সিলেট

কুলাউড়ায় কালভার্ট ভেঙে ট্রেন খাদে :নিহত ৪

সংস্কারের অভাবেই রেলে মৃত্যুফাঁদ

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৯ | আপডেট : ২৫ জুন ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

সংস্কারের অভাবেই রেলে মৃত্যুফাঁদ

রোববার রাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় দুর্ঘটনাকবলিত উপবন এক্সপ্রেসের বগি- সমকাল

  চয়ন চৌধুরী, সিলেট নুরুল ইসলাম, মৌলভীবাজার

আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত রেললাইন ডুয়েলগেজ নির্মাণ করা হবে চীনের ঋণে। সূত্রের খবর, নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হবে, তাই শত বছরের পুরনো রেলপথের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ থেমে রয়েছে। সেতুগুলো সংস্কার করা হয়নি। এ কারণেই মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার বড়ছড়া সেতুতে গত রোববার মধ্যরাতে দুর্ঘটনায় পড়ে 'উপবন এক্সপ্রেস'। নিহত হয়েছেন অন্তত চার যাত্রী। আহত হয়েছেন শতাধিক।

রেলের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে, সড়কপথে ঢাকা-সিলেট যোগাযোগ বিঘ্নিত হওয়ায় যাত্রীর চাপ বেড়েছে ট্রেনে। অতিরিক্ত যাত্রীর কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম। গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে তিনি এ কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেলের ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলো মেরামতের নির্দেশ দিয়েছেন।

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে দুটি পৃথক কমিটি করেছে রেল মন্ত্রণালয়। আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে কমিটি। কমিটির সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানিয়েছেন, তদন্তের পরই বলা যাবে কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। রেলপথ ও সেতু জরাজীর্ণ ছিল কি-না তাও খতিয়ে দেখা হবে।

এদিকে রাত সা?ড়ে ৯টায় চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্স?প্রেস ট্রেন সি?লেট ছে?ড়ে? যায়। এর মাধ্যমে প্রায় ২২ ঘণ্টা পর সি?লে?টের সঙ্গে ট্রেন যোগা?যোগ স্বাভা?বিক হয়। এর আগে সংস্কার কাজ শেষে রাত পৌনে ৮টা থেকে দুর্ঘটনাকবলিত জায়গায় পরীক্ষামূলক ট্রেন চালানো হয় বলে জানিয়েছেন কুলাউড়া স্টেশন মাস্টার মাযহারুল ইসলাম। তবে কুলাউড়ায় রেলওয়ের এএসও মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, খালে পড়া বগিগুলো এখনও সেখানে রয়েছে। সেগুলো পরে সরানো হবে। আপাতত রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করা হয়েছে।

রেলের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে জানিয়েছেন, নতুন রেললাইন নির্মাণের কাজ শুরুর অপেক্ষায় থাকায় পুরনো রেলপথ সংস্কারে মনোযোগ ছিল না। প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প গত এপ্রিলে একনেকে অনুমোদন পায়। ১৯১৫ সালে সিলেট-কুলাউড়া রেল সেকশন নির্মাণ করা হয়। শতবর্ষী এ রেলপথে স্লিপার, ব্যালাস্ট (পাথর) সঠিক মানে নেই। অনেক অংশে পাথরই নেই। ফিসপ্লেট নেই অনেক জায়গায়। এ কারণে রেলপথ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। একই অবস্থা সেতু ও কালভার্টগুলোর। রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, জরাজীর্ণ রেলপথ ও সেতুগুলো সংস্কার করা হবে।

'উপবন এক্সপ্রেস' যে বড়ছড়া সেতুতে দুর্ঘটনায় পতিত হয়, তার অদূরে মনু রেলসেতুতে ভাঙাচোরা স্লিপার ঠিক রাখতে বাঁশের ব্যবহার করা হয় ২০১৬ সালের শেষ দিকে। এতে সমালোচনা হলে, তৎকালীন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক দাবি করেছিলেন- বাঁশের ব্যবহার ভুল নয়।

রোববার মধ্যরাতের দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে কুলাউড়া স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, সিলেট স্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে 'উপবন এক্সপ্রেস' বিপরীত দিক থেকে আসা 'কালনী এক্সপ্রেসের' সঙ্গে ক্রসিংয়ের জন্য মোগলাবাজার স্টেশনে আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে। দেরি পোষাতে দ্রুতগতিতে চলছিল 'উপবন এক্সপ্রেস'। মাইজগাঁও স্টেশনে নির্ধারিত বিরতির পর বরমচাল স্টেশন পেরিয়ে বড়ছড়া সেতুতে দুর্ঘটনায় পড়ে। অতিরিক্ত যাত্রীবাহী ট্রেনটির পেছনের ছয়টি বগির একটি সেতু ভেঙে ছিটকে খালে পড়ে যায়। এই বগির টানে দু'পাশে আর দুটি করে চারটি বগি উল্টে লাইনচ্যুত হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এ সেতুগুলোতে দুর্ঘটনা এড়াতে চালকদের ধীরে চলতে নির্দেশ দেওয়া আছে। এই সেতুগুলো হলো- হবিগঞ্জের শাহজীবাজারে ৭৩ নম্বর সেতু, লস্করপুরের ১০২ নম্বর সেতু, শায়েস্তাগঞ্জের ১০৫ নম্বর সেতু, বাহুবলের রশিদপুরে ১১৪ নম্বর সেতু এবং মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের ভানুগাছে ১৮৩ নম্বর সেতু। যে সেতুর ওপরে উপবন এক্সপ্রেস দুর্ঘটনায় পড়েছে, তাও ঝুঁকিপূর্ণ তালিকাভুক্ত বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের এ কর্মকর্তা।

দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত এক প্রকৌশলী সমকালকে বলেন, ট্রেনের পেছনের দিকের ৬ নম্বর বগিটি লাইনচ্যুত হতেই সংযোগস্থলের হুকগুলো ভেঙে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত ওজনে সেতু বেঁকে গেছে।

শ্রীমঙ্গল ও সাতগাঁও রেলস্টেশনের মাঝখানে সেতুর পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল টানা ২২ ঘণ্টা সিলেটের সঙ্গে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ ছিল। চলতি বছরের ৫ এপ্রিল রাতে মাইজগাঁও স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় মালবাহী ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়। সেদিন চার ঘণ্টার মতো সিলেটের সঙ্গে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ ছিল।

ট্রেনটির যাত্রী আবদুল খালেক জানিয়েছেন, উপচেপড়া ভিড় ছিল প্রতিটি বগিতে। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পান। বগি উল্টে যায়। ট্রেনের জানালা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন নিচের ছড়ার কাদাপানিতে। দেখতে পান একটি বগি পানিতে পড়ে গেছে। দু'পাশের আরও দুটি উল্টে গেছে। উল্টে যাওয়া বগিগুলো থেকে যাত্রীরা লাফিয়ে পড়ছেন। যে বগিটি খালে ছিটকে পড়েছে তার যাত্রীরা বেশি হতাহত হয়েছেন।

দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন সিলেটের দক্ষিণ সুরমার আব্দূল্লাহপুর গ্রামের আব্দুল বারীর মেয়ে ফাহমিদা ইয়াসমিন ইভা (২০), বাগেরহাটের সানজিদা আক্তার (২০), কুলাউড়া পৌর এলাকার ডিটিটিসি এলাকার মনোয়ারা পারভীন (৪৫) এবং হবিগঞ্জের বাহুবলের ধবলবহরের নুর হোসেনের ছেলে কাওসার আহমদ (২৬)। ফাহমিদা ও সানজিদা সিলেট নার্সিং ইনস্টিটিউটের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তারা প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায় যাচ্ছিলেন।

নিহতদের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে পরিবারের কাছে। নিহতদের দাফনের জন্য প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কুলাউড়া জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মালেক জানিয়েছেন, চার যাত্রী নিহতের ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হবে।

আহতদের সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতাল, কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বেসরকারি কুলাউড়ার ব্রাহ্মণবাজার মুসলিম এইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহত কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের ক্যাজুয়ালটি ইউনিটের কো-অর্ডিনেটর ডা. শ্যামল বর্মণ সমকালকে জানিয়েছেন, ২৮ জনকে ভর্তি করা হয়েছিল। সাতজনকে চিকিৎসা দিয়ে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসাধীন ২১ জন শঙ্কামুক্ত। মাথা ও বুকে আঘাতপ্রাপ্ত কয়েকজনের পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে।

হতাহতদের খোঁজে সোমবার ভোর থেকে হাসপাতালে ভিড় জমে। দুর্ঘটনার পর অনেক যাত্রী মোবাইল ফোন হারিয়েছেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে আহাজারি করেন স্বজনরা।

বরমচাল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইছহাক চৌধুরী ইমরান জানিয়েছেন, রাত সাড়ে ১১টার দিকে 'উপবন এক্সপ্রেস' বরমচাল স্টেশন অতিক্রমের পরই বিকট শব্দ শোনা যায়। স্থানীয়রা যাত্রীদের উদ্ধারে অংশ নেন।

সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট রাতে উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। আলোকস্বল্পতায় বগিগুলোতে রাতে উদ্ধার কাজ বন্ধ রাখা হয়। সকালে ফের উদ্ধার কাজ শুরু হয়। সকাল ৯টার দিকে আখাউড়া থেকে উদ্ধারকারী রিলিফ ট্রেন এসে ছিটকে পড়া বগি উদ্ধার কাজ শুরু করে।

রেল সচিব মো. মোফাজ্জল হোসেন, অতিরিক্ত সচিব মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক কাজী রফিকুল আলমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গতকাল সোমবার সকালে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। দুর্ঘটনার পরপরই সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী, মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম, মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. শাহজালালসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

কুলাউড়া জংশনের মাস্টার আফসার উদ্দিন সমকালকে জানান, কুলাউড়া থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ট্রেন চলাচল করছে। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা উপবন এক্সপ্রেস দুপুর সাড়ে ১২টায় জয়ন্তিকা নামে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পারাবত কুলাউড়া থেকে ঢাকায় ফিরে গেছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম থেকে উদয়ন এসে পাহাড়িয়া হয়ে ফিরে গেছে।

রেলের মহাপরিচালক কাজী রফিকুল আলম জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পূর্বাঞ্চলের চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মিজানুর রহমানকে প্রধান করে গঠিত কমিটি তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেবে। পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবদুল জলিল, প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী মইনুল ইসলাম এবং প্রধান অপারেটিং তত্ত্বাবধায়ক সুজিত কুমার কমিটির সদস্য। এ ছাড়া বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মইনুল ইসলামকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি করেছে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল।

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শমশেরনগর ও ভানুগাছ স্টেশনের যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। আগাম টিকিট কাটা যাত্রীরা টাকা ফেরত পেলেও আটকা পড়েন।

ঢাকাগামী উপবন ট্রেনের যাত্রী আসাদ উল্ল্যা, নুরুল মোহাইমীন, রফিকুর রহমান ও ফণীভূষণ দাস বলেন, তাদের জরুরি কাজে ঢাকা যাওয়ার কথা। সড়কপথ ও রেলপথে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বেশি টাকা খরচ করে সড়কপথে ভেঙে ভেঙে যেতে হচ্ছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ডিও :ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ভেঙে পড়া শাহবাজপুর সেতু দ্রুত মেরামত করতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়কে ডিও লেটার (আধা সরকারি পত্র) দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। ঢাকা-সিলেট রুটে আরেকটি ট্রেন চালু করতে তিনি ডিও দেন রেল মন্ত্রণালয়কে।

মন্তব্য


অন্যান্য