সিলেট

কাব্য বার বার মাকে খুঁজছে

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৯ | আপডেট : ১৪ মে ২০১৯

কাব্য বার বার মাকে খুঁজছে

ডা. প্রিয়াংকা তালুকদার শান্তার সঙ্গে তার একমাত্র সন্তান কাব্য।

  পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ

সিলেট নগরীর পাঠানটুলা এলাকায় স্বামীর বাসা থেকে পার্কভিউ মেডিকেল কলেজের প্রভাষক ডা. প্রিয়াংকা তালুকদার শান্তার (২৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এদিকে তার ৩ বছরের শিশু কাব্য তালুকদার রোববার রাতে কয়েকবার মাকে খুঁজেছে। তাকে বোঝানো হচ্ছে- মা হাসপাতালে ডিউটিতে গেছেন।

প্রিয়াংকার মা শিপ্রা চৌধুরী এখনও মেয়ের মৃত্যু শোকে পাথর হয়ে আছেন। সোমবার থেকে কিছুই খাননি। কয়েকবার মুর্ছাও গেছেন। কারো সঙ্গে কথাও বলছেন না। প্রিয়াংকার বাবা ঋষিকেশ তালুকদার হাউমাউ করে কাঁদছেন সারাদিন।

সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা ঋষিকেশ তালুকদার ও স্কুল শিক্ষিকা শিপ্রা চৌধুরীর এক ছেলে ও এক মেয়ে। এই দুই সন্ত্মানকে নিয়েই বড় স্বপ্ন দেখতেন তারা। শিশুকাল থেকেই সাধ্য অনুযায়ী ভাল পড়াশুনা করানোর জন্য সব কিছুই করেছেন তারা। প্রিয়াংকা সুনামগঞ্জ শহরে স্কুলে পড়াশুনা শেষে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে সিলেটের রাগিব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছে। তারপর সিলেটের পার্কভিউ মেডিকেল কলেজের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন ডা. প্রিয়াংকা তালুকদার শান্ত্মা। তার মৃত্যুতে পরিবারের সবাই এখন শোকে পাথর।

প্রিয়াংকার বাবা ঋষিকেশ তালুকদার কাঁদতে কাঁদতে বললেন, 'মেয়েটি আমার ছাপা স্বভাবের ছিল। নিজে কষ্ট করতো, অন্য কাউকে বুঝতে দিতো না। তারা (শ্বশুর-শ্বাশুরি) আমার মেয়েকে শান্ত্মি দেয়নি। চাকুরি করতে বাধা দিতো। বিয়ের ৩ বছর পরেই বাড়ি'র ২ জন কাজের মহিলার একজনকে বিদায় করে দেওয়া হয়। বলা হতো, বাড়ির বউকেই পুরো বাড়ি প্রতিদিন সকালে মুছতে হবে। সকালের খাবার তৈরি করতে হবে। এরপর চাকুরিতে যেতে হবে। প্রথম প্রথম মেয়ের জামাই দিবাকর প্রতিবাদ করলেও একপর্যায়ে সে বাবা-মা'র সুরেই কথা বলতো। ইদানিং বাড়িতে মদ্যপান করেও ফিরতো দিবাকর। আমরা গিয়েও দিবাকরকে বুঝিয়েছি। সে নেশা ছাড়েনি।'

ঋষিকেশ তালুকদার বলেন, 'আমি নিশ্চিত তারা (শ্বশুর, শ্বাশুরি ও জামাই) আমার মেয়েটিকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখেছে, না হয় তাকে মরতে বাধ্য করেছে। মেয়েটির মৃত্যুর পর আমার আত্মীয়-স্বজন ওই বাড়িতে গিয়ে পুলিশকে ফোন দিয়ে জানিয়েছে। আমাকেও ফোন করেছে, কিন্তু তারা কাউকে জানায়নি। দিবাকরের বোনের বাসা তাদের (দিবাকরদের) বাসার পাশেই। কিন্তু প্রিয়াংকার মৃত্যুর পর সে একবারও ওই বাড়িতে যায়নি। হাসপাতালেও যায়নি। তার স্বামী ডা. বিচিত্র দাসও যাননি। তাদের এই ব্যবহারে মনে হচ্ছে, তারা ঘটনা আগে থেকেই জানতো।'

তিনি বলেন, ''প্রিয়াংকার ৩ বছরের শিশু কাব্য বার বার তার মা'কে খুঁজছে। সোমবার আবার মাকে খুঁজলে, আবারও সকলেই বলেছেন, মা হাসপাতালে ডিউটিতে আছেন। এভাবে কতবার বুঝানো যাবে। এখন ওকে নিয়েই যত কষ্ট। পুলিশ আমার এই নাতিকে আমার কাছে তুলে দেবার সময় বলেছে, ওর বাবা জেলে, মা মারা গেছে, এখন দাদু-দিদিমা ছাড়া কার কাছে থাকবে। তার মুখের দিকে তাকালেই আমার কষ্ট আরো বেড়ে যায়।''

এর আগে রোববার সকালে সিলেট নগরীর পাঠানটুলা এলাকায় নিজ বাড়িতে ডা. প্রিয়াংকার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রিয়াংকার বাবা ঋষিকেশ তালুকদার বাদী হয়ে সিলেটের জালালাবাদ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তার স্বামী দিবাকর দেব, শ্বশুর সুভাস দেব ও শ্বাশুরি রত্না দাসকে রোববারই গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে ৭ দিনের রিমান্ড চায়। আদালত সোমবার এদের ৩ জনকেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মন্তব্য


অন্যান্য