বাঁচবে কি কাপ্তাই লেক

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯

বাঁচবে কি কাপ্তাই লেক

অযত্ন অবহেলায় সৌন্দর্য্য হারাচ্ছে কাপ্তাই লেক। বেশকিছু স্থানে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে স্থাপনা। তৈরি হয়েছে কচুরিপানার জট। (ইনসেটে) লেকের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য- সমকাল

  শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম ও নজরুল ইসলাম লাভলু, কাপ্তাই

জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কাপ্তাই লেকের সৃষ্টি হলেও এখানে চাষ হয় প্রচুর মিঠাপানির মাছ। নৌবিহার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি আবাদসহ আরও বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই লেকের অবদান উল্লেখযোগ্য। কিন্তু অযত্ন ও অবহেলার কারণে ঐতিহ্যবাহী এই লেক হারিয়েছে তার সৌন্দর্য। লেকের বেশ কিছু স্থানে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে ঘরবাড়ি। কচুরিপানা, শিল্পকারখানা, খাবার হোটেলসহ ব্যবহার্য ঘরের বর্জ্য ফেলার কারণে লেকের স্বচ্ছ পানি হয়ে গেছে দূষিত ও নোংরা। লেকের বেশ কিছু এলাকায় আবার তৈরি হয়েছে কচুরিপানার জট। পাশাপাশি এই লেক থেকে রুইজাতীয় মাছ হারিয়ে যাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালিত এক গবেষণায়। তবে এই লেককে দূষণের কবল থেকে রক্ষা করতে এবার নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। লেকের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তারা। এ জন্য অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। লেকের সামগ্রিক বিষয় মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটিকে জানানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশন।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান বলেন, 'কচুরিপানা, শিল্পকারখানা, বিভিন্ন খাবার দোকান ও ঘরবাড়ির বর্জ্য ফেলার কারণে ঐতিহ্যবাহী কাপ্তাই লেকের পানি দূষিত হচ্ছে। লেকে কচুরিপানার মাধ্যমে জটের সৃষ্টি হওয়ায় বিদেশি পর্যটকরা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে লেকে ভ্রমণ করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। এতে এখানে আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। তাই এ লেককে রক্ষা করতে আমরা বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। লেকের চারপাশে অবৈধভাবে স্থাপনা তৈরি করাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটিকে জানানো হবে।'

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, কাপ্তাই বাঁধের দায়িত্বে রয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে বিদ্যুৎ বিভাগে ৪৩২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও লেকের নাব্যতা রক্ষায় তাদের আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে না। লেকে যারা মাছ ধরছে এবং কৃত্রিমভাবে মৎস্য চাষ করতে গিয়ে লেকের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও স্বাভাবিক মৎস্য উৎপাদন ব্যাহত করছে, ছাড় দেওয়া হবে না তাদেরও। কাপ্তাই-রাঙামাটির পর্যটন স্পটের নান্দনিকতা, নৈসর্গিক স্থাপনা ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ধরে রাখতে হবে। কাপ্তাই বাঁধ ও লেক রক্ষার মূল দায়িত্ব যাদের, তাদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কাপ্তাই লেককে রক্ষা করতে ড্রেজিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে লেকের দূষণ রোধ করতে লিফলেট, পোস্টার ও ব্যানারের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হবে। লেকের পানির দূষণের মাত্রা নির্ধারণ করতে নিয়মিত এর পানি পরীক্ষা করতে সংশ্নিষ্ট প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ বলেন, 'কাপ্তাই লেকের সঙ্গে পুরো দেশের ঐতিহ্য জড়িত। আমরা চাই না, দৃষ্টিনন্দন ও ঐতিহ্যবাহী এই লেক নষ্ট হয়ে যাক। এটি রক্ষায় রাঙামাটি রিজার্ভ বাজার থেকে ঠেকারমুখ পর্যন্ত ড্রেজিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে বিআইডব্লিউডিসি থেকে জরিপকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।'

কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফ আহমেদ রাসেল জানান, কাপ্তাই লেক ড্রেজিং-সংক্রান্ত বিষয়ে এরই মধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। লেকের বর্তমান চিত্র দেখতে এখানে সরেজমিন পরিদর্শনে আসবেন কমিটির সদস্যরা। পরিদর্শন শেষে তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হবে। কাপ্তাই ইউপি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আবদুল লতিফ জানান, বর্তমানে দৃষ্টিনন্দন এই কাপ্তাই লেকের আফসারের ঘোনা, কেপিএম টিলা, শুকনাছড়ি, নেভি ক্যাম্প-সংলগ্ন হ্রদ এলাকা, সেগুন টিলা, জেলেপাড়াসহ আরও কয়েকটি এলাকাসংলগ্ন হ্রদ এলাকায় প্রচুর পরিমাণে কচুরিপানার সৃষ্টি হয়েছে। এটি রোধ করতে না পারলে আশপাশের আরও অনেক এলাকায় কচুরিপানায় ভরে যাবে। এতে অনেক এলাকার পানি নষ্ট হয়ে যাবে। এতে হ্রদ পথে নৌ চলাচলসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘ্ন সৃষ্টি করে।

জেলে মিন্টু জলদাশ বলেন, 'প্রায় দুই যুগ ধরে এই হ্রদের সঙ্গে সম্পর্ক। আগে হ্রদের পানি ছিল অনেক পরিস্কার ও স্বচ্ছ। এখন পানির রঙ অনেকটা কালো বর্ণ ধারণ করেছে। কচুরিপানার পরিমাণ বেশি ও পানিতে ময়লা-আবর্জনা জমে যাওয়ার কারণে এমনটি হয়েছে।' স্থানীয় কয়েকজন অধিবাসী জানান, কাপ্তাই, বিলাইছড়ি, রাঙামাটি সদরসহ হ্রদসংলগ্ন আরও কয়েকটি এলাকায় বসবাস করা মানুষের বছরের পর বছর মলত্যাগ ও ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে পানি দূষণ হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা আর  বেশিদিন চলতে থাকলে এখানকার পুরো এলাকার পানি একেবারে দূষিত হয়ে যাবে।

দূষণের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে মাছ :মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, কাপ্তাই লেকে ১৯৬৬ সালে পাওয়া মাছের মধ্যে রুইজাতীয় মাছের হার ছিল ৮১ শতাংশ। কিন্তু ৫১ বছর পর ২০১৬ সালে এই হার বাড়ার চেয়ে উল্টো ৪ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। বাড়ছে ছোট মাছ। ১৯৬৬ সালে ছোট মাছের হার ছিল মাত্র ৮ শতাংশ, ২০১৬-তে তা দাঁড়িয়েছে ৯২ শতাংশে।

এই লেকের প্রাণ ছিল রুই, কাতলা ও মৃগেল। কিন্তু ক্রমান্বয়ে লেক থেকে কমে যাচ্ছে এসব মাছ। এরই মধ্যে দেশি সরপুঁটি, ঘাউরা, বাঘাইড়, মোহিনী বাটা, পাঙাশ প্রজাতির মাছসহ আরও কয়েক জাতের মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গবেষণায় মাছ উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, প্রজনন মৌসুমে পোনা ও মা মাছ নিধন এবং দূষণকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের রাঙামাটি জেলার ৭৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই কাপ্তাই লেকের সৃষ্টি হয় ১৯৬১ সালে।


মন্তব্য যোগ করুণ