রোহিঙ্গা সমস্যা ও বিশ্ব জনমত

  সিএম শফি সামি

সদ্য সমাপ্ত ওআইসি সম্মেলনটি ছিল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওই সম্মেলনে ওআইসিভুক্ত ৫৭টি দেশ অংশগ্রহণ করে। সম্মেলনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য রেখেছেন, তা অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। তিনি ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে নিপীড়ন-নির্যাতন, এর নিরসনে দেশগুলো যাতে তাদের যথাযথ ভূমিকা রাখে। সেই সঙ্গে ওআইসিভুক্ত দেশগুলো এবং সম্মেলন কর্তৃপক্ষ যাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ব জনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে, এর আহ্বানও জানান তিনি। সম্মেলনের একদিন আগে ওআইসির একটি প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যায় এবং পরিদর্শন করে। এতে অংশগ্রহণকারীরা সম্মেলনে অত্যন্ত বলিষ্ঠ বক্তব্য রাখেন। উল্লেখ্য, কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন। তিনি মিয়ানমার সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করেন এবং বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানের প্রতি তার সরকারের পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেন।

সম্মেলনের আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগামী জুন মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জি-৭ গ্রুপের সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানের জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে কানাডার প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণের বিষয়টিও জানান। আমি মনে করি, এটি বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সেখানে রোহিঙ্গাদের ভাগ্য পরিবর্তনে এবং সর্বস্বহারা রোহিঙ্গাদের বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে মুক্তকরণের পক্ষে তার জোরালো বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। এবারের ওআইসি সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারটি খুব সঙ্গত কারণেই অধিকতর গুরুত্ব পেয়েছিল। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর যে নিপীড়ন-নির্যাতন হয়েছে এবং যেভাবে গণহত্যা চালানো হয়েছে, তা বিশ্ববাসীর ভালো করেই জানা আছে। সভ্যতা-মানবতার কলঙ্ক ছাড়া তা আর কিছুই নয়।

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বিতাড়নের জন্য্য যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তা একটি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের সব মানবিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। বিপন্ন-বিপর্যস্ত একটি জনগোষ্ঠীর মানুষ তাদের সব হারিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গারা অতীতেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল এবং তখনও তাদের আশ্রয়স্থল ছিল প্রধানত বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত মহানুভবতার সঙ্গে তাদের আশ্রয় দিয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তাতে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা হয়েছে এবং হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে যেসব সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নেওয়া হয়েছে, এরপরও এ ক্ষেত্রে যে চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা আমাদের পীড়িত করে। আমি মনে করি, বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ যাতে আরও বাড়ে, সে লক্ষ্যে সবরকম পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এরই মধ্যে পরিদর্শন করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতিসংঘের মহাসচিব রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে প্রাথমিক পর্যায়ে বলিষ্ঠ বক্তব্য রেখেছিলেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে আরও জোরালো উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও, বিশেষ করে ইউএনসিআর যথেষ্ট শক্ত ভূমিকা রাখে। তাদের এমন ভূমিকা বহাল রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে ইইউ সদস্যভুক্ত দেশগুলো কঠোরভাবে এই গণহত্যার নিন্দা জানিয়েছে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছে।

বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন সময় কথা দেওয়া সত্ত্বেও মিয়ানমার সরকার সমস্যা সমাধানে আন্তরিক নয়। কখনও কখনও তাদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়, তারা কৌশলে অপনীতি গ্রহণের চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রয়োজন। কয়েকদিন আগে নিরাপত্তা পরিষদে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে এবং তা বিদ্যমান বাস্তবতায় একটি বড় ধরনের অগ্রগতি। নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে অর্থাৎ মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে এই প্রস্তাবটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে।

আইসিসির প্রসিকিউটর মিয়ানমারের মানবতাবিরোধী অপরাধগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এই প্রস্তাবটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করি। বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে যে ভূমিকা গ্রহণ করেছে, তা প্রশংসনীয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকার সম্পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বন্ধুসুলভ মনোভাব নিয়ে এই সমস্যা সমাধানে আগ্রহী ছিল। কিন্তু অনতিবিলম্বে এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশের সহযোগিতার মনোভাবকে মিয়ানমার সরকার ও সামরিক কর্তৃপক্ষ দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ধরে নেয়। পরবর্তী পর্যায়ে এ ব্যাপারে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান বিশ্ব জনমত গঠনে বিরাট অবদান রাখে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বনেতাদের কাছে আমাদের আবেদন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যা হয়েছে কিংবা হচ্ছে, তা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে যেন না দেখা হয়। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনপদে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। এই বিষয়টি দেখতে হবে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে এও পর্যবেক্ষণ করতে হবে, বিশ্বের কে কোনভাবে সাড়া দিচ্ছে এ ব্যাপারে। যদি কোনো দ্বিপক্ষীয় বিষয় থাকে, তাহলে তা হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধ বনাম বিশ্ববিবেক। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা আবেদন জানাই না, বিশ্বদরবারে আমাদের আবেদন, বিশ্ব নেতারা যেন বিবেকের তাগিদে একটি বিপন্ন-বিপর্যস্ত জনগোষ্ঠীকে চরম বৈরী পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে তাদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদে প্রত্যাবাসনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে যেমন গতিশীলতা দরকার, তেমনি তারা যাতে প্রত্যাবাসিত হওয়ার পর একটি রাষ্ট্রের নাগরিকের সব রকম মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

রোহিঙ্গাদের ত্রাণের ব্যাপারটি উল্লেখ করতে গিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ বক্তব্য সামনে আনতে চাই। তিনি বলেছেন, আমাদের ১৬ কোটি মানুষ যদি খেয়েপরে থাকতে পারে, তাহলে তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থাও আমরা করতে পারব। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে আরও উচ্চতায় নিয়ে গেছে। রোহিঙ্গাদের জন্য যারা ত্রাণ পাঠাচ্ছেন, তারা ধন্যবাদ পেতে পারেন। কিন্তু আমি মনে করি, রোহিঙ্গাদের বিষয়টিকে আরও বড় আঙ্গিকে দেখতে হবে। আত্মমানবতার খাতিরে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার স্বার্থে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো আরও স্পষ্ট এবং শক্ত অবস্থান নেবে, এটাও আমরা প্রত্যাশা করি।

খুব ব্যথিত হই যখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মর্মস্পর্শী বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক আঙ্গিকে দেখা হয়। এটি শুধু মুসলমান জনগোষ্ঠীর ওপর ধ্বংসযজ্ঞ নয়। আমার মতে, এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অপরাধ। খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে, যেখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে এবং হত্যা-ধর্ষণের মতো নৃশংসতা পরিলক্ষিত হয়, সেখানে প্রতিরোধের জন্ম হয় এবং সেই প্রতিরোধ ক্রমান্বয়ে প্রতিহিংসার আকার ধারণ করে। পরবর্তী পর্যায়ে তা হয় আরও ভয়াবহ। যদি তাই হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির শিকার শুধু বাংলাদেশ হবে তা নয়, এই সন্ত্রাসবাদের লেলিহান শিখা আরও ছড়িয়ে যেতে পারে। আমরা দৃষ্টান্ত হিসেবে ফিলিস্তিনের বিষয়টি উল্লেখ করতে পারি। কাজেই বিশ্বসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে এই উপলব্ধি খুব দরকার।

ওআইসির সদস্যভুক্ত দেশগুলোর নেতাদের ধন্যবাদ এ জন্য যে, তারা এ সমস্যা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে দু-একটি দেশ ছাড়া সম্মিলিতভাবে ওআইসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে আমরা অগ্রণী ভূমিকা দেখতে পাইনি। সদ্য সমাপ্ত সম্মেলনের মাধ্যমে ওআইসির সদস্য দেশগুলোর নেতারা বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। এটা প্রশংসার দাবি রাখে। এখন তাদের কাছে প্রত্যাশা, তারা যেন এ ব্যাপারে অন্যান্য দেশকে প্রভাবিত করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালান।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব


মন্তব্য যোগ করুণ