বরিশাল সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এখন টাইলস গুদাম!

  পুলক চ্যাটার্জি, বরিশাল

জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী এবং আড়তদারদের সুবিধার জন্য ৩২ বছর আগে কীর্তনখোলা নদীর তীরে গড়ে তোলা হয় বরিশাল আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও পাইকারি বাজার। প্রতিষ্ঠার ২১ বছর পর মাত্র দুই বছর চালু ছিল আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি। স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের আধুনিক এ স্থাপনাটি এখন পরিণত হয়েছে টাইলস গুদামে। মাত্র তিনজন কর্মচারী প্রায় দেড় একর জায়গার ওপর নির্মিত এ সরকারি স্থাপনাটি দেখভাল করছেন। দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক এ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এখন। সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, বরিশালের এ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

ডেনমার্ক সরকারের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন বরিশাল নগরীর বান্দ রোডে কীর্তনখোলা নদীর তীরে গড়ে তোলে এ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও পাইকারি বাজার। ১৯৮৬ সালের ২ জুলাই তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী সিরাজুল ইসলাম খান এ অবতরণ কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন। কিন্তু উদ্বোধনের পর থেকেই বরিশালের মৎস্য ব্যবসায়ীরা এখানে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। তারা কীর্তনখোলা নদীতীরের পোর্ট রোড অংশে গড়ে তোলেন অননুমোদিত পাইকারি মৎস্য বাজার। ২০০৭ সালের জুন মাসে স্থানীয় প্রশাসন ও যৌথ বাহিনী পোর্ট রোডের খাস জমি দখল করে গড়ে তোলা পাইকারি মৎস্য বাজার ভেঙে দেয়। ওই বছরের জুন মাসে স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের চাপের মুখে সরকারি এ অবতরণ কেন্দ্রে পাইকারি বেচাকেনা শুরু করেন। মাত্র দুই বছর এখানে ব্যবসায়ীরা কেনাবেচা করলেও ২০০৯ সালের ১৩ জুলাই আবার পোর্ট রোডের অবৈধ পাইকারি মাছ বাজারে ফিরে যান। ফলে আধুনিক পরিবেশে মানসম্মতভাবে মৎস্য অবতরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সরকারি উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়ে আবার। বিষয়টি নিয়ে মৎস্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রশাসনের বারবার বৈঠক হলেও ফিরে আসেননি তারা।

বরিশালের মৎস্য ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণে বছরের পর বছর ধরে অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ৩২ কক্ষের দ্বিতল পাকা আড়তঘর, সেমিপাকা প্রশাসনিক ভবন। বিকল হয়ে আছে একটি বরফ কল ও গভীর নলকূপ। আধুনিক এ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি দেখভাল করতে ২৪ জন জনবলের বিপরীতে এখন আছেন মাত্র তিনজন। তাদের একজন অফিস সহায়ক শফিকুল ইসলাম জানান, আড়ত শেডগুলো বছরের পর বছর অব্যবহূত থাকায় সেগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। তাই গত বছরের এপ্রিল মাসে ওই শেডগুলো গুদামঘর বানিয়ে ভাড়া দেওয়া হয়েছে, যা থেকে প্রতি মাসে প্রতিষ্ঠানটির আয় হয় এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা। শফিকুল ইসলাম বলেন, 'সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি রক্ষা করতে হলে পুনরায় এখানে পাইকারি বাজার চালু করা প্রয়োজন।'

তবে সরকারি এ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে না আসার কারণ জানিয়ে স্থানীয় মৎস্য আড়তদার মালিক সমিতির একাধিক প্রতিনিধি বলেছেন, যেখানে অবতরণ কেন্দ্র এবং পাইকারি বাজার গড়ে তোলা হয়েছে, সেখানে নৌকা ও ট্রলার থেকে মাছ তোলার পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। অবতরণ কেন্দ্রে মাত্র ৩২টি আড়তঘর তৈরি করা হয়েছে। অথচ বরিশাল মোকামে আড়তদার আছেন প্রায় ১৫০ জন। ফলে সেখানে সব আড়তদার যেতে পারেন না। আড়তঘরগুলো এত ছোট যে, সেখানে ৫-৬ জন শ্রমিকের বেশি একসঙ্গে বসা সম্ভব না। কিন্তু প্রত্যেক আড়তে ৫০-৬০ জন শ্রমিক রয়েছে। অবতরণ কেন্দ্রের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ভরা মৌসুমে একযোগে ৮-১০টি ট্রাকে মাছ প্যাকিং করা সম্ভব হয় না। ফলে আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা সরকারি অবতরণ কেন্দ্র ও পাইকারি বাজারবিমুখ।

বরিশাল মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও পাইকারি বাজারের ব্যবস্থাপকের অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লেফটেন্যান্ট মো. নুরুল আমিন। তিনি জানান, বরিশাল মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ কী তা বলা মুশকিল। এ প্রতিষ্ঠানটি আর চালু না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। প্রতিষ্ঠানটি চালু করার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য বারবার মন্ত্রণালয়ে অনুরোধ জানালেও কোনো সুফল মিলছে না।


মন্তব্য যোগ করুণ