সিলেট

'ও ফাম্মি তুই উঠি আয়'

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

'ও ফাম্মি তুই উঠি আয়'

ফাহমিদা ইয়াসমিন ইভা

  ফয়সল আহমদ বাবলু, সিলেট

'ও ফাম্মি তুই উঠি আয়, তোর বান্ধবী অখল আইছন। উঠিয়া তারারে একটু চা, ফানি দে।' ঘরের ভেতর থেকে বার বার এ কথাগুলোই ভেসে আসছে। ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত ফাহমিদা ইয়াসমীন ইভার মা রহিমা খানম মেয়েকে হারিয়ে এভাবেই বিলাপ করছেন। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই  কারও।

গত রোববার রাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনায় ৪ জন নিহত হন। এর মধ্যে ছিলেন দক্ষিণ সুরমার জালালপুর ইউনিয়নের আবদুল্লাপুর গ্রামের আব্দুল বারীর কন্যা ফাহমিদা ইয়াসমীন ইভা। সিলেট নার্সিং কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তিনি।

সিলেট নগরী থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার থানার জালালপুর ইউনিয়নের আবদুল্লাপুর গ্রাম। আঁকাবাঁকা পথ বেয়েই নিজ জালালপুর (উত্তর) জামে মসজিদ ফেলে ফাহমিদার বাড়ি। ফাহমিদার বাড়ি কোন দিকে জানতে চাইলে অনেকেই দেখিয়ে দেন তার বাড়ি যাওয়ার সড়কটি। দুপুরে গিয়ে দেখা যায় বাড়িভর্তি শত শত মানুষ। বাড়ির উঠানে চলছে রান্নাবান্নার কাজ।

ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে কান্নার শব্দ। মা রহিমা খানম চিৎকার করে কান্নাকাটি করছেন। তার কান্না শুনে বাড়িভর্তি অনেক লোকের চোখেও জল আসে। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিন নম্বর ছিলেন ফাহমিদা। বড় বোন ফাহমিদাকে হারিয়ে ছোট দুই ভাই অনেকটা নির্বাক হয়ে পড়েছে।

ছোট ভাই সামাদ ও মাহিমের সঙ্গে আলাপ করলে তারা জানায়, বাড়ি এলে ফাহমিদা তাদের জন্য চকলেট নিয়ে আসতেন। ঈদের সময় তাদের জন্য নতুন জামাকাপড় তার বোন নিয়ে আসতেন। বাবা টাকা দিলে সেই টাকা তেমন খরচ করতেন না তাদের বোন। এই কথা বলেই দুচোখ দিয়ে অশ্রু বের হয়ে আসে তাদের। দুই ভাই কেঁদে কেঁদে ঘরের ভেতরে চলে যায়।

বাড়িতে থাকা লোকজন চিনিয়ে দিলেন ফাহমিদার বাবা আব্দুল বারীকে। এদিক-ওদিক পায়চারী করছিলেন তিনি। তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে বসার অনুরোধ করেন। এরপর আর কোনো কথাই বলতে পারেননি আব্দুল বারী। শোকে অনেকটা পাথর হয়ে গেছেন তিনি।

তার পাশেই বসা ছিলেন গ্রামের আরেক ব্যক্তি আনোয়ার হোসেন। তিনি জানান, এই পরিবারটি দরিদ্র হলেও লেখাপড়ায় তারা অনেকটা এগিয়ে। পরিবারের সবাই লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত। বড় মেয়ে একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মেঝ ছেলে সামাদ সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিউটে লেখাপড়া করে। ছোট ছেলে স্থানীয় বৈরাগীবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ফাহমিদাও লেখাপড়ায় অনেক ভালো ছিলেন। আর বড় ছেলে বাবার সঙ্গে সংসারের হাল ধরেছেন। এলাকায় একটি ভালো পরিবার হিসেবে সবাই তাদের চেনে।

ফাহমিদার বান্ধবী কবিতা বেগম বলেন, 'ফাহমিদা হোস্টেলে আমার সঙ্গেই থাকত। লেখাপড়ায় সে খুব ভালো ছিল। সেবিকা হয়ে মানুষের সেবা করতে চেয়েছিল ফাহমিদা। একই সঙ্গে তার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত।' তিনি জানান, সে স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।

তার আরেক বান্ধবী সবিতা জানান, শুনেছি সে কমলগঞ্জে যেতে চেয়েছিল। সেখানে তার আরেক বান্ধবীর বাড়ি। দু'দিন আগেও তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছিল।

তার বড় ভাই আব্দুল হামিদ বলেন, শুনেছি সে কমলগঞ্জে যাবে। কী কারণে যেতে চেয়েছিল সেটি আমার জানা নেই।

এ ব্যাপারে সিলেট নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ ফয়সল আহমদ চৌধুরী বলেন, 'পারিবারিক কাজের কথা বলে ফাহমিদা রোববার হোস্টেল থেকে ছুটি নিয়েছিল। সানজিদা নামের অপর শিক্ষার্থী হোস্টেলে থাকে না। সোমবার সকালে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তারা দু'জন নিহত হওয়ার খবর খবর পাই।'

সোমবার বাদ আসর নিজ জালালপুর দক্ষিণ মহল্লা মানিকপাশা শাহী ঈদগাহ মাঠে ফাহমিদা ইয়াসমীন ইভার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় শত শত মানুষ উপস্থিত হন। পরে বাড়ির পাশে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

মন্তব্য


অন্যান্য