টেলিভিশন

পলাশ থেকে কাবিলা...

প্রকাশ : ২৯ আগষ্ট ২০১৯ | আপডেট : ২৯ আগষ্ট ২০১৯

পলাশ থেকে কাবিলা...

জিয়াউল হক পলাশ

  বিনোদন প্রতিবেদক

বর্তমান নাটকের তরুণ হাসিমুখ পলাশ। ২৬ আগস্ট ঠিক সন্ধ্যার আগে তিনি সমকালে এসেছেন তার হাসিমাখা গল্প শোনাতে। শুরুতেই তাকে মনে করিয়ে দিই নোয়াখালীর কথা। কাকতালীয়ভাবে আমাদের গল্পও জমে ওঠে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায়। পলাশের বেড়ে ওঠা ঢাকার নাখালপাড়ায়। তবে শৈশবের রঙিন দিনগুলো কেটেছে নোয়াখালীতে। মা ন্যাওটা পলাশ গভনমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে পড়তেই পাড়ায় মুস্তফা সরয়ার ফারুকীর কাজ দেখতেন।

আজ এই রাস্তায় শুটিং তো কাল ও বাড়ির ছাদে নায়িকার রোমান্টিক ডায়ালগ। শুটিং টিমের সবাই উঠছে, বসছে এবং কথা বলছে ফারুকীর নির্দেশে। এই দেখে তার ভেতরও জেগে ওঠে ডিরেক্টরের চারাগাছ। পরীক্ষার খাতায় লিখে দিয়ে আসেন- মাই এইম ইন লাইফ ইজ টু বি অ্যা ডিরেক্টর। তারপর ঠিকই যোগ দেন ফারুকীর দলে। দুই বছর কাজ করেছেন ফারুকীর সহকারী পরিচালক হিসেবে। তিন বছর একই কাজ করেছেন ইশতিয়াক আহমেদ রুমেলের সঙ্গে। কিন্তু এই পরিচালক হুট করে হয়ে গেলেন অভিনেতা! একে একে অভিনয় করেছেন- 'ব্যাচেলর পয়েন্ট', 'এক্স বয়ফ্রেন্ড', 'এক্স গার্লফ্রেন্ড', 'ব্যাচেলর ঈদ', 'ব্যাচেলর ট্রিপ', 'মি অ্যান্ড ইউ', 'ইনকমপ্লিট', 'মুঠোফোন'সহ অসংখ্য নাটকে। পরিচালনা করেছেন 'ফ্রেন্ড উইথ বেনিফিট' ও 'সারপ্রাইজ'। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন 'ব্যাচেলর পয়েন্ট'-এ কাবিলা চরিত্রে অভিনয় করে। 

ক্লাসের একমাত্র ফেলটুস!

২০০৯ সালে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। অনেকের সঙ্গে পলাশের মাও গিয়েছেন ছেলের ফলাফল জানতে। কিন্তু একমাত্র পলাশের মাকেই হতাশ হয়ে বাসায় ফিরতে হয়েছে। স্কুলের একমাত্র ফেলটুস যে তার ছেলে। সেদিন খুব কান্না করেছিলেন পলাশের মা। মায়ের চোখের পানি পলাশের হৃদয় খুঁড়ে বারবার বেদনা জাগায় এখনও। যদিও ২০১০ সালে পলাশ এসএসি পাস করেছেন। এইচএসসিতে এসে ফের ইয়ার লস। ২০১৩ সালে পাস করেন এইচএসসিও। এরপর ভর্তি হন তিতুমীর কলেজে। 

উড়ে গেল পাখি!

এইচএসসিতে সখ্য গড়ে ওঠে এক বান্ধবীর সঙ্গে। পরস্পরে কথা দেওয়া-নেওয়া হয়। পলাশ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে তবেই প্রিয় বান্ধবীর পরিবারের সদস্যদের মুখোমুখি দাঁড়াবেন। আর বান্ধবী পড়বেন মেডিকেলে। মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো পলাশরাও এমন ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার স্বপ্নে বিভোর। এগিয়ে চলছে দিন। কিন্তু না; কথা রাখতে পারেননি পলাশ। পারবেন কেমন করে! তার ভেতরে যে পরিচালক হওয়ার তাড়না মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এর মধ্যে। দিনমান নাটক আর সিনেমার ভূত তাড়া করে। তাড়া খাওয়া পলাশ পড়াশোনায়ও অনিয়মিত। তবুও তিতুমীর কলেজ থেকে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে অনার্স ক্লাস করেন। আর পাখি? ওই যে, প্রিয় বান্ধবী; যার সঙ্গে কথা দেওয়া-নেওয়া হয়েছে

তিনি দিলেন উড়াল। অন্যের নীড়ে আশ্রয় নিলেন। পলাশের মন খারাপের দিন শুরু হলো। এই মন খারাপের দিনকে পুঁজি করেই নাটকে নামেন আঁটঘাট বেঁধে। ওদিকে পাখি তো উড়ছেই। অন্যের আকাশে!


সিক্রেট অব বজরা

'ব্যাচেলর পয়েন্ট' নাটক চলাকালীন থেকে এখন পর্যন্ত অসংখ্য ফোন পেয়েছেন পলাশ। কাদের? জাকিরদের। জাকিররা ফোন করে। রাজ্যের কথা শোনায়। এ সময় টুট টুট টুট... ফোন কেটে দেয় পলাশ। এক সন্ধ্যায় ফোন করে নিজের ব্যক্তিগত মন খারাপের কথা জানিয়েছেন বজরা বাজারের মাদ্রাসা শিক্ষক জাকির হোসেন। ফোন দিয়ে বলেন, 'কাবিলা ভাই, আঁই আন্নেগো কি ক্ষতি কইচ্ছি? কুড়ি বছরের শিক্ষকতা জীবনে কেউ আঁরে লই হাসি-ঠাট্টা করেনো। অন আন্নেরা কি নাটক বানাইছেন হোলা-হাইন আঁরে লই মজা করে। হাসি-ঠাট্টা করে।' এমন ফোনে মন খারাপ হয় পলাশেরও। তার কাছে জানতে চায় বজরা বাজার আর জাকির সম্পর্কে। পলাশ বলেন, 'আসলে নাটকের শুটিংয়ের সময় পরিচালক কাজল আরেফিন অমি ভাই বললেন এক শব্দে নোয়াখালীর কোনো একটা জায়গার নাম বলতে। একবার ভাবলাম আমার উপজেলা সোনাইমুড়ীর কথা বলব। পরে ভাবলাম, নানার বাড়ি গিয়ে যেই বাজারে আড্ডা দিই সেই বাজারের নামটাই বলি। বললাম, বজরা বাজার। পরিচালক বললেন, নোয়াখালীর নামের সঙ্গে যায় এমন একজনের নাম বলতে। আমি চিন্তা না করেই বলে দিই জাকির। আলোচনায় আসে বজরা বাজারের জাকির। আসলে জাকির আমার ছোট মামার নাম।'

নানা ভাই ও রোকেয়া...

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের পূর্ব কালিকাপুর গ্রামে আমার নানার বাড়ি। ছোটবেলায় অনেকটা সময় কেটেছে এই গ্রামে হেসে-খেলে। নানার সঙ্গে ছিল খুব সখ্য। নানা প্রায়ই ঢাকায় আসতেন, আমাদের নাখালপাড়ার বাসায়। আমি হয়তো কারও সঙ্গে গল্প করছি বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি। নানাভাই আমাকে ডাকতেন- 'ইরে হলাইশ্যা, ইমুই আয়।' খুব লজ্জা পেতাম তখন। মায়ের সঙ্গে এই নিয়ে মন খারাপও করতাম। কিন্তু নানা ভাইয়ের আদরের কাছে সব রাগ তুলো হয়ে ভেসে চলে যেত আকাশের দেশে। এদিকে অভিনয় করতে এসে পড়েছি আরেক ঝামেলায়। ব্যাচেলর পয়েন্টে একমাত্র অদেখা জনপ্রিয় চরিত্র রোকেয়া। যাকে এখন পর্যন্ত নাটকে দেখানো হয়নি। এই সেদিনও রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছি আমার আপুকে নিয়ে। এক লোক এসে বলেন, 'এই কাবিলা, এটা কি তোমার রোকেয়া?' 

এ ছাড়া আরও অনেক বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছে এই রোকেয়াকে নিয়ে। তবু এই দুটি চরিত্র- একটা বাস্তব জীবনের, অন্যটি আমার অভিনয় জীবনের গোপন সুখ। অন্যরকম এক ভালো লাগা। 

ডাকে নদী ডাকে জোছনা

পলাশের কানে এসে লাগে নদীর আয় আয় ডাক। ডাক শোনে জোছনারও। তাই ছুটে যান নদীর কাছে। আয়েশ করে ছাদে বসে দেখেন জোছনা। একটু সময় পেলে ডুব দেন বইয়ের রাজ্যে। লিখেন কবিতা। তবে নাটকের কবিতা নয়! নাটকে ছন্দহীন যেই কবিতা পড়েন পলাশ তা নিতান্তই মজা আর আনন্দ দিতে। সাহিত্যের মায়ায় পড়া পলাশ অভিনয়ের পাশাপাশি বানাতে চান সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র। পরিচালনা করতে চান জীবনঘনিষ্ঠ নাটক। পলাশের শুরুর পথটা কষ্টের হলেও এখন মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই তাকে কাজে সাপোর্ট দেন। জুনায়েদ ইভান আর কাজল আরেফিন তাকে দিয়েছেন অন্য এক জগতের স্বাদ! পলাশ এই জীবন টেনে নিয়ে যেতে চান অনন্তকাল। 

মন্তব্য


অন্যান্য