মুলার মূল্য

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮

কথাসাহিত্যিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ছোটগল্প 'ফুলের মূল্য' বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে রয়েছে। সাত সাগর পারি দিয়ে ভারতবর্ষে যুদ্ধ করতে এসে নিহত প্রিয়জনের সমাধিতে একগুচ্ছ ফুল দিতে গল্পের উত্তম পুরুষের হাতে অর্থ গুঁজে দিয়েছিলেন এক বিদেশিনী। প্রবাসী ওই বাঙালি মুখ ফুটে বলতে পারেননি যে, সেই সময় উপমহাদেশে ফুল কিনতে পয়সার প্রয়োজন হতো না। এখন অবশ্য ফুলের মূল্য চাল-ডাল-মুলার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চেয়েও বেশি। কিন্তু সেই মূল্য কিংবা দুর্মূল্য কোনোভাবেই ঠাকুরগাঁওয়ের মুলার বাজারের সঙ্গে তুল্য হতে পারে না। বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ঠাকুরগাঁওয়ে এক টাকায় মিলছে দুই কেজি মুলা।

আমরা জানি, পাঁচ থেকে ৫০ পয়সার মুদ্রা অনেক আগেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে বাজার থেকে বিদায় নিয়েছে। সস্তা লজেন্স বা দিয়াশলাই ছাড়া এখন এক টাকা দামের পণ্যও ক্রমে দুর্লভ হয়ে উঠছে। খরচের হিসেবে যদিও কখনও কখনও ক্রেতা এক টাকা ফেরত পায়, তার বদলে এক টাকা দামের চকলেট বা দিয়াশলাই দেওয়ার বিক্রেতার সংখ্যা বিরল নয়। সেই এক টাকায় দুই কেজি মুলা মেলার চিত্র যেমন বিস্ময়কর, তেমনই বেদনাদায়ক। আমরা জানি, মুলা উৎপাদন সহজ নয়। খনার বচনে বলা হয়েছে- 'এক চাষে মুলা, তার অর্ধেক তুলা, তার অর্ধেক ধান, বিনা চাষে পান।' এখানে স্পষ্ট যে, মুলা চাষে সবচেয়ে বেশি খরচ। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির প্রায় অনিবার্য অনুষঙ্গ সার, সেচ ও কীটনাশকের মূল্য। বড় কথা, এক টাকায় দুই কেজি মুলা বিক্রি হলে উৎপাদন খরচ ও চাষির মুনাফা দূরে থাক, ক্ষেত থেকে তুলে বাজারে নেওয়ার খরচই তো উঠে আসবে না! ফলে মুলা ক্ষেত থেকে না তুলে ট্রাক্টর দিয়ে ক্ষেতেই গুঁড়িয়ে দেওয়ার যে চিত্র আলোচ্য প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়েছে, তা আক্ষেপ না বাস্তববুদ্ধি, বিতর্কের বিষয়।

অস্বীকার করা যাবে না যে, ভরা মৌসুমে কৃষিপণ্যের দাম কম থাকে। তাই বলে এতটা! বরং শীতকালের সবজি মুলার মূল্য এই হেমন্তে বাড়তি থাকাই উচিত ছিল। কিন্তু ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় মুলার ফলন ব্যাপক হওয়ায় এমন পরিস্থিতি। আমাদের মনে আছে, চলতি বছরের মার্চে 'দশ কেজি আলুর দামে এক কেজি চাল' মিলেছিল। এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না যে, উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে গুরুতর ব্যবধানই কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের সংকট তৈরি করে। আলুর ক্ষেত্রে তাও কখনও কখনও সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হয়। মুলার ক্ষেত্রে সম্ভবত সেই সুযোগও নেই। আলু সংরক্ষণের জন্য হিমাগার রয়েছে; সেখানে মুলার স্থান হয় কি? আরও প্রশ্ন হচ্ছে, উৎপাদিত ফসলের এমন মূল্যের ক্ষেত্রে কৃষক তাহলে কোথায় যাবে? সচ্ছল চাষিরা না হয় ট্রাক্টর দিয়ে ক্ষেত গুঁড়িয়ে নতুন বীজ বুনতে পারেন। প্রান্তিক চাষিদের কী হবে? আমরা মনে করি, এ ধরনের কৃষিপণ্যের ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই। কিন্তু আমরা হতাশার সঙ্গে দেখি, কৃষিপণ্যের উৎপাদন, চাহিদা, বাজার ও ব্যবহার নিয়ে অব্যবস্থাপনা ও অদূরদর্শিতার ছাপ স্পষ্ট। অথচ কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের কথা আমরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছি। নীতিনির্ধারণী মহলেও এ ব্যাপারে কম আলোচনা হয়নি। এখন সময় এসেছে সক্রিয় হওয়ার। অন্যথায় ঠাকুরগাঁওয়ের এই পরিস্থিতির অন্যত্রও পুনরাবৃত্তি হতে পারে। বিষয়টি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের পরিসর ছাপিয়ে তখন রচিত হতে পারে 'মুলার মূল্য' নামে অমর কথাসাহিত্য। কিন্তু সেটা না প্রান্তিক চাষি, না কেন্দ্রীয় অর্থনীতি- কারও জন্যই কল্যাণকর হবে না।


মন্তব্য যোগ করুণ