বাংলাদেশের মহাকাশযুগে প্রবেশ

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট

প্রকাশ : ১১ মে ২০১৮

বাংলাদেশের মহাকাশযুগে প্রবেশ

  মনোরঞ্জন দাস

'মানুষকে অবশ্যই পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে উপরে উঠতে হবে

উঠতে হবে বায়ুমণ্ডলের উচ্চসীমার ঊর্ধ্বে- তাকে ছাড়িয়ে
আরও অনেক দূরে; কারণ কেবল এভাবেই সে তার
আবাসস্থল এ পৃথিবীকে পূর্ণভাবে জানতে পারবে।'
-সক্রেটিস (খ্রি.পূ. ৪৭০-৩৯৯ খ্রি.পূ.)

কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশ একটি মর্যাদাকর অবস্থান নিল। এই অবস্থান এ দেশের তরুণ প্রজন্মকে মহাকাশযুগের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করবে। এই স্যাটেলাইটের প্রাথমিক সুবিধা হলো, আমরা যে ডিশ অ্যান্টিনা দিয়ে কেবলের মাধ্যমে স্যাটেলাইট টিভি দেখি, তার জন্য আমাদের টিভি সম্প্রচার কোম্পানিগুলো বিদেশি স্যাটেলাইট কোম্পানিগুলোকে বার্ষিক প্রায় দেড় কোটি ডলার ভাড়া হিসেবে দেয়। সেই টাকাটা আর বিদেশে যাবে না। এখন কভারেজের আওতাভুক্ত অন্যান্য দেশে টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবার বিস্তার ঘটিয়ে রাজস্ব আয়ের সুযোগও সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।

আয়ের ক্ষেত্রের আরও খাতগুলো হচ্ছে :ট্রান্সপন্ডার লিজের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়। ডিটিএইচসহ স্যাটেলাইটের বিভিন্ন সেবার লাইসেন্স ফি ও স্পেকট্রাম চার্জ বাবদ সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি। দুর্যোগ মোকাবেলায়ও অনেক ভূমিকা রাখবে এই স্যাটেলাইট, সমগ্র বাংলাদেশের স্থল ও জলসীমায় নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচারের নিশ্চয়তার মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগে পার্থিব অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্যাটেলাইটের কারণে সারাদেশে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের সুবিধা। এ ছাড়াও এর মধ্যেমে স্যাটেলাইট টেকনোলজি ও সেবা প্রসারের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবার পাশাপাশি টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-এডুকেশন, ডিটিএইচ প্রভৃতি সেবা প্রদান।

এই সফল উৎক্ষেপণের পর বলা যায়, ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে যে স্বপ্ন ও ভাবনার উন্মেষ হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন হলো। সেটি হলো বঙ্গবন্ধুকন্যা হাসিনা সরকারের আমলে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি ফ্রান্সেল 'থ্যালেস এলেনিয়া স্পেস' কোম্পানি থেকে তৈরি হয়েছে। এটিই মূলত একটি যোগাযোগ উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট। বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ও নানা তথ্য প্রদান ও গ্রহণের জন্য এতে ৪০টি ট্রান্সপোন্ডার রয়েছে। ট্রান্সপোন্ডার হচ্ছে ভূমি থেকে প্রেরিত সংকেত গ্রহণ ও বিবর্ধিত করে পুনরায় প্রেরণ করার যন্ত্র। ২০টি যন্ত্র বাংলাদেশ তার নিজস্ব কাজে ব্যবহার করবে, আর ২০টি ভাড়া দিতে পারবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি ফ্লোরিডার কেপ ক্যানার্ভেল (কেনেডি স্পেস সেন্টার) থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। কাজটি সম্পন্ন হয়েছে আমেরিকার অ্যালান মাস্কের মালিকাধীন স্পেস এক্স কোম্পানির ফ্যালকন রকেটের মাধ্যমে। উৎক্ষেপণের ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মাথায় ১৫ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় আবর্তন পথে নিয়ে যায়। এর পর উপগ্রহটি তার সৌর প্যানেলটি আংশিক প্রসারিত করে। জেট প্রপালসন গতিপথটি ক্রমশ বৃত্তাকার করতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না উপগ্রহটি নিখুঁত বৃত্তাকার জিওস্টেশনারি অরবিট বা ভূস্থির কক্ষপথে সুনির্দিষ্ট স্থানে যথাযথ আবর্তন বেগে প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে উৎক্ষেপণোত্তর ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় ব্যয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে উপগ্রহটি তার সৌর প্যানেল এবং অ্যান্টেনাগুলো সম্পূর্ণভাবে মেলে দেবে। কক্ষপথের শূন্যতায় সৌর ও মহাজাগতিক বিকিরণে প্রাবল্য, চরম শীত-তাপ অবস্থার মুখোমুখি হবে এ স্যাটেলাইটটি। -১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে + ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রার ওঠানামা হবে। এমন বিরূপ পরিবেশের মাঝেও উচ্চ প্রযুক্তিতে নির্মিত এই উপগ্রহটি ১৫ বছরের বেশি সময় থাকবে। এমনকি ১৮ বছর পর্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এর আওতা এলাকা বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মধ্য-এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলে এর পরিসেবা পৌঁছাতে পারবে। এ প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৭৬৫ কোটি টাকা।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটির অবস্থান ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব প্রান্তের ভূপৃষ্ঠের ওপরে, ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৫ হাজার ৮০০ কিলোমিটার উচ্চতায় ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমায় ক্লার্ক অরবিটে অবস্থান করবে। উপগ্রহটি সুস্থির বিন্দুতে পৌঁছে দীর্ঘ কার্যকালে চন্দ্র, সূর্য ও পৃথিবীর আকর্ষণজনিত জটিলতার ফলে অবস্থানে কিছু বিচ্যুতির মুখোমুখি হবে। সেটি সংশোধনের জন্য সেখানে জেট প্রপালসনের কার্যক্রম আছে। পৃথিবীর ছায়ার কারণে সৌর প্যানেলগুলো প্রতিদিন একটি সময় সূর্যের আলো পাবে না। সেই সময়ের জন্য রিচার্জেবল ব্যাটারির ব্যবস্থাও উপগ্রহটিতে আছে। স্পেস এক্সের তিনটা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মাধ্যমে তার গতি নিয়ন্ত্রণ করে সুস্থির অবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে। তার পরই এর নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে চলে আসবে। আজকের দিনে যখন এ অঞ্চলে টিভি সম্প্রচারে নতুন ব্যবস্থার প্রচলন হচ্ছে এবং ব্রডব্যান্ড ব্যবস্থার বিরাট উন্নয়ন ও ব্যাপ্তি হতে যাচ্ছে, তখন এ উপগ্রহের ভূমিকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি টেলিভিশন কেন্দ্রগুলো এই উপগ্রহের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে প্রোগ্রাম আদান-প্রদান করতে পারবে।

ক্লার্ক অরবিট হচ্ছে ভূস্থির উপগ্রহের কক্ষপথ। এটি বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক ও পদার্থবিজ্ঞানী আর্থার. সি ক্লার্কের নামানুসারে হয়েছে। যোগাযোগ উপগ্রহ বা উপগ্রহের যোগাযোগ ব্যবস্থার ধারণা এসেছে ১৯৪৫ সালে তার এক লেখা থেকে। একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল 'এক্সট্রা-টেরিস্ট্রিয়াল রিলে' শিরোনামে। আমরা জানি, পৃথিবী নিজ অক্ষে অর্থাৎ পৃথিবী উত্তর-দক্ষিণ মেরুদ্বয় বরাবর কল্পিত অক্ষকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত ঘুরছে, যার ফলেই দিনরাত হচ্ছে, নক্ষত্রগুলোর উদয়-অস্ত হচ্ছে। এ ঘূর্ণনের ফলে পৃথিবীর বিষুবীয় পৃষ্ঠদেশ প্রতি সেকেন্ডে ৪৬৫ মিটার সরে যাচ্ছে। এখন পৃথিবীর ঘূর্ণনের সমান তালে যদি একটি কৃত্রিম উপগ্রহ বিষুব রেখার বরাবর ওপরে ঊর্ধ্বাকাশে নির্দিষ্ট উচ্চতায় (প্রায় ৩৫৮০০ কিলোমিটার উচ্চতায়) ওই একই কৌণিক দ্রুতিতে সর্বদা ঘুরতে থাকে, তখন তাকে পৃথিবীর বুক থেকে স্থির বলে মনে হবে। এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর অক্ষের সাপেক্ষে তার কৌণিক আবর্তন মহাকাশের স্যাটেলাইটের কৌণিক আবর্তন একই থাকবে। ফলে স্যাটেলাইটটি ভূস্থির স্যাটেলাইটে পরিণত হবে এবং ওই কক্ষপথকে ক্লার্ক অরবিট নামে অভিহিত করা হয়। এজন্য উপগ্রহটির বেগ হতে হবে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩.১ কিলোমিটর।

আমাদের ভূস্থির উপগ্রহের অবস্থান ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের যত কাছাকাছি হবে, ততটাই আমাদের সুবিধাজনক হবে এবং যথাসময়ে প্রকল্পটি হলে ৭৪ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশটি পেতাম। যে অবস্থানটি থেকে কার্য সম্পাদন অনেক সুবিধাজনক হতো। আর এতে কোনো অর্থ ব্যয় হতো না। বর্তমানের অবস্থান বা সেগমেন্টটি একটি রুশ প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ বছরের জন্য ২২৯ কোটি টাকার বিনিময়ে লিজ নিতে হয়েছে। বর্তমানে আইটিইউ আমাদেরকে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের চাইতে নিকটতর কোনো অবস্থান বরাদ্দ করতে পারেনি। স্যাটেলাইট প্রকল্প ১৯৯৮-৯৯ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে যখন নেওয়া হয়েছিল, তাতে যদি ২০০১ সালে বাধা না পড়ত তাতে অধিকতর সুবিধাজনক অবস্থান পেতাম। বর্তমানে অবস্থানটি তির্যক এবং আমাদের মূল পরিসেবা গ্রহণকারী এলাকা থেকে একটু দূরে হওয়ায় উত্তম অবস্থান নয়। তবে এটাকে বর্তমানে সম্ভাব্য 'সর্বোত্তম' বলা হবে অবশ্যই।

অনেক সময় ও জটিলতার পরও শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই এ কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। এটি একটি বিরাট অর্জন। আরও দেরি হলে ১১৯ দশমিক ১০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার চাইতে বেশি দূরে সরে যেতে হতো হয়তো। যা হোক, মহাকাশে পৃথিবীর ৫৬টি দেশ নিজস্ব একাধিক ভূস্থির উপগ্রহ প্রেরণ করে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহণ করছে। বাংলাদেশও নিজস্ব এই উপগ্রহটি মহাকাশে স্থাপন করে ৫৭তম দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট সংস্থার সদস্য হতে চলেছে। বঙ্গবন্ধু স্যটেলাইটের কক্ষপথে স্থাপন যেন মহাকাশযুগকেই স্বাগত জানাল, যা আমাদের তরুণ প্রজন্মের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। সবশেষে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট আমাদের জন্য অনন্য ভূমিকা রাখবে- এটাই আমাদের ঐকান্তিক আশা।

বেতার সম্প্রচার বিশেষজ্ঞ


মন্তব্য যোগ করুণ

সম্পাদকীয় ও মন্তব্য বিভাগের অন্যান্য সংবাদ