প্রযুক্তি

টেলিযোগাযোগ খাতে বড় জটিলতা

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

টেলিযোগাযোগ খাতে বড় জটিলতা

  রাশেদ মেহেদী

নতুন ভ্যাট আইনের কারণে বড় জটিলতায় পড়েছে টেলিযোগাযোগ খাত। এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করে। কিন্তু বিটিআরসির ভ্যাট নিবন্ধন নেই। অথচ নতুন ভ্যাট আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, নিবন্ধন ছাড়া কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভ্যাট আদায় করতে পারবে না। একই সঙ্গে এটাও বলা হয়েছে, ভ্যাট নিবন্ধন নেই এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্রয়-বিক্রয় বা লেনদেনও করা যাবে না। এদিকে আগামী ১০ জুলাইর মধ্যে দ্বিতীয় প্রান্তিকে সরকারের সব ধরনের পাওনা পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে মোবাইল অপারেটরদের। এখন নতুন আইন অনুযায়ী বিটিআরসির ভ্যাট নিবন্ধন না থাকার কারণে তাদের কাছে ভ্যাট পরিশোধ করতে পারবে না মোবাইল অপারেটররা। একই সঙ্গে বেতার তরঙ্গ ব্যবহারসহ যেসব সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে সেসব সেবাও বিটিআরসির কাছ থেকে নিতে পারবে না মোবাইল অপারেটররা। এ অবস্থায় ১০ জুলাই থেকে সার্বিকভাবে মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবাই বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে বলে সমকালকে জানিয়েছেন মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এস এম ফরহাদ। গতকাল বুধবার এ জটিলতা নিরসনের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মূসক বিভাগের সঙ্গে চারটি মোবাইল অপারেটরের শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠকও করেছেন। সূত্র জানায়, বৈঠক থেকে জটিলতা নিরসনে সন্তোষজনক সমাধান আসেনি।

এ ব্যাপারে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেন, আরও অনেক আগেই বিটিআরসিকে ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। বিটিআরসি ভ্যাট নিবন্ধন নিলেই এ জটিলতা কেটে যাবে। মন্ত্রণালয়ের অবস্থান পরিস্কার, মন্ত্রণালয় চায় বিটিআরসি দ্রুত ভ্যাট নিবন্ধন নিয়ে নিক।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান জহুরুল হক সমকালকে বলেন, বিটিআরসি আরও প্রায় ছয় মাসের বেশি আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে ভ্যাট নিবন্ধন চেয়েছে। এর পর একাধিকবার তাদের তাগাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা নিবন্ধন দেয়নি। তবে নিবন্ধন না পেলেও বিটিআরসি যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেই ভ্যাট আদায় করছে এবং সরকারের কাছে পরিশোধ করছে। ফলে এ নিয়ে জটিলতার কিছু আছে কিংবা নতুন করে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার কোনো কারণ নেই। এ ব্যাপারে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একটি আইনি জটিলতার কারণে বিটিআরসির ভ্যাট নিবন্ধন আটকে আছে। এ আইনি জটিলতা নিরসন হলে এনবিআর এখনই নিবন্ধন দিয়ে দিতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১১ সালে মোবাইল অপারেটরদের টুজি লাইসেন্স নবায়নের সময়ই বিটিআরসির ভ্যাট নিবন্ধন না থাকার বিষয়টি সামনে আসে। নিবন্ধন না থাকা সত্ত্বেও বিটিআরসি কীভাবে ভ্যাট আদায় করছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে অপারেটররা। সে সময় এনবিআর থেকে একটি বিশেষ কোড বরাদ্দ নিয়ে ভ্যাট আদায় শুরু করে বিটিআরসি। এক পর্যায়ে এ বিতর্ক আদালতে গড়ায় আইনি লড়াই হিসেবে। মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন এবং রবি এ বিষয়ে পৃথক রিট দায়ের করে। ২০১৪ সালে হাইকোর্ট রবির দায়ের করা রিটের রায়ে বিটিআরসিকে ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়ার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশের বিরুদ্ধে সে সময় আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করে বিটিআরসি। সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, ওই আপিলটি এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়নি। এ কারণেই বিটিআরসি ভ্যাট নিবন্ধনের জন্য আবেদন করলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিটিআরসিকে ভ্যাট নিবন্ধন দিতে পারছে না।

জানা গেছে, বিটিআরসি এখন পর্যন্ত এনবিআরের একটি কোডের মাধ্যমে লাইসেন্স নবায়ন ফি, বেতার তরঙ্গ নবায়ন বাবদ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করে সরকারের কাছে দিয়ে আসছে। তবে রাজস্ব আয়ের

ভাগাভাগির ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটররা বিটিআরসিকে ভ্যাট দেয়নি। এর কারণ হিসেবে একটি মোবাইল অপারেটরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়টিই এক ধরনের কর, সে কারণে এর ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যৌক্তিক নয়। এ কারণেই এনবিআর বিশেষ পরিপত্র জারি করে রাজস্ব ভাগাভাগির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট রেয়াত সুবিধা দিয়েছিল। কিন্তু নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার পর আগের সেই পরিপত্র আর বহাল নেই। ফলে এখন মোবাইল অপারেটরদের রাজস্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতেই হবে। আর এখানেই বড় জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। বিটিআরসির ভ্যাট নিবন্ধন না থাকার কারণে নতুন ভ্যাট অনুযায়ী বিটিআরসির কাছে মোবাইল অপারেটরদের ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ নেই। বিটিআরসির কাছ থেকে কোনো সেবা নেওয়ারও সুযোগ নেই। আবার ১০ জুলাইয়ের মধ্যে সরকারের সব পাওনা পরিশোধ করতে হবে। এখন ১০ তারিখ থেকে মোবাইল অপারেটররা কী করবে সেটাই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে চলে এসেছে।

এ ব্যাপারে অ্যামটব মহাসচিব এস এম ফরহাদ বলেন, মোবাইল অপারেটররা সব সময়ই সরকারের আইন ও নীতি অনুযায়ী সরকারের প্রাপ্য অর্থ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়ে আসছে। এতদিন সেভাবেই চলেছে। কিন্তু এখন নতুন ভ্যাট আইন অনুযায়ী অর্থ আদায়কারী প্রতিষ্ঠানেরও ভ্যাট নিবন্ধন থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভ্যাট নিবন্ধন দ্রুত হওয়া দরকার। তা না হলে অপারেটররা তাদের সেবা দান কার্যক্রম চালু রাখা নিয়ে বেশ জটিলতায় পড়ে যাবে। অ্যামটব আশা করছে জটিলতা নিরসনে সংশ্নিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।

মন্তব্য


অন্যান্য