প্রযুক্তি

গ্রামীণফোনকে এসএমপি ঘোষণায় চাঞ্চল্য

বিদেশি বিনিয়োগে বিরূপ প্রভাবের শঙ্কা

প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রামীণফোনকে এসএমপি ঘোষণায় চাঞ্চল্য

  রাশেদ মেহেদী

টেলিযোগাযোগ খাতে বিটিআরসির 'সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার (এসএমপি)' ঘোষণা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। টেলিযোগাযোগ খাতে সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়েই বিটিআরসি এসএমপি ঘোষণার মতো শক্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনকে কঠোর বিধিনিষেধে বেঁধে ফেলার বিষয়টি টেলিযোগাযোগ খাতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।

সমকালের সঙ্গে আলাপে তারা বলেন, এসএমপি ঘোষণার ক্ষেত্রে বিটিআরসির উদ্দেশ্য খুবই ভালো; কিন্তু কার্যপদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ। এ কারণেই বিটিআরসির সিদ্ধান্তের ফলে টেলিযোগাযোগ খাতে বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রবল। তারা আরও বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় গবেষণা সেল না থাকায় সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বারবারই সমস্যা দেখা যায়। যেমন আরও পাঁচ বছর আগে যখন এমএনপি বা নম্বর না বদলে মোবাইল অপারেটর বদলের সেবা চালুর সঠিক সময় ছিল, তখন বিটিআরসি তা করেনি। সংস্থাটি এখন এমএনপি সেবা চালু করেছে, যা খুব বেশি সাড়া ফেলেনি। সঠিক সময়ে এমএনপি সেবা চালু হলে এখন এসএমপি ঘোষণার মতো জটিল সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হতো না বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এসএমপি কী :সাধারণত বাজারে কোনো কোম্পানি একক আধিপত্য বা 'মনোপলি' সৃষ্টি করে গ্রাহকস্বার্থ ক্ষুণ্ণম্ন এবং বাজারের অন্য কোম্পানির ব্যবসায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাধা সৃষ্টির ক্ষমতা অর্জন করলে সেখানে 'প্রতিযোগিতা আইন' প্রয়োগ করা হয়। উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের প্রতিযোগিতা আইন আছে। বাংলাদেশেও ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন প্রণয়ন করা হয় এবং এর আওতায় একটি প্রতিযোগিতা কমিশনও গঠন করা হয়। তবে সেই প্রতিযোগিতা কমিশনের কর্মকাণ্ড কখনোই দৃশ্যমান হয়নি। এই প্রতিযোগিতা আইনের অধীনে আইনগত পদক্ষেপ হিসেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাজারে 'মনোপলি' সৃষ্টির ক্ষমতাসম্পন্ন কোম্পানিকে এসএমপি বা বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী ঘোষণা করতে পারে। এসএমপি ঘোষণার অর্থ হচ্ছে, সংশ্নিষ্ট কোম্পানির একক আধিপত্যের সামনে বিধিনিষেধের লাগাম টেনে দেওয়া।

বাংলাদেশে প্রতিযোগিতা আইনটি গত ছয় বছরে অন্যান্য ক্ষেত্রে কার্যকর করা হয়নি। প্রথমবারের মতো বিটিআরসি টেলিযোগাযোগ খাতে এসএমপি ঘোষণা করে প্রতিযোগিতা আইন প্রয়োগের বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ইউরোপের দেশগুলোতে এসএমপি ঘোষণার নজির থাকলেও দক্ষিণ এশিয়া এবং এশিয়ার অন্য কোনো দেশে এমনটা দেখা যায়নি। ভারতের প্রতিযোগিতা আইনে কোনো কোম্পানি ৫০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার অর্জন করলে সেই কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার বিধান রাখা হয়েছে। তবে সেখানে এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানিকে এসএমপি ঘোষণার নজির নেই।

যে কারণে গ্রামীণফোনকে এসএমপি ঘোষণা :এসএমপি নীতিমালা সম্পর্কে বিটিআরসির চেয়ারম্যান জহুরুল হক সাংবাদিকদের বলেছিলেন, টেলিযোগাযোগ খাতে গ্রাহকস্বার্থ রক্ষা, সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টির জন্যই এটা প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আওতায় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। গত সোমবার প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সেই চূড়ান্ত পদক্ষেপই নিয়েছে বিটিআরসি।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে বিটিআরসি টেলিযোগাযোগ খাতে সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করায় সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়েছে। দেখা যায়, গ্রামীণফোনের বর্তমানে বাজারে অংশীদারিত্ব ৪৬ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রবির অংশীদারিত্ব ৩০ শতাংশ, বাংলালিংকের ২২ শতাংশ এবং টেলিটকের মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। গ্রামীণফোন বাজারে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে আছে। এর ফলে বাজারে নানাভাবে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হচ্ছিল। এ ছাড়া শীর্ষ অপারেটর হলেও গ্রামীণফোনের সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। এ ব্যাপারে গ্রামীণফোনকে বারবার জানানোর পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সেবার ক্ষেত্রে গুণগত মান নিশ্চিত করাকে বিটিআরসি অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণেই এ ব্যাপারে ধারাবাহিকভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে সংস্থাটি। এ পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এর আগে এমএনপি সেবা চালু এবং বিলের ক্ষেত্রে 'অফনেট-অননেট' ব্যবস্থা তুলে দিয়ে একটি সাধারণ 'মূল্য' নির্ধারণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এবার ঘোষণা করা হলো এসএমপি।

বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা :তথ্যপ্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র ফেলো আবু সাঈদ খান সমকালকে বলেন, 'বিটিআরসি যে উদ্দেশ্যে এসএমপি ঘোষণা করেছে, তা ভালো। কিন্তু তাদের কার্যপদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ। এ পদ্ধতি নির্ধারণের আগে এর পরবর্তী প্রভাব কী হবে তা বিবেচনা করেনি বিটিআরসি। গ্রামীণফোন কেন শীর্ষ অপারেটর হয়েছে, তার নেপথ্যের কারণগুলোও সংস্থাটি আমলে নিয়েছে বলে মনে হয় না।'

তিনি বলেন, গ্রামীণফোন রেলওয়ের ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক থেকে অপেক্ষাকৃত অল্প ব্যয়ে সেবা দেওয়ার সুযোগ প্রথম থেকে পেয়েছে এবং তা এখনও অব্যাহত আছে। এসএমপি ঘোষণার পরও তা অব্যাহত থাকবে। অন্য অপারেটররা এই সুবিধা আগেও পায়নি, ভবিষ্যতেও পাবে কি-না, সংশয় আছে। এর ফলে এই এসএমপি ঘোষণা বাজারে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

এ ব্যাপারে টেলিযোগাযোগ খাত বিশেষজ্ঞ ও অ্যামটবের সাবেক মহাসচিব টিআইএম নুরুল কবীর সমকালকে বলেন, এসএমপি ঘোষণা টেলিযোগাযোগ খাতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে দুশ্চিন্তা রয়েছে। গ্রামীণফোন শুধু টেলিযোগাযোগ খাতের শীর্ষ অপারেটর নয়, বরং একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগও তাদের। তারা বর্তমানে শেয়ারবাজারে আছে। এ ধরনের একটি কোম্পানি হঠাৎ নিয়ন্ত্রিত হলে টেলিযোগাযোগ খাতে ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগ বড় হুমকিতে পড়বে। বর্তমানে বড় আকারে বেতার তরঙ্গ অবিক্রীত আছে। শীর্ষ অপারেটর বিধিনিষেধে পড়ার কারণে এই বেতার তরঙ্গ বিক্রি করে রাজস্ব আয়ের পথও সংকুচিত হবে। তিনি বলেন, বিটিআরসির একটি গবেষণা সেল থাকা দরকার। তাহলে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে। নুরুল কবীরের ধারণা, এসএমপি ঘোষণার ফলে বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কাই বেশি।

মন্তব্য


অন্যান্য