পিঠাপুলির সময়

প্র চ্ছ দ

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯

পিঠাপুলির সময়

ছবি ::মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান

শীত ঋতুকে বলা চলে পিঠার ঋতু। বাংলার অকৃত্রিম খাবারের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে পিঠা। শহুরে জীবনে তা ভিন্ন মাত্রা পেলেও ভোজনরসিক বাঙালির রসনায় পিঠার আবেদন কমেনি। পিঠাপুলির এই সময়ের আদি ও বর্তমানের নানান দিক নিয়ে লিখেছেন শুভ্র মিসির

যদি প্রশ্ন করা হয়, সিদ্ধ চালের গুঁড়া কিংবা আটার মিশ্রণে গুড় অথবা চিনি যোগ করে পানির ভাপে বা তেলে ভেজে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের নানান রকম পিঠা তৈরি হয় কোন দেশে? উত্তর দেবেন নিশ্চয়ই- কোন দেশ আবার, বাংলাদেশ! পিঠাপুলির মনোহর এ রাজ্যেই শুধু দেখা মিলবে বৈচিত্র্যময় হাজারো পিঠার সমাহার। কেননা, পৌষ-পার্বণে কিংবা উৎসব-আনন্দে পিঠা না খেলে যে রসিক বাঙালির চলেই না।

পৌষ আর মাঘ মাস পুরো শীত ঋতুজুড়েই চলে পিঠা তৈরির ধুম। পিঠা তো পিঠা; এর স্বাদ, গন্ধ, বর্ণ আর নামের কি শেষ আছে! বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলভেদে পিঠা তৈরির প্রক্রিয়া, উপাদান আর নামের রয়েছে তফাত। তবুও হেমন্তের শেষে যখন নতুন ধান ওঠে কৃষকের ঘরে, তখন এই আনন্দ উদযাপন পিঠা উৎসবের মাধ্যমেই সম্ভব।

এই কথাগুলো লিখছি এমন একটা সময়ে, যখন বাংলার অকৃত্রিম গ্রামীণ সমাজে শহুরে জীবনের প্রভাবগুলো বেশ দৃশ্যমান। গ্রামীণ সংস্কৃতির অনেক কিছুই ভুলতে বসেছে আমাদের গ্রাম-বাংলা। শীত মৌসুমে পিঠার ঋতুতে পিঠা তৈরির সংস্কৃতি ও চর্চার আদি অবস্থা আর আগের মতো নেই। তবে এটাও ভাবার কোনো কারণ নেই যে, বিভিন্ন উপলক্ষ ও নির্দিষ্ট সময়ে পিঠা খাওয়া ও তৈরি হয় না। এক্ষেত্রে বলা চলে, গ্রামীণ চর্চার শহুরে প্রকাশ। আগে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে তৈরি হতো পিঠা আর শহরে এখন বাসায় হয়তো তেমন হয় না, সেখানে পিঠা চলে গেছে দোকানে। শীত এলে ঢাকার অলিতেগলিতে, রাস্তার মোড়ে বসে ক্ষণস্থায়ী পিঠার দোকান। তবে, ব্যস্ত এই শহরের রাস্তায় মানুষের গোল হয়ে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাপা কিংবা চিতই পিঠা খাওয়ার দৃশ্য দেখলে গ্রামীণ বাঙালিয়ানার কথাই মনে পড়ে যায়।

পিঠার প্রতি বাঙালির গভীর অনুরাগ নিয়ে 'হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি' বইয়ে গবেষক গোলাম মুরশিদ লিখেছেন- 'মিষ্টি বাঙালির চিরদিনের পছন্দের খাবার। প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলের লোকেরা পায়েশ খেতেন। পিঠাও খেতেন। তারপর যত দিন গেছে তারা মিষ্টান্ন রান্নায় ততই বৈচিত্র্য আনতে চেষ্টা করেছেন।' মধ্যযুগের সাহিত্যে নানান ধরনের পিঠা ও মিষ্টান্নের দেখাও আমরা পাই।

'চৈতন্যচরিতামৃত'-এ সেই সময়কার পিঠা ও মিষ্টান্নের কিছু উল্লেখ আছে। পঞ্চাশ ব্যঞ্জনের সঙ্গে তৈরি হচ্ছে 'ক্ষীর পুলি নারকেল পুলি আর পিষ্ট'। বরিশালের বিজয় গুপ্ত তার মনসামঙ্গলে বলছেন,

'মিষ্টান্ন অনেক রান্ধে নানাবিধ রস। দুই-তিন প্রকারের পিষ্টক পায়স দুগ্ধে পিঠা ভালো মতো রান্ধে ততক্ষণ।

রন্ধন করিয়া হৈল হরসিত মন'

ময়মনসিংহ গীতিকার 'কাজল রেখা'য় বলা হচ্ছে- 'চই চপরি পোয়া সুরস রসাল।/ তা দিয়া সাজাইল কন্যা সুবর্ণের থাল/ ক্ষীর পুলি করে কন্যা ক্ষীরেতে ভরিয়া।/ রসাল করিল তায় চিনির ভাজ দিয়া'

ভিন্ন নামে অঞ্চল ভেদে প্রচলিত আছে হয়তো একই পিঠা। আবার অনেক পিঠা প্রায় সমানভাবেই সবখানে জনপ্রিয়। দেশজুড়ে প্রচলিত কয়েকটি পিঠার নাম যদি নেওয়া হয়, তবে উঠে আসবে চিতই, পাটিসাপটা, পাকান, ভাপা, ক্ষীরপুলি, চন্দ্রপুলি, আন্দশা, কুলশি, পাতা পিঠা, কাটা পিঠা, ছিট পিঠা, চুটকি পিঠা, মুঠি পিঠা, মেরা পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, চাপড়ি পিঠা, নকশি পিঠা, সুন্দরী পাকন, সর ভাজা, পুলি পিঠা, লবঙ্গ লতিকা, ঝুরি পিঠা ও বিবিয়ানা/বিবিখান পিঠা, ঝিনুক পিঠা, সূর্যমুখী পিঠা, সন্দেশ পিঠা, দুধরাজ, রসফুল পিঠা, মেরা পিঠা, পানতোয়া, ছাঁচ পিঠা, চাপড়ি পিঠা, তিলের পুলি, চাপাতি পিঠা, ফুলন দলা- এভাবে যে কত নামে কত শত পিঠার নাম নেওয়া সম্ভব তার হিসাব করা মুশকিলই বটে। কখনও এখানকার কয়েকটি পিঠার সঙ্গে মিষ্টি বা ঝাল মিশিয়ে তৈরি করা হয় নতুন পিঠা। যেমন চিতই পিঠার সঙ্গে দুধ-গুড় দিয়ে তৈরি করা হয় দুধ চিতই। চিতই পিঠার সঙ্গে কাঁচামরিচ ও ধনিয়া পাতা দিয়ে ঝাল পিঠাও তৈরি করা হয়। বাংলাদেশের বেশির ভাগ পিঠাতেই মিষ্টির প্রাধান্য অধিক লক্ষণীয়। তবে কখনও কখনও ঝাল পিঠা খাওয়ারও প্রচলন রয়েছে। যেমন- ছিটা পিঠার আটায় মরিচ বাটা মিশিয়ে ঝাল করে ভাজা হয়। ছিটা পিঠা আবার হাঁসের মাংস দিয়েও খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে।

শীতের এই মৌসুমে ঢাকার রাস্তার ধারের ছোট পিঠার দোকানগুলোতে গেলে দেখা যাবে ভিড় লেগেই আছে। তেজগাঁওয়ের বিভিন্ন রাস্তাঘাট কিংবা ফার্মগেটের দৃশ্য তো অন্তত তেমনই। এটা শুধু এখানকার দৃশ্য নয়; বরং মোহাম্মদপুর, মতিঝিল, গুলিস্তান, উত্তরা, শাহবাগ, কাঁটাবনের বিভিন্ন রাস্তার দৃশ্য একই। ফার্মগেটের হলিক্রস স্কুলের রাস্তায় দাঁড়িয়ে পিঠা খাওয়া ও কথা হচ্ছিল পিঠা বিক্রেতা নজরুলের সঙ্গে। নজরুলের অস্থায়ী দোকানে চিতই ও ভাপা পিঠাই পাওয়া যায়। চিতইয়ের সঙ্গে আছে সরিষা, শুঁটকি, ধনিয়া, ডালের কয়েক পদের ভর্তা। কেউ চাইলে ডিম চিতই বানিয়ে দেওয়া হয়। নজরুল জানান, প্রতিদিন বিক্রি হয় প্রায় আটশ' থেকে এক হাজার টাকা। দিনের বেলা রিকশা চালান আর বিকেল নাগাদ বসে যান পিঠা বানাতে। উত্তরার জসীমউদ্‌দীন চত্বরের বাম পাশে বসে পিঠা বানান মধ্য বয়সী কালাম মিয়া। চিতই, ভাপার সঙ্গে তার কাছে পাওয়া যায় তেলের পিঠাও। বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে তার দোকান। সহকারী হিসেবে সঙ্গে রয়েছে তার ছোট ছেলে। এ রকম অস্থায়ী দোকানের পাশাপাশি শহরে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী বেশ কিছু পিঠার দোকান। এসব দোকান শহরবাসীর পিঠার তৃষ্ণা তো মেটায়ই তার সঙ্গে অনলাইনেও অনেকে খুলে বসেছেন পিঠার দোকান। মূলত ফেসবুকের মাধ্যমেই চলে এই পিঠার দোকানগুলো। তারা হোম ডেলিভারির পাশাপাশি বিয়ে, জন্মদিনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্যও পিঠা তৈরির কাজ করে থাকেন। এর মধ্যে পিঠার আড্ডা, পিঠা ক্যাফ, পিঠা মেলা, পিঠা বাড়ি, ফুল পিঠা ঘর, নকশী পিঠা, পিঠা মিঠাই, ঘরের পিঠা, পিঠা পুলি, পিঠা ঘর, নকশী পিঠা কুটির, বাঙালি পিঠা ঘর, পিঠা খা, বাংলাদেশি পিঠা, পিঠা বাজার, কারুপল্লি পিঠা ঘর, নওয়াবি পিঠা অন্যতম। এই পেজগুলোতে গিয়ে চাহিদা অনুযায়ী অর্ডার করতে পারেন আপনার পছন্দের পিঠা।

প্রযুক্তি আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় পিঠা বানানোর চর্চা ও সংস্কৃতি হয়তো বদলে যাচ্ছে, তবে পিঠার আবেদন রয়ে গেছে আদি ও অকৃত্রিম।


মন্তব্য যোগ করুণ