খেলা

রোডস যেন নিঃসঙ্গ শেরপা

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোডস যেন নিঃসঙ্গ শেরপা

ছবি: ফাইল

  ক্রীড়া প্রতিবেদক

সোমবার দুপুরে স্টিভ রোডস বিসিবি থেকে বের হচ্ছিলেন বিষণ্ণ চেহারা নিয়ে। সদা হাসিখুশি এ মানুষটিকে এমন করুণ মুখে আগে কখনও দেখা যায়নি। 'হায়, হ্যালো'র জবাবটাও ঠিকমতো দিতে পারছিলেন না। উপস্থিত সাংবাদিক, বিসিবি স্টাফ কারও চোখই এড়ায়নি বিষয়টি। যদিও কেউই তখন বুঝতে পারেনি কী ভাংচূর হচ্ছে রোডসের হৃদয়ে।

ভরা বর্ষায় পদ্মা-যমুনার ভাঙনের চেয়েও সে ভাঙন ছিল প্রবল। ইংল্যান্ড থেকে দলের সঙ্গে ঢাকায় ডেকে এনে চাকরি থেকে পত্রপাঠ বিদায় করে দেওয়া হলো তাকে। এর লজ্জা আর অপমানের গ্লানিতে ভেতরে ভেতরে কুকরে যেতে দেখা গেছে এ ইংলিশ কোচকে। এর পর থেকেই ঘরবন্দি হলেন তিনি। রোডস যেন নিঃসঙ্গ শেরপা। অহমে কতটা আঘাত লাগলে একজন পেশাদার কোচও নিজেকে আড়াল করে রাখেন, তা বুঝতে মনোবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন হয় না, স্টিভ রোডসের খবর নিলেই বোঝা যায়।

মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম থেকে নিজের আবাসস্থলে ফেরার সেদিনের সেই পথটুকু কি রোডসের কাছে হাজার মাইলের দূরত্ব মনে হয়েছিল? শ্রীলংকা সফর নিয়ে পরিকল্পনা করতে ইংল্যান্ড থেকে ঢাকায় ফেরার পরদিন জানলেন চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার খবর। কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই এভাবে চাকরি হারানো মাথায় বাজ পড়ার মতোই। পেশাদার কোচ হলেও বিসিবির এ আচরণে হতবাক হয়ে সোমবার সেই যে ঘরে দরজা দিলেন রোডস, এরপর বাইরে বের হননি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লজ্জায় পরিচিতজনের সঙ্গে কথা বলা বা দেখা করার সাহসটাও হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। একান্ত প্রয়োজনীয় কাজগুলো ফোনে ফোনে সারছেন।

অথচ বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী এবং মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস বলেছিলেন, 'দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় জাতীয় দলের প্রধান কোচের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে রোডসকে। সাধারণত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা হলে কোচ পদত্যাগপত্র জমা দিতেন। মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতেন। এভাবে ঘরের ভেতরে লুকিয়ে থাকতে হতো না তাকে। মিডিয়ায় কথা বলতে পছন্দ করা কোচ চাকরি হারানোর পর কথা বলছেন না। ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা কম হয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বার্তা দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকদের পাঠানো বার্তা দেখেও কোনোরকম উত্তর দেননি। সাংবাদিকরা শেষ পর্যন্ত বিসিবির মিডিয়া ম্যানেজার রাবীদ ইমামের মাধ্যমে রোডসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে, যে উত্তর দিয়েছেন তা হলো- 'কী বলব আমি। এ পরিস্থিতিতে কী বলতে পারি। ওরা যা জানতে চাইবে, সেটা তো বলতে পারব না।'

বিসিবির কাছ থেকে পাওনা বুঝে নিতে ঢাকায় রয়ে গেছেন রোডস। নিজামউদ্দিন চৌধুরী মঙ্গলবার মিডিয়াকে বলেছেন, হিসাব বুঝিয়ে দেওয়ার পর সদ্য সাবেক হওয়া এ কোচ ইংল্যান্ডে ফিরে যাবেন। তাকে আর বিসিবিতে আসার প্রয়োজন হবে না। বিতর্ক চেপে দিতে মিডিয়া থেকে দূরে রাখতে এটা একটা ভালো কৌশল হতে পারে। তবে গতকাল বিসিবিতে জোর গুঞ্জন ছিল, আজ দেশে ফেরার বিমান ধরবেন রোডস। চুপেচাপে ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে পারলেই এই ইংলিশ কোচের জন্য মঙ্গল। কারণ তারও তো একটা সামাজিক জীবন রয়েছে। আর কোচিং তো তার পেশা। চাকরিচ্যুত হওয়ার খবর নেতিচাকভাবে না ছড়ালেই মঙ্গল তার জন্য।

চন্ডিকা হাথুরুসিংহে চলে যাওয়ার পর গত বছর জুনে দুই বছরের জন্য নিয়োগ পান রোডস। যে উদ্দেশ্য নিয়ে একটি দেশের প্রধান কোচ হয়েছিলেন, তাতে দারুণ সফল তিনি। তার ১৩ মাসের দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ ৩০টি ওয়ানডে খেলে জিতেছে ১৭টি ম্যাচ। ছয়টি টি২০ খেলে তিনটিতে জিতেছে। আট টেস্টের তিনটিতে জয়। দুটি বহুজাতিক টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলে একটিতে চ্যাম্পিয়ন। পাকিস্তান এবং শ্রীলংকার মতো দলকে হারিয়ে এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলে টাইগাররা। বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত তিন জাতির ওয়ানডে টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস গড়ে। গত দুই দশকে যা হয়নি সেই অধরা সাফল্য এসেছে রোডসের সময়ে।

এই রেকর্ড অর্জনের পুরস্কার হিসেবে কোচ বিসিবির কাছ থেকে পেলেন বরখাস্তের চিঠি। দায়িত্ব নিয়েই এই ইংলিশ কোচের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর সফল হয়েছিলেন ওয়ানডে এবং টি২০ সিরিজ জিতে। হোম সিরিজেও উইন্ডিজকে হারায় বাংলাদেশ। রেকর্ড এবং পরিসংখ্যান বলছে, চন্ডিকা হাথুরুসিংহের চেয়েও রোডস বেশি সফল। এমনকি বিশ্বকাপেও। ২০১৫ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে নাকাল হয়ে অষ্টম হয় বাংলাদেশ। এবারও অষ্টম। তবে পার্থক্য হলো- বড় দলগুলোর সঙ্গে এবার দাপটের সঙ্গে ক্রিকেট খেলেছেন সাকিব আল হাসানরা। তবুও বিশ্বকাপের ব্যর্থতা দেখিয়ে বিদায় করে দেওয়া হলো কোচকে।

মন্তব্য


অন্যান্য