গ্রাম থেকে মহাকাশ- নতুন বাংলাদেশ জাগছে

  কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

বঙ্গবন্ধু-১ নামে বাংলাদেশের নিজস্ব উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণের 'লাইভ' দৃশ্য অন্য অনেকের মতো আমাকেও অভিভূত ও গর্বিত করেছে। আমরা যখন তরুণ, সেই পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝিতে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে উৎক্ষেপিত হয়েছিল 'স্পুটনিক'। আজকের বাংলাদেশ বা তৎকালীন পাকিস্তানের সঙ্গে এর সম্পর্ক না থাকলেও মানবজাতির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের সেই নিদর্শনে আমরা এখান থেকেই উদ্বেলিত হয়েছিলাম। শুক্রবার দিবাগত রাতে যখন বাংলাদেশের নিজস্ব উপগ্রহ 'বঙ্গবন্ধু-১' উৎক্ষেপিত হচ্ছিল, তখন আমার বারবার মনে পড়েছিল তারুণ্যের সেই স্মৃতি। বাংলাদেশি হিসেবে গর্বে আমার বুক ফুলে যাচ্ছিল। আমার ভালো লাগছে যে, আগে আমাদের শিশু-কিশোররা বিশ্বের প্রথম উপগ্রহ সম্পর্কে পাঠ্যবইয়ে পড়ত। এখন থেকে তারা বাংলাদেশের 'প্রথম উপগ্রহ' সম্পর্কেও পাঠ গ্রহণ করবে।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু এক যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পেয়েছিলেন। তখন একটি বিমান বা হেলিকপ্টারও ছিল আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি। সেখানে এখন আমরা মহাকাশে নিজস্ব উপগ্রহ প্রেরণ করছি। উন্নয়নের এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে? আমি মনে করি, টানা দুই মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল ও দূরদর্শী নেতৃত্বই এ ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। আমাদের বিগত সরকারপ্রধানদের কেউ কেউ যেসব বিষয়ে চিন্তাও করতে পারতেন না, তিনি সেগুলো বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দিচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কথা বলতে হয়। রাজনীতিকরা তো বটেই, বাংলাদেশের বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এ ব্যাপারে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছিলেন। তারা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক অর্থকরী প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা ছাড়া বাংলাদেশের মতো দেশ পদ্মা সেতুর মতো বড় অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারবে না। করলেও শেষ করতে পারবে না। কিন্তু তাদের সব আশঙ্কা ও সন্দেহ অমূলক প্রমাণ করে পদ্মা সেতু এখন বাস্তবতা। নদীর বুকে ক্রমেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতার জয়গান গেয়ে চলছে। সফলভাবে উপগ্রহ উৎক্ষেপণ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর তরফে নতুন করে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা পেতে পারেন।

মহাকাশে বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকার সুবিধা কী কী হবে; কীভাবে উন্নত ও গতিশীল যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখবে; এ ব্যাপারে এরই মধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছে। দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে বিস্তারিত বিশ্নেষণ হয়েছে। এই ক্ষুদ্র পরিসরে আমি সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। আমি শুধু বলতে চাই, এই উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বিশ্ব সমাজে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধির দিকটি। দেখা যাচ্ছে, বিশ্বে শুধু ৫৭টি দেশের নিজস্ব উপগ্রহ রয়েছে। অভিজাত সেই তালিকায় যুক্ত হলো বাংলাদেশের নাম। এতদিন উপগ্রহ সংক্রান্ত সেবাসমূহ আমাদের পেতে হতো অন্য দেশের মাধ্যমে। এখন বরং এই অঞ্চলের অন্যান্য কিছু দেশ বাংলাদেশ থেকেই সেবা গ্রহণ করবে।

বস্তুত, আরও নানা ক্ষেত্রে এরই মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক দেশের জন্য উদাহরণ ও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। আমি নিজে জলবায়ু পরিবর্তন ও এর অভিঘাত নিয়ে কাজ করি। সেখান থেকে জানি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া বা অ্যাডাপ্টেশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে অনেক দেশের জন্য রোল মডেল। তারও আগে থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তো বটেই, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশেও বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত আমাদের কৌশলপত্র এমন সময় প্রণীত হয়েছিল, যখন উন্নয়নশীল অনেক দেশ এ ব্যাপারে উদ্যোগই গ্রহণ করেনি। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের নিজস্ব উপগ্রহ উৎক্ষেপণ বিশ্বের উন্নয়নশীল আরও দেশকে অনুপ্রাণিত করবে।

আমার মতে, এখন নজর দিতে হবে নিজেদের দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। আমি জানি, বঙ্গবন্ধু-১ আমাদের শেষ উপগ্রহ নয়। বাংলাদেশের মহাকাশ জয়ের পথে সূচনা মাইলফলক মাত্র। আগামী দিনগুলোতে আমাদের মহাকাশ যাত্রা ও গবেষণা আরও বিস্তৃত হবে। এমনকি একটা মেয়াদের পর নতুন উপগ্রহও প্রেরণ করতে হবে। আমি আশা করি, বঙ্গবন্ধু-২ উপগ্রহ বাংলাদেশের মাটিতে বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের মাধ্যমেই প্রেরিত হবে।

মনে রাখতে হবে, বিদ্যমান উপগ্রহের সর্বোচ্চ সুফল পেতেও প্রয়োজন হবে দক্ষ জনশক্তি। এ ক্ষেত্রে সরকারকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ ভূ-উপগ্রহ ব্যবস্থাপনা অনেক বছর ধরেই করে আসছে। স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনে মনোযোগ দিয়েছিলেন। আর তার কন্যা মহাকাশে পাঠালেন উপগ্রহ। এই দুইয়ের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সর্বোচ্চ সুফল ঘরে তুলতে হলে আমাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতেই হবে।

শুধু উপগ্রহ, ভূ-উপগ্রহ বা যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন তা নয়। ভবিষ্যতের বাংলাদেশের কথা যদি আমরা ভাবি, প্রত্যেক খাতেই এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ যে গতিতে এগিয়ে চলছে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে হবে দক্ষতা দিয়ে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। এই উন্নয়ন টেকসই করতে এবং আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই।

ইতিমধ্যে জাতিসংঘের হিসাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার সব শর্ত আমরা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছি। সাধারণ নিয়মে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত তকমা ঝেড়ে ফেলতে পারবে। কিন্তু চাইলে ২০২১ সালের মধ্যেই ওই তালিকা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করতে পারে বাংলাদেশ। আমি মনে করি, সেটাই উচিত হবে। কারণ ওই সময়ের মধ্যে নেপাল ও ভুটানও তালিকা থেকে বের হয়ে যাবে। তারপরও স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থাকা বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক হবে না।

এটা ঠিক, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থাকলে বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা পাওয়া যায়। মূলত এর জন্যই কেউ কেউ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ দীর্ঘায়িত বা বিলম্বিত করতে চান। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ এখন আর বৈদেশিক সহায়তা (অনুদান ও সহজশর্তে ঋণ) নির্ভর দেশ নয়। আমাদের বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ এখন মোট জাতীয় আয়ের দুই শতাংশেরও কম। তারও অর্ধেকের বেশি আসলে ঋণ পরিশোধে যায়। ফলে চূড়ান্ত হিসাবে আমাদের বৈদেশিক সহায়তা মোট জাতীয় আয়ের এক শতাংশেরও কম। এই সামান্য সুবিধার জন্য আমরা কেন একটি অসম্মানজনক ছাপ বয়ে নিয়ে বেড়াব?

আমি মনে করি, বিভিন্ন খাতে যদি দুর্নীতি কমানো যায়, যদি দক্ষতা বৃদ্ধি করা যায়, যদি কর্মসংস্থানপ্রত্যাশী তরুণ জনগোষ্ঠী উপযুক্ত সুযোগ ও সহায়তা পায়- তাহলে আমাদের আর এক পয়সাও বৈদেশিক সহায়তা নিতে হবে না। অপরদিকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রয়োজনে ঋণের উৎস সম্প্রসারিত হবে। আমাদের সক্ষমতার প্রমাণ তো নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই দেখিয়ে দিচ্ছি। আর মহাকাশে নিজস্ব কক্ষপথে নিজস্ব উপগ্রহ উৎক্ষেপণের সাফল্য বাংলাদেশের সক্ষমতার সর্বশেষ উদাহরণ।

বাংলাদেশের সক্ষমতার আরেকটি উদাহরণ দিয়ে আমি শেষ করতে চাই। ওই সক্ষমতা পদ্মা সেতু বা বঙ্গবন্ধু-১ উপগ্রহের মতো দৃশ্যমান নয়। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে গেলে তার অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। আমি প্রায়ই ঢাকার বাইরে যাই। গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতি, উন্নয়ন ও সক্ষমতার চিত্র তখন স্বচক্ষে দেখি। গত এক দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়েছে। আমি মনে করি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করছে, অগ্রগতি যে ত্বরান্বিত হচ্ছে; এর ভিত্তি গ্রামীণ অর্থনীতি।

অনেকে মনে করেন, গ্রামীণ অর্থনীতি মানে বোধ হয় শুধু কৃষি। বাস্তবে কৃষির বাইরেও একটি উৎপাদনমূলক অর্থনীতি বিস্তৃত হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠছে গ্রামে গ্রামে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে সারাদেশে এক হাজারের বেশি 'ক্লাস্টার' বা গুচ্ছ উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। সেখানে আড়াইশ'র বেশি পণ্য উৎপাদিত হয় এবং স্থানীয় ও জাতীয় বাজারে প্রবেশ করে।

এখন আমাদের জাতীয় ও গ্রামীণ অর্থনীতির মধ্যে একটি মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আঞ্চলিক, ভৌগোলিক বা সম্প্রদায়গত অবস্থানের কারণে কেউ যেন পিছিয়ে না থাকে, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। তাহলেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ যেসব অর্জন করছে, তার সুফল সবাই পাবে। আবার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্জনও জাতীয় অর্জনের সঙ্গে যোগ হবে এবং উন্নয়নের গতি বাড়িয়ে দেবে।

আমরা দেখছি, গ্রামাঞ্চল থেকে মহাকাশ- সর্বত্রই এক নতুন বাংলাদেশ জাগছে। এই জাগরণ ধরে রাখতে হবে এবং সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে আরও এগিয়ে নিতে হবে।

অর্থনীতিবিদ


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ