সিলেট

সিলেটসহ হাওর অঞ্চলের কোথাও উন্নতি, কোথাও অবনতি, বেড়েছে দুর্ভোগ

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৯ | আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৯

সিলেটসহ হাওর অঞ্চলের কোথাও উন্নতি, কোথাও অবনতি, বেড়েছে দুর্ভোগ

সিলেটের সোবহানীঘাট এলাকায় বাড়ির সামনে বন্যার পানিতে মাছ ধরছে তিন শিশু- ছবি ইউসুফ আলী

  অনলাইন ডেস্ক

সুনামগঞ্জে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। তবে এ জেলার জগন্নাথপুরে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা বন্যাকবলিত হওয়ার পর এবার বিশ্বনাথের দিকে ধেয়ে আসছে পানি। এরই মধ্যে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে গেছে। 

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। মৌলভীবাজারের কুশিয়ারা, মনু ও ধলাই নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে দুই উপজেলার ১০ হাজার মানুষ। 

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কুশিয়ারা ডাইক ভেঙে ৫০ গ্রাম তলিয়ে গেছে। নেত্রকোনা জেলার তিন শতাধিক গ্রামে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। বন্যাকবলিত হয়েছে কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের ৫০ পরিবার। সিলেট ব্যুরো ও সংশ্নিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

সুনামগঞ্জ : জেলার অনেক এলাকা থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে; কিন্তু বাড়ছে দুর্ভোগ। ঘরে কাদা, পায়খানা ডুবে আছে। চুলায় পানি। যাতায়াত ভোগান্তি রয়েই গেছে। কয়েকদিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন ছিল বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের মানুষ। গত ২৪ ঘণ্টায় এ উপজেলায় এক ফুটেরও বেশি পানি কমেছে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল হক বলেন, ভিটার পানি নামছে অনেকের, কিন্তু দুর্ভোগ বাড়ছে। রান্নাবান্না করা এবং পায়খানা-প্রস্রাব করারও সমস্যা রয়েছে।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সমীরণ বিশ্বাস জানালেন, এখানকার ছয়টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি থেকে বন্যার্তরা বাড়ি ফিরে গেছেন।

এদিকে, জগন্নাথপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, রোববার উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের কান্দারগাঁও, নোয়াগাঁও, চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের ভুরাখালী, দাসনাগাঁও, হরিণাকান্দি, চিলাউড়া, সমধল, বেতাউকা ও গাদিয়ালা, রানীগঞ্জ ইউনিয়নের রৌয়াইল ও বাঘময়না, আশারকান্দি ইউনিয়নের বড়ফেচি, মিলিত, মিঠাভরাং, কালাম্বরপুর, ঐয়ারকোনা, ধাওরাই, আটঘর ও পাইলগাঁও ইউনিয়নের কাতিয়া, ফেচি, কসবা, রমাপতিপুর ও মশাজান, জগন্নাথপুর পৌর এলাকার আলখানাপার, হবিবনগরসহ ৩০ গ্রামের লোকজন পানিবন্দি হয়েছে। তলিয়ে গেছে গ্রামীণ রাস্তাঘাট। অনেকে উঁচু এলাকায় আত্মীয়বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

সিলেট : কয়েক দিনের টানা বর্ষণে ফুলে- ফেঁপে উঠেছে সুরমা। পানি উপচে পড়েছে নগরীর বিভিন্ন এলাকায়। এতে সুরমার আশপাশ এলাকায় দেখা দিয়েছে আকস্মিক বন্যা। শনিবার রাতে সুরমার পানি বিপদসীমার ১১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে গতকাল বিপদসীমার ১৫৭ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। এতে গোলাপগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। একই কারণে বিশ্বনাথ উপজেলারও নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার বন্যার্তরা আশ্রয় নিয়েছেন বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। অনেকেই আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গিয়ে উঠেছেন। সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন থেকে কিছু ত্রাণ মিললেও তা অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন বন্যার্ত লোকজন।

রোববার নগরীর মাছিমপুর, ছড়ারপার, সোবহানীঘাট, যতরপুর, উপশহর, কামালগড়, কালীঘাট, কাজীরবাজার, ঘাসিটুলাসহ বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। মাছিমপুর এলাকার শুঁটকি ব্যবসায়ী উসমান মিয়া জানান, ওই এলাকার বেশ কয়েকটি কলোনির লোকজন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। রোববার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কলোনির বিভিন্ন স্থানে কোমরপানি। লোকজন বসে আছেন। শিশুরা কেউ কেউ পানির মধ্যে খেলা করছে। নারীরা খাটের ওপর বসে আছেন।

মৌলভীবাজার: সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের হামরকোনা জামে মসজিদের পাশে কুশিয়ারা নদীর বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধের তিনটি স্থান ভেঙে আশপাশের ১২টি গ্রামে পানি ঢুকে ১০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রোববার স্থানীয় সাংসদ নেছার আহমদ এসব এলাকা পরিদর্শন করে পানিবন্দি মানুষের মধ্যে তিনশ' প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করেন।

খলিলপুর ইউপি চেয়ারম্যান অরবিন্দ পোদ্দার বাচ্চু জানান, কুশিয়ারা নদীর বাঁধের তিনটি ভাঙন দিয়ে দ্রুত পানি প্রবেশ করায় বাড়ছে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে নতুন নতুন এলাকা। পানিবন্দি মানুষগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়াসহ পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

হবিগঞ্জ (নবীগঞ্জ) : উপজেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কুশিয়ারা ডাইক রোববার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ভেঙে গেছে। জামারগাঁও রাধাপুর জামে মসজিদের কাছে ডাইকটি ভেঙে উপজেলার ৫০টি গ্রাম তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে তিনটি হাওরের কয়েক হাজার একর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। ডাইকটি ভেঙে যাওয়ায় হবিগঞ্জের চারটি উপজেলা- নবীগঞ্জ, বাহুবল, বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জের ভাটি এলাকা আক্রান্ত হবে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমানে নবীগঞ্জ উপজেলার কুশিয়ারা, বিজনা ও বরাক নদীর পানি বিপদসীমার ৫২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির সার্বিক অবনতি হয়েছে।

নেত্রকোনা : জেলার উব্ধাখালী, কংস ও ধনু নদীর পানি বাড়ায় প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। শনিবার ও গতকাল সদর, আটপাড়া, পূর্বধলা উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। কংস নদের পানি বিপদসীমার ১৬৫ সেন্টিমিটার ও উব্ধাখালীর পানি ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। জেলার ছয়টি ইউনিয়নে তিন শতাধিক গ্রামে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যাকবলিত দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও বারহাট্টা উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থকে ৫০ টন চাল ও দেড় হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন ডা. তাজুল ইসলাম জানান, বর্ন্যাতদের চিকিৎসাসেবা দিতে প্রয়োজনীয় ওষুধসহ মেডিকেল টিম কাজ করছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেপের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য সহকারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ) : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অবিরাম বর্ষণে মিঠামইনের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উপজেলার ঘাগড়া, চমকপুর খলাপাড়ায় অন্তত ৫০টি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। পানির প্রবল চাপে চমকপুর বেড়িবাঁধের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। ঘোড়াউত্রা ও মেঘনার পানির তোড়ে গোপদীঘি ও হেমন্তগঞ্জের নদীতীরবর্তী পাউবোর বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকছে।

মন্তব্য


অন্যান্য