প্রযুক্তি

'বাংলাদেশে তৃণমূলেও ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দেবে ফাইভজি'

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

'বাংলাদেশে তৃণমূলেও ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দেবে ফাইভজি'

হুয়াওয়ে বাংলাদেশের চিফ টেকনোলজি অফিসার ওয়াং সিউ জেরি

  রাশেদ মেহেদী

ফোরজির যুগ চলছে, এখন ফাইভজির নতুন সম্ভাবনা পৃথিবীর সামনে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশও। এরই মধ্যে প্রস্তুতি নেওয়াও শুরু হয়েছে এ ব্যাপারে। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে গতকাল রোববার গুলশানের এক্সিপেরিয়েন্স সেন্টারে 'ইনোভেশন টু অ্যাডভান্স ডিজিটাল বাংলাদেশ' প্রদর্শনীতে প্রদর্শন করল বাংলাদেশে ফাইভজির সম্ভাবনার অনেক দিক। বিশেষ করে স্মার্ট সিটি গড়ে তোলা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মানুষের এগিয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো মুগ্ধ করেছে দর্শনার্থীদের। হুয়াওয়ে বাংলাদেশের চিফ টেকনোলজি অফিসার (সিটিও) ওয়াং সিউ জেরি সমকালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, 'বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবা তৃণমূলে পৌঁছে দেওয়ার যে লক্ষ্য সরকারের আছে, তা সার্থক করে তুলবে ফাইভজি।' থ্রিজি এবং ফোরজি সেবায় বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বর্তমানে জেনেভা সফরে থাকা ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সফরে যাওয়ার আগে সমকালকে বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি দুনিয়ায় বাংলাদেশ আর পিছিয়ে নেই, পিছিয়ে থাকবেও না। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে ফাইভজি চালুর লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে।

কেন ফাইভজি :ফাইভজি প্রযুক্তি আগের দুটি প্রযুক্তির মতোই মোবাইল ইন্টারনেটের গতি বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু প্রযুক্তির কারিগরি দিকটি একেবারেই আলাদা। হুয়াওয়ের সিটিও বলেন, থ্রিজি এবং ফোরজি প্রযুক্তিতে বেতার তরঙ্গ ব্যহারের ক্ষেত্রে যেসব দুর্বলতা ছিল, সেটা ফাইভজিতে নেই। ফাইভজিতে অনেক কম বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে আরও বেশি মানসম্পন্ন সেবা এবং দ্রুতগতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর ফলে ফাইভজি চালুর শুরুতে একটা বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হলেও সেবাদান পর্যায়ে অপারেটররা অনেক সাশ্রয়ী মূল্যেই সেবা নিশ্চিত করতে পারবে। গ্রাহকরাও একটা পর্যায়ে আগের চেয়ে কম টাকায় উন্নত সেবা পাবেন।

তিনি জানান, ফাইভজির মাধ্যমে হাইডেফিনেশন বা উন্নততর সজীব ভিডিও চিত্র আদান-প্রদান সম্ভব হবে খুব সহজে। এর ফলে টেলিচিকিৎসা, টেলি ক্লাসরুমের মতো পদ্ধতিগুলো যেমন আরও জনপ্রিয় হবে, তেমনি 'স্মার্টসিটি'র নতুন ধরনের সেবা চালু সহজ হবে। 'স্মার্ট কার পার্কিং', 'স্মার্ট ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ', 'ভবনের স্মার্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা'সহ সিটি করপোরেশনের মতো জনসেবা দেওয়া সংস্থাগুলোও সেবার ক্ষেত্রে স্মার্ট ব্যবস্থা চালু করতে পারবে। স্মার্ট শিল্প কারখানা ব্যবস্থাও চালু সম্ভব হবে। উন্নত কয়েকটি দেশে শিল্প কারখানায় এই 'স্মার্ট ম্যানেজমেন্ট' সিস্টেম চালু হয়েছে, যা তাদের পরিচালনা ব্যয়ও অনেকখানি কমিয়ে দিয়েছে।

হুয়াওয়ের সিটিও বলেন, এর পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে ফাইবার অপটিক কেবল নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, সেখানে ফাইভজির মাধ্যমে মোবাইল ব্রডব্যান্ড সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। কারণ বর্তমানে ফোরজি সেবায় ৪৫ এমবিপিএস গতিতে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা দেওয়া সম্ভব হয়। এই গতির পরিমাণ ১০০ এমবিপিএস বা এক জিবিপিএস পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু ফাইভজিতে গতি হবে পাঁচ জিবিপিএস থেকে ১০ জিবিপিএস পর্যন্ত। উচ্চগতি এবং বেতার তরঙ্গের অধিকতর দক্ষ ব্যবহারের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবাসহ ডিজিটাল যে কোনো সেবা খুব সহজে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত :এর আগে থ্রিজি এবং ফোরজি সেবায় বাংলাদশের গ্রাহকরা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। হুয়াওয়ের সিটিও বলেন, এটা আসলে সাধারণ মানুষের একটা ধারণা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, টুজির চেয়ে থ্রিজিতে গতি বেশি হয়েছে, ফোরজিতে আরও বেশি হয়েছে। এখন বাংলাদেশের গ্রাহকরা স্মার্টফোনে হাইডেফিনেশন ভিডিও দেখতে পাচ্ছেন ফোরজি প্রযুক্তি ব্যবহার করেই। আর ফাইভজি আসলে গ্রাহকরা মোবাইল ইন্টারনেটে কয়েক গুণ বেশি গতি পাবেন এবং ব্রডব্যান্ড সংযোগের ওপর নির্ভরতা কমে যাবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিগত অবকাঠামো ফাইভজির উপযোগী আছে। হুয়াওয়ে এরই মধ্যে ত্রিশটি দেশের সঙ্গে ফাইভজি চালুর জন্য প্রযুক্তি সেবা দেওয়ার চুক্তি করেছে।

একটি মোবাইল ফোন অপারেটরের একজন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ফাইভজি চালুর ক্ষেত্রে অপারেটরদের বড় বিনিয়োগের বিষয় আছে। এ ছাড়া বেতার তরঙ্গের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফাইভজির জন্য আদর্শ বেতার তরঙ্গ হচ্ছে ২৬০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড। পাশাপাশি অন্য ১৮০০, ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডেও সেবা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সরকারি নীতিতে সুলভে বেতার তরঙ্গ দেওয়ার এবং সঠিক ব্যান্ডের বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়ার নীতি গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, থ্রিজি এবং ফোরজির ক্ষেত্রেও মোবাইল অপারেটররা বেতার তরঙ্গ সুলভে পায়নি। যে কারণে উচ্চ বিনিয়োগের বিবেচনায় কাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় গ্রাহক না পাওয়ার কারণে লোকসানের মুখেও পড়তে হয়েছে। ফাইভজিতে অপারেটররা এই ঝুঁকি নিতে চায় না। এই কর্মকর্তা বলেন, ফাইভজি চালুর বিষয়ে পরিকল্পনার পাশাপাশি এখন ফোরজি সেবার মান আরও উন্নত করতেই বেশি নজর দিচ্ছে অপারেটররা।

হুয়াওয়ের সিটিও বেতার তরঙ্গ সম্পর্কে বলেন, 'বাংলাদেশে বেতার তরঙ্গের ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট ভালো। তিনি বলেন, ২৬০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড প্রযুক্তিগত কারিগরি দিক থেকে ফাইভজির জন্য সবচেয়ে উপযোগী। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ২৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে এবং কয়েকটি দেশ ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডেও ফাইভজি চালু করেছে।

বাংলাদেশের বাজারে ফাইভজি হ্যান্ডসেট এখনও নেই। এ ব্যাপারে হুয়াওয়ের সিটিও ওয়াং সিউ জেরি বলেন, 'বর্তমানে বেশ কিছু আর্ন্তজাতিক ব্র্যান্ড তাদের ফ্লাগশিপ ফাইভজি মডেল চালু করেছে, এগুলোর দাম অনেক বেশি। কিন্তু ফাইভজি চালু হবে যখন, তখন হ্যান্ডসেট নির্মাতারাও সুলভ মূল্যে বাজারে ফাইভজি হ্যান্ডসেট নিয়ে আসবেন, যেমনটা ফোরজির ক্ষেত্রেও হয়েছে।'

মন্তব্য


অন্যান্য