রাজনীতিতে আশার আলো

সংলাপ

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০১৮

রাজনীতিতে আশার আলো

আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আবদুস সোবহান গোলাপ মঙ্গলবার ড. কামাল হোসেনের বাসায় গিয়ে তার হাতে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেন

  এম হাফিজ উদ্দিন খান

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে যখন সংকটের ছায়া বিস্তৃত হচ্ছিল, তখন বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডিসহ বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে গঠিত নতুন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে বসতে রাজি হয়েছে সরকারের নেতৃত্বাধীন দল আওয়ামী লীগ। বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে বিষয়টি রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা। ২৯ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, 'জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে সংলাপে বসবেন তারা।' ৩০ অক্টোবর জানা গেল, সংলাপের জন্য ১ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আবদুস সোবহান গোলাপ ৩০ অক্টোবর সকালে ড. কামাল হোসেনের বাসায় গিয়ে তার হাতে আমন্ত্রণের চিঠি পৌঁছে দেন।

এর আগে (২৮ অক্টোবর) আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে সাত দফা দাবি এবং ১১টি লক্ষ্য সংবলিত চিঠি দেওয়া হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে। সংলাপের ওই আহ্বান নতুন করে জানানোর পর আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা প্রথমে নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে নানারকম বক্তব্য রাখেন। যা হোক, শেষ পর্যন্ত এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি রাজনীতিতে আপাতত আশার আলো ছড়িয়েছে। ইতিপূর্বে এই কলামেই সংলাপে বসে বিদ্যমান সংকট নিরসনের পথ খোঁজার বিষয়ে লিখেছিলাম। গণতন্ত্রে আলোচনার পথ কখনও রুদ্ধ থাকতে পারে না। আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যা-সংকট নিরসনের পথ খোঁজা দুরূহ নয়। অনেক জটিল সমস্যার সমাধানও আলোচনার টেবিলে বসেই করা সম্ভব। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমাদের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে। অতীতে আমাদের রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য বিদেশি ব্যক্তিবর্গও এসেছিলেন। কিন্তু তখন আমরা ইতিবাচক ফল দেখতে পাইনি। তবে এবার আমরা নিরাশ হতে চাই না। আমাদের কষ্টার্জিত গণতন্ত্রের পথ ইতিমধ্যে বহুবারই অমসৃণ হয়েছে এবং এ থেকে সৃষ্ট নানারকম বৈরী পরিস্থিতির মাশুল গুনতে হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষকে। এসব ক্ষেত্রে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা খুবই অপ্রীতিকর। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ক্রমেই এগিয়ে আসছে। এই নির্বাচন যাতে গ্রহণযোগ্য হয়, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের প্রচেষ্টা যাতে আর বেগবান ও সফল হয়, এই দায় রাজনীতিকদের।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক হয় এবং নির্বাচনী কার্যক্রম যাতে হয় প্রশ্নমুক্ত- এই দাবি সরকারের কাছে দেশ-বিদেশের নানা মহল থেকে ইতিমধ্যে উত্থাপিত হয়েছে। গ্রহণযোগ্য কিংবা প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনী মাঠে সবার সমান অধিকারের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ নিয়ে ইতিমধ্যে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। সৃষ্টি হয়েছে বৈরী পরিস্থিতিরও। সভা-সমাবেশসহ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করার ক্ষেত্রে বিরোধী পক্ষ ইতিমধ্যে নানারকম বাধা-বিপত্তির মুখে পড়েছে- এমন সংবাদ গণমাধ্যমে বহুবার প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে। সংলাপে বসার বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তাতে শান্তিপ্রিয় মানুষমাত্রই আপাতত স্বস্তিবোধ করছেন। কিন্তু সংলাপে বসাই তো শেষ কথা নয়, সংলাপ যাতে সফল হয় এবং সব রকম বৈরিতার নিরসন ঘটিয়ে যাতে উৎসবমুখর পরিবেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে, এর জন্য সবারই ইতিবাচক মনোভাব দরকার। 'বিচার মানি কিন্তু তালগাছটা আমার'- এমন মনোভাব নিয়ে সংলাপে বসলে সুফল মিলবে না। সংলাপ যাতে অর্থবহ হয়, এ জন্য সবার উদার মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে হবে এবং সুস্থধারার রাজনীতি চর্চায় অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। উচ্চারণসর্বস্ব অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির মধ্যে সবকিছু সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এর যথাযথ বাস্তবায়নে অধিকতর মনোযোগী হতে হবে।

দেশের রাজনীতিতে কঠিন সময় চলছে। এই পরিস্থিতিতে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে বসার প্রধানমন্ত্রী সম্মতিদান রাজনীতির কঠিন সময়ে ইতিবাচক দিক। তবে শেষ পর্যন্ত সংলাপ হবে কি-না, এ নিয়েও ইতিমধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। কিন্তু আমরা আশা করব, সংলাপ হোক এবং এর মধ্য দিয়ে শুভচিন্তার রাজনীতির পথ নতুন করে সৃষ্টি হোক। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে কি-না এর উত্তর রয়েছে ভবিষ্যতের হাতে। নানা কারণে বিদ্যমান সংকট নিরসনের উদ্দেশ্যে ১ নভেম্বরের সম্ভাব্য সংলাপ কিংবা বৈঠকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুভ উদ্যোগের সুফল মিলুক- এই প্রত্যাশা শান্তিপ্রিয় সবার। বৈঠক কিংবা সংলাপ অর্থবহ করতে সরকারের, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ভূমিকা মুখ্য। তাদের ওপর অনেকাংশে এর সফলতা নির্ভর করছে। তারপরও বলব, সংলাপে বসার সিদ্ধান্তটি একটি শুভ সূচনা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে সরকার ও প্রধান বিরোধী পক্ষের মধ্যে যে দূরত্ব রয়েছে, তা ঘোচাতে এই সংলাপ বিশেষ ভূমিকা রাখবে- এ প্রত্যাশাও আমাদের। বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সংলাপের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সংলাপের তাগিদ নানা মহল থেকেই দেওয়া হচ্ছিল। অনমনীয়তা ত্যাগ করে সমঝোতার মনোভাব নিয়ে বসতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব বেশি। সাধারণ মানুষ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন। সাধারণ মানুষের এই উদ্বেগ দূর করার দায় সরকার এড়াতে পারে না। বিরোধী পক্ষেরও দায় আছে। সংলাপের উদ্যোগ যেন এটাই আবার প্রমাণ করল- রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।

আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি যেন অব্যাহত থাকে। এই সংলাপের মধ্য দিয়ে কী অর্জন হবে, সেই বিশ্নেষণে এখন না গিয়ে বরং এ কথাটাই বলব যে- এই সংলাপের মধ্য দিয়ে গঠনমূলক, সুস্থ ধারার ও সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা ও অনুশীলনের পথটি মসৃণ হোক। স্বাধীন বাংলাদেশে একটানা দীর্ঘদিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো থাকেনি। এই ব্যর্থতার দায়ভার কার এ নিয়ে এখন ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণের প্রয়োজন নেই। কারণ আমরা রাজনীতিতে হঠাৎ করে যে আশার আলো দেখতে পেয়েছি, এর পূর্ণতাই এ মুহূর্তে কামনা করি। আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে যে গলদ রয়েছে, তা দূর করতে না পারলে অনেক প্রত্যাশাই অপূর্ণ থেকে যাবে এবং সব শুভ আশা শেষ পর্যন্ত দুরাশার নামান্তর হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা। রাজনীতিকে গণমুখী করার সবরকম উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। দলীয় কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থ নয়, জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা সমুন্নত রাখার দায় সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সবারই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ ক্ষেত্রেও আমরা ইতিমধ্যে নানারকম বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেখেছি। এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলদের দায় ও অঙ্গীকারের বিষয়টি যথাযথভাবে স্মরণ রেখেই তাদের সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তাদের কারণে যাতে আর বিতর্কের সৃষ্টি না হয়, এও প্রত্যাশা।

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সঠিক কাজটি করতে হবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী শাসন ব্যবস্থার মুখ্য প্রতিষ্ঠান। তাই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল সবাইকে নির্মোহ ও কঠোর অবস্থান নিতে হবে সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন ও প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে। নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে জনমনে যে আস্থার সংকট রয়েছে তাও কাটাতে হবে তাদেরই কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। নির্বাচনের পথ সুগম করতে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে নির্বাচনী প্রস্তুতি পর্বে সব পক্ষের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো ভোগের নিশ্চয়তা সৃষ্টি করার দায় নির্বাচন কমিশন এবং একই সঙ্গে সরকারেরও।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ