মবোধে মৃত্যুকে জয় করা সম্ভব। চিন্তাজগতে আমরা যত এগিয়ে যাই, পরিবর্তনশীল জগতের পশ্চাতে অপরিবর্তনীয় সত্তার উপলব্ধি আমাদের কাছে কাঙ্ক্ষিত হয়। শ্যামাপূজা ও উপাসনার উদ্দেশ্য মানবিক গুণাবলির বিকাশ, শুদ্ধ চিত্ত হওয়া; জগৎ কিংবা কালস্বরূপতা প্রাপ্ত হওয়া; অপরিবর্তনীয় উপাস্যের সঙ্গে একাত্ম হওয়া। তত্ত্বজ্ঞ সাধক গুরু-উপদিষ্ট বেদান্ত বিচার করে সমসত জগৎরূপ দৃশ্যকে ইন্দ্রিয়তে সংহার করেন। ইন্দ্রিয়গুলোকে মনে ও মনকে আত্মায় সংহার করেন ও আত্মবোধে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অভয়পদ প্রাপ্ত হন। প্রকৃতপক্ষে তত্ত্বস্বরূপিণী মা আমাদের বাইরে নন; অন্তরে। পূজা ও উপাসনা আমাদের অজ্ঞানরূপ বাধা দূর করে আত্মস্বরূপ মায়ের সঙ্গে একাত্ম হতে সহায়তা করে। 'অনন্ত শক্তিকে কোনো কিছু দিয়ে আবৃত করা যায় না। মা সর্বব্যাপিনী; তাই তিনি দিগম্বরী। কাব্যিক ভাষায় বলা হয়, দিকই তাঁর অম্বর বা আবরণ।'- প্রতিমার এ তত্ত্বও আমাদের সমস্ত জগতের সঙ্গে একাত্মতাবোধে উজ্জীবিত করে। শ্যামাপূজার অন্তর্নিহিত তত্ত্ব আমাদের সম্প্রীতিতে, ভয়শূন্যতায় উজ্জীবিত করে এবং পরার্থে কল্যাণ ভাবনা ও কর্মে নিয়োজিত হতে প্রেরণা জোগায়।

সন্ন্যাসী, রামকৃষ্ণ মঠ, ঢাকা


মন্তব্য যোগ করুণ