সিলেট

'চুলায় পানি, তিন দিনে একবার ভাত খাইছি'

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

'চুলায় পানি, তিন দিনে একবার ভাত খাইছি'

সুনামগঞ্জ শহরতলির গৌরারং ইউনিয়নের ইনাতনগর গ্রামেই কমপক্ষে ৬০টি পরিবারের ঘরে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি— সমকাল

  পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ

'তিন দিন ধইরা ঘরও পানি, তিন ছেলেমেয়ে লইয়া বিপদও পড়ছি। বড় মেয়ে লইয়া কোনান গিয়া উঠতাম। কোন লাখান ঘরও চৌকির ওপরে আছি। চুলায় পানি, তিন দিনে একবার ভাত খাইছি। বুধবার গাঁওয়ের একজনে সামান্য ভাত দিছলা, বাইচ্চাইনতেরে খাওয়াইছি। গতকালকে (বৃহস্পতিবার) দুইটা কেক, একটা ব্রেড আইন্না খাওয়াইছি, আমরাও সামান্য খাইছি। আজকে (শুক্রবার) জাহানারা বেগমর (স্থানীয় ইউপি সদস্য) ফোনে অনেকবার ফোন দিয়াও তাইনরে ধরতাম পারছি না। ফুল মিয়া চেয়ারম্যান সাবরে (ইউপি চেয়ারম্যান) জানাইছলাম, তাইন কইছন দেখরাম আমি।'

সুনামগঞ্জ শহরতলির ইনাতনগর গ্রামের দিনমজুর রফিক উদ্দিনের স্ত্রী শেফালী বেগম এভাবেই বর্ণনা করছিলেন বন্যার দুর্ভোগের কথা। একই গ্রামের আবুল কালামের স্ত্রী ইয়ারুন্নেছার ঘরেও দু'দিন ধরে হাঁটুপানি। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তারাও ঘরের ভেতর চৌকি পেতে আছেন। কেবল ইয়ারুন ও শেফালী বেগম নন, ইনাতনগর গ্রামেই কমপক্ষে ৬০টি পরিবারের ঘরে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি। এর মধ্যে অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। যারা কোথাও যেতে পারেননি, তাদের দিন কাটছে মানবেতরভাবে।

স্থানীয় গোরারং ইউনিয়ন পরিষদের  চেয়ারম্যান ফুল মিয়া জানান, তার ইউনিয়নের কমপক্ষে পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি। উপজেলা পরিষদ থেকে মাত্র ২০০ শুকনো খাবার প্যাকেট এবং আড়াই টন চাল পেয়েছেন। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরও কিছু সহায়তা দিচ্ছেন। এ ত্রাণ খুবই সামান্য, তাদের আরও বেশি সহায়তা প্রয়োজন।

কেবল গৌরারং ইউনিয়ন নয়, সুনামগঞ্জ পৌরসভারও কমপক্ষে ২০০০ পরিবারের ঘরে পানি উঠেছে বলে জানালেন পৌর মেয়র নাদের বখ্‌ত। তিনি জানান, কোনো সহায়তা না পাওয়ায় বন্যার্তদের জন্য এখনও কিছুই করা যায়নি।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন নাহার রুমা শুক্রবার মোহনপুর ইউনিয়নের বন্যার্তদের ত্রাণ দিয়েছেন। রোববার রঙ্গারচর ইউনিয়নের বন্যার্তদের ত্রাণ দেওয়া হবে। ইউএনও জানান, সদর উপজেলায় শুক্রবার পানি কিছুটা কমেছে। ঘরে পানি রয়েছে এমন সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি হবে না।

এদিকে বন্যাক্রান্ত হয়েছে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর উপজেলার অধিকাংশ এলাকা।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি। শুক্রবার সকাল থেকে বেশিরভাগ ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমেছে। বন্যা পরিস্থিতিরও কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। শুক্রবার উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের শ্রীধরপুর গুচ্ছগ্রাম, কলাইয়া, সাতগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়, পলাশ ইউনিয়নের ধরেরপাড়, পিয়ারীনগর, প্রত্যয়নগরে চিড়া, মুড়ি ও চিনি বিতরণ করা হয়েছে।

বিশ্বম্ভরপুর ইউএনও সমীর বিশ্বাস বলেন, বন্যায় উপজেলার দক্ষিণ বাদাঘাট, ফতেপুর ও পলাশ ইউনিয়নের বেশি ক্ষতি হয়েছে। তিন ইউনিয়নের ছয়টি আশ্রয়কেন্দ্রে এবং গ্রামের ঘরে ঘরে শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। দোয়ারাবাজার উপজেলায় সুরমা, সদর ও লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের একাংশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দোয়ারাবাজারের ইউএনও সোনিয়া সুলতানা জানান, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার সাড়ে চার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যাকবলিত সুরমা ইউনিয়নের ভুজনা, উমরপুর, কালিকাপুর, কদমতলী, নুরপুর, সোনাপুর, দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়নের মাছিমপুর গ্রামের বন্যাকবলিতদের মধ্যে নৌকায় শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

এদিকে জামালগঞ্জ ও তাহিরপুরের নিম্নাঞ্চলের ৩০ হাজারেরও বেশি পরিবারের ঘরে পানি উঠেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা।

জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াংকা পাল বলেন, জামালগঞ্জ উপজেলায় প্রায় চার হাজার ৩০০ জন বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে এখনও পানিবন্দি রয়েছেন। শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন কর্মকর্তা ফরিদুল হক জানিয়েছেন, পাঁচ উপজেলার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৩০০ টন চাল, দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা, তিন হাজার ৭৬৫ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

মন্তব্য


অন্যান্য