শিল্পমঞ্চ

'আবিদ আজাদ আমার দেখা একগুচ্ছ কবিতার জন্মগ্রহণ'

প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০১৯

'আবিদ আজাদ আমার দেখা একগুচ্ছ কবিতার জন্মগ্রহণ'

আবিদ আজাদ (জন্ম‎: ‎১৬ নভেম্বর, ১৯৫২—মৃত্যু‎: ‎২২ মার্চ, ২০০৫)

  কাজল শাহনেওয়াজ

কবি আবিদ আজাদের আজ (২২ মে) মৃত্যুদিন। যদিও ২০০৫ সালে তাঁর অন্তর্ধান হয়েছে, কিন্তু, আমার অন্তর্গত মন আজও বুঝে উঠতে পারেনি যে, আবিদ মারা গেছেন। কিছু কিছু মৃত্যুকে আমি কোনোদিনই মানতে পারবো না। তাঁর মৃত্যু আমাকে টোটাল স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

তারপর আবিদ আজাদকে নিয়ে লিখব বলে অনেকবার তৈরি হয়েছি, কিন্তু দেখা যাচ্ছে শেষ পর্যন্ত লিখি নাই। প্রতিজ্ঞা করে লিখতে বসছি, হয় নাই। অনেক রাত জেগে বসে থেকেছি, তারপরও লিখতে পারি নাই। কিন্তু আমারই তো লেখার কথা… সবার আগে!

কেন লিখি নাই? কেন লিখতে পারি নাই?

আবিদ আজাদ আমার দেখা একগুচ্ছ কবিতার জন্মগ্রহণ। তাকে দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার লিখতে হবে। সেই শৈশবে, আমি যখন এগারো ক্লাশে পড়ি, কবিতা পড়ি না, বিজ্ঞান পড়ি, ক্লাসিক সাহিত্য পড়ি, উপন্যাস পড়ি, ভ্রমণ পড়ি—তখন একদিন তাঁর সাথে দেখা হলো। তখন তার কতোইবা বয়স… ২৬! গৌর বর্ণ, অস্থির, চাপা স্বভাবী।

আশ্চর্য লাগল, এই ছোট্ট অংকটা করতে! একটা মানুষ কিভাবে আরেকটা মানুষের মাথার মধ্যে ঢুকে যেতে পারে?

কিশোরগঞ্জে এক রাতে তার বাসায় বসেছিলাম, সারারাত। বাসা থেকে মা’র কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই গেছিলাম, আড্ডা দিতে। এক সময় সবাই চলে গেল। আমি আর সে বসে থাকলাম। আমি একটা কাঠের হাতলঅলা চেয়ারে। অনেক রাতে তার অ্যাজমার অ্যাটাক হল। খুব শ্বাসকষ্ট। তখনতো এখনকার মতো ইনহেলার সৃষ্টি হয় নাই। তেমন কোনো কার্যকরি অষুধও ছিল না। আবিদ খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। একজন তরুন কবিকে ছটফট করতে দেখে আমারও খুব মায়া লাগল। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন: জানেন, কবিতাই আমাকে শ্বাসকষ্ট দিয়েছে!

তখনই তার কবিতা আমি পছন্দ করি। তার কবিতাই আমাকে কবিতা পড়ার আনন্দ দিয়েছে।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়কালীন দিনগুলিতে হুটহাট করে ঢাকা চলে আসতাম আড্ডা দিতে। কতো দুপুর আর রাত কেটেছে তার সাথে। কতো খাবার যে ভাগ করে খেয়েছি। কতো চায়ে চুমুক দিয়েছি, কতো পুরি ছিঁড়েছি, কতোবার যে তার প্রেসে মালিকের চেয়ারে বসে থেকেছি।

আজিমপুরের শিকসা বাজার থেকে প্রেস গেলো বেড়িবাঁধের কাছে, নবাবগঞ্জে। তখনো বেড়িবাঁধ হয় নাই। সারাদিন গমগম করে এলাকা, এতোই জমজমাট। আবিদ তখনো অবিবাহিত। দোতলায় বাসা, নিচ তলায় প্রেস। ঢুকতেই কম্পোজ সেকসন, ভিতরে ছোট্ট রুমে ডাবল ডিমাই ফ্ল্যাট মেশিন। ঢোকার দরজার পরেই আবিদ ভাইয়ের টেবিল। এই প্রেসেই আমাদের ঐতিহাসিক বইগুলি ছাপা হয়েছিল। প্রেসের নাম ‘শিল্পতরু’। একটা কবিতা পত্রিকা করেন, নাম ‘কবি’। এখানেই সবাই আসতো। আবদুল মান্নান সৈয়দ, মুস্তফা আনোয়ার, রিফাত চৌধুরী… আরো সব সব নাম।

তবে আমি আর রিফাত জমে গেলাম আবিদ ভাইয়ের সাথে। দুনিয়ার তাবৎ বিষয়ে আমার আর আবিদের উৎসাহ। আর রিফাত সব কান পেতে শোনে। তবে নিজেদের কবিতা নিয়ে আমরা কোনো কথা বলি না।

দুপুরের খাবার সময় দোতলায় উঠি। ছোট বোনটা আবিদকে পরিচর্যা করত। দোতলার ছাদটা একটু নিচু। মনে হতো, ঘরটাও ছোট বোনের মতো আবিদকে কাছাকাছি রেখেছে। একজনের খাবারই হয়ত ভাগ করে খাচ্ছি কোনো কোনো দিন। ডিসে ভাত নেবার চামচ নেই। হাত দিয়েই তুলে নিচ্ছি। তখন একদিন দেখলাম, ফর্সা হাতে আবিদের নখগুলি বড় হয়ে গেছে, সেখানে নীল রংয়ের ময়লা জমে আছে। সাদা ভাতের ভিতর দিয়ে সেই নীল রঙ দেখা দিচ্ছে। তাঁর কবিতার ভিতরের সেই সব বিস্ময়কর, অভাবিত চিত্রকল্পগুলির মতো।

আবিদকে নিয়ে ভাবলে আমারও এখন খুব শ্বাসকষ্ট হয়। আমার কোনো কোনো রাতে অ্যাজমা অ্যাটাক হয়। মনে হয়, ঘরগুলি আরো নিচা হৈলে ভালো হৈত। আমরা সবাই কাছাকাছি থাকতাম।

২০০৮ এ তাঁকে মনে করে একটা কবিতা লিখেছিলাম।

আবিদ আজাদ
~
আবিদ আজাদ আর আমার মাঝখানে
এখন একটা শাদা কাগজ
কাগজটার সামনে আবিদ ভাই তাঁর কবিতার মতই
স্পন্দিত আঙ্গুলগুলি বুলিয়ে যাচ্ছেন
আমি ওপাশ থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি।
হতে পারে তাঁর হাত কাফনের কাগজ ভাঁজ করছে
আর আমি খালি কলমগুলি ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি
সন্ধ্যা বেলায় বহুদিন পর রতন বাসায় এসেছিল লন্ডন থেকে বেড়াতে এসে
আমি বাসায় ছিলাম না
ওতো কত দিন পরে এসেও আমার দেখা পেল না
আবিদ আজাদের কবিতার বইগুলি নড়াচড়া করার সময়
চোখে ভাসে বইগুলি ছাপা হবার দৃশ্য
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রুফ দেখার ছলে কী গোপনেই না
কবি তার নতুন কবিতাগুলি আমাকে পড়িয়ে ফেলেছিলেন!
কিন্তু আমরা পরস্পরকে জানাইনি আসল কথাটা
হয়ত একটু আধটু চুল ছিঁড়তে দেখেছি
শ্বাসকষ্ট দেখেছি
কিন্তু আমিতো সারাক্ষণই আপনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম!
বলা হয়নি বলা হয়নি বলা হয়নি
আপনাকে আমার মনের কথাটি
তোমাকে আমার মনের কথাটি
তোকে আমার মনের কথাটি
কাফনের কাগজে দাগ কাটলে কি হবে
তোর সব কবিতাই আমার মনে মনে
তোর সব কবিতাই আমি যত্ন করে রাখি

মন্তব্য


অন্যান্য