সাহিত্য ও সংস্কৃতি

'রঙিলা বিয়ে'

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮

'রঙিলা বিয়ে'

  সমকাল প্রতিবেদক

বছরের এ সময়টায় দেশজুড়ে বিয়ের জমকালো আয়োজন শুরু হয়। চোখে পড়ে ঝলমলে আলোকসজ্জা। বর-কনের পরিবার আর আত্মীয়দের সময় কাটে নানা ব্যস্ততায়। এ দেশে বিয়ের বিচিত্র সব আয়োজন এখনও সেভাবে নির্দিষ্ট কোনো শপিংমল কিংবা বাজারে পাওয়া যায় না। ছুটতে হয় শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। আবার অনেকের মাঝে দেশের বাইরে থেকে পণ্য কিনে ব্যবহারের আগ্রহ এখনও আছে। যদিও এ দেশের পণ্য গুণেমানে কোনো দিক থেকেই অন্য দেশের চেয়ে পিছিয়ে নেই।

এ ধরনের সমস্যা দূর করার চিন্তা থেকেই হ্যাপি ইভেন্টস দৃক গ্যালারিতে দু'দিনব্যাপী বিয়েবিষয়ক উৎসব 'রঙিলা বিয়ে'র আয়োজন করেছে। শনিবার বিকেল ৪টায় এ উৎসবের উদ্বোধনীতে প্রধান অতিথি ছিলেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন ক্যানভাসের সম্পাদক কানিজ আলমাস খান।

উৎসবের উদ্বোধনীতে প্রধান অতিথি ছিলেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন ক্যানভাসের সম্পাদক কানিজ আলমাস খান— সমকাল

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুস্তাফিজ শফি বলেন, এ উদ্যোগ তরুণ সমাজকে নতুন ধরনের কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে সাহায্য করবে। একই ছাদের নিচে বিয়ের সব আয়োজন নিয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য আয়োজকদের সাধুবাদ জানাই।

কানিজ আলমাস খান বলেন, বিয়ে সবার জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বর্তমানে বিয়ের সময় বর-কনে নানা কাজের চাপে থাকে। তাই এ আনন্দ আয়োজন তারা কোনোভাবেই উপভোগ করতে পারেন না। সেই দিক থেকে ইভেন্ট অর্গানাইজাররা বিষয়টিকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।

উৎসবের প্রথম দিনে অতিথিরা— সমকাল

দৃক গ্যালারিতে একই ছাদের নিচে বিয়েবিষয়ক সব ধরনের পণ্য আয়োজন করা হয়েছে। দেশি কাপড়ে ঐতিহ্যবাহী নকশা এবং বর্তমান ধারার মিশেলে বিয়ের পোশাক নিয়ে উপস্থিত আছে সাফিয়া'স ব্রাইডাল এবং এ বছরের বিয়ের মেকআপের ধারা নিয়ে উপস্থিত আছে ডিভাইন বিউটি লাউঞ্জ। উজ্জ্বলা থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১০ বিউটিশিয়ান ১০ ধরনের বিয়ের সাজ নিয়ে কনে সাজিয়েছেন।

বিয়ের মতো আনন্দ আয়োজনের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য দিন দিন ওয়েডিং ফটোগ্রাফি এবং ভিডিওগ্রাফির চাহিদা বাড়ছে। এ ধরনের সেবা নিয়ে হাজির থাকবে রনি'স ফটোগ্রাফি। এ ছাড়াও রয়েছে দেশের জামদানি শিল্প, বিয়ের অলঙ্কার এবং বিশেষ খাবারের আয়োজন।


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

সমকাল লাইভে লেখক সুমন্ত আসলাম


আরও খবর

সাহিত্য ও সংস্কৃতি
সমকাল লাইভে লেখক সুমন্ত আসলাম

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

লেখক সুমন্ত আসলাম

  অনলাইন ডেস্ক

দেশের অন্যতম জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক সুমন্ত আসলাম। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা  প্রায় একশ'। উপন্যাস, কিশোর উপন্যাস,  থ্রিলার, রম্য- সবই রয়েছে তার বইয়ের তালিকায়। পেশায় সাংবাদিক তিনি। তবে পেশাগত পরিচয় ছাপিয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় লেখক হিসেবে ব্যাপক জনিপ্রিয় সুমন্ত আসলাম। 

তিনি গল্প-উপন্যাস লিখেন নিজের ঢঙে। এ কারণে তৈরি হয়েছে নিজস্ব পাঠকশ্রেণি। দৈনিক সমকালের সপ্তাহিক আয়োজন ‘সমকাল সন্ধ্যা’য় আজকে অতিথি হয়ে আসছেন এ লেখক। 

জুম্মাতুল বিদার উপস্থাপনায় এতে তিনি কথা বলবেন তার লেখা বই ও বইমেলা নিয়ে। কথা বলবেন তার ব্যক্তিগত নানা অভিজ্ঞতা ও সমসাময়িক বিষয়ে। দেবেন দর্শকদের প্রশ্নের উত্তরও। দর্শকরা ফেসবুকে কমেন্ট বক্সে প্রশ্ন করতে পারবেন প্রিয় এই লেখককে। 

সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে সমকালের ফেসবুক পেজ ও ওয়েবে সরাসরি সম্প্রচার হবে অনুষ্ঠানটি। 

পরের
খবর

আল মাহমুদকে শেষ শ্রদ্ধা


আরও খবর

সাহিত্য ও সংস্কৃতি
আল মাহমুদকে শেষ শ্রদ্ধা

প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ফাইল ছবি

  সমকাল প্রতিবেদক

বাংলা একাডেমি এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর বায়তুল মোকাররম মসজিদে নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়েছে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের।

শনিবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর মগবাজারের বাসভবন থেকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে নেওয়া হয় কবির মরদেহ। সেখানে এক নিরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্ব।

একাডেমির নজরুল মঞ্চে নির্মিত অস্থায়ী বেদীতে শুরুতেই বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। আরও শ্রদ্ধা জানান কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন প্রমুখ।

শ্রদ্ধাজ্ঞাপন শেষে হাবীবুল্লা­াহ সিরাজী বলেন, ৪৭-এর দেশভাগের পর বাংলা কবিতায় যারা নতুন স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন তাদের একজন আল মাহমুদ। তিনি বাংলা কবিতায় নতুন ধারা নির্মাণ করেছিলেন। ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অগ্রগণ্য কবিদের একজন। ‘সোনালী কাবিন’র মতোই তার কবিতা বাংলা কাব্যভুবনে সোনালী দিগন্ত।

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রসঙ্গ উলে­খ করে তিনি বলেন, জনগণ যখন কাউকে কবি হিসেবে মেনে নেন, রাষ্ট্রও তাকে কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, বাঙালিপনা এবং এর সঙ্গে যা কিছু মঙ্গলময় সেদিক থেকে কবি আল মাহমুদকে অবশ্যই স্মরণ করতে হবে। তৃণমূলে তার জন্ম, সেই তৃণমূলেই তিনি ফিরে যাবেন- এটাই আমার কাম্য। নগর জীবনেও তিনি কবিতার মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনকে তুলে এনেছেন। তিনি পরবর্তীতে প্রজন্মের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবেন।

বাংলা একাডেমি একাডেমি থেকে আল মাহমুদের মরদেহ নেওয়া হয় জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে। সেখানে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে-একাংশ), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিআইজে-একাংশ)।

এসময় বিএনপির পক্ষ থেকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আজম খান শ্রদ্ধা জানান কবির মরদেহে।

আরও শ্রদ্ধা জানান- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ, গীতিকবি গাজী মাজহারুল আনোয়ার, কবি আবদুল হাই সিকদার, কবি জাকির আবু জাফর, সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ প্রমুখ।

কবির ছেলে মীর মোহাম্মদ মনির বলেন, আব্বার ইচ্ছা ছিলো, শুক্রবারে যেন তার মৃত্যু হয়। তার সেই চাওয়টাই পূর্ণ হয়েছে। এ সময় তিনি
তার বাবার অজান্তে কোনও ভুল-ত্রুটি হলে তার জন্য ক্ষামাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানান।

এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিষয়ে সবসময় সোচ্চার ছিলেন আল মাহমুদ। নিজেদের স্বার্থেই আমরা তাকে বাঁচিয়ে রাখবো এবং বারবার তার কাছে ফিরে যাবো। এ সমাজ নিয়ে তার দেখা স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক- এটাই আমার প্রত্যাশা।

গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, দেশের সংস্কৃতি অঙ্গণে আল মাহমুদের অবস্থান চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। সৃজনশীল ব্যক্তিরা চলে যাননা, বেঁচে থাকেন সৃষ্টির মাধ্যমে।

শওকত মাহমুদ বলেন, ‘গণকণ্ঠ’-এ সাংবাদিকতা করার সময় নীপিড়িত মানুষের জন্য তার লেখনী ছিলো সোচ্চার।

প্রেস ক্লাবে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে কবি আল মাহমুদের মরদেহ নেওয়া হয় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে। সেখানে তার নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়।

রোববার বাদ জোহর জানাজা শেষে কবির মরদেহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মোরাইল গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।

কবিতার ছন্দে ধারণ করেছিলেন ভাটি বাংলার জনজীবন। আধুনিক ভাষা কাঠামোর ভেতরে আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ঘটিয়ে আল মাহমুদ হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি।

‘লোক লোকান্তরে’, ‘কালের কলস’ আর ‘সোনালী কাবিন’-এর কবি আল মাহমুদ শুক্রবার রাত ১১টার দিেক রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়েসহ বহু গুণগ্রাহী ও ভক্ত রেখে গেছেন।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে আল মাহমুদকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ইবনে সিনা হাসপাতালের ভর্তি করা হয়। ওইদিন রাত ৪টার দিকে চিকিৎসকেরা তাকে হাসপাতালেরে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করেন।

শুক্রবার রাতে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সেই অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

কবির পারিবারিক বন্ধু কবি আবিদ আজম জানান, আল মাহমুদ নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। তিনি ইবনে সিনার অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল হাইয়ের তত্ত্বাবধানে ছিলেন।

আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার চিরায়ত জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তার কবিতায় উপজীব্য করে তোলেন। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তার অনন্য কীর্তি।

আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মৌড়াইলের মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুর রব মীর ও মা রৌশন আরা বেগম। আল মাহমুদের প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি কুমিল্লার দাউকান্দির সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে ১৯৫৪ সালে আল মাহমুদ ঢাকায় আসেন। শুরুতে তিনি কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘কাফেলা’য় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন। ১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী ‘কাফেলা’র চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ পত্রিকার সম্পাদক হন আল মাহমুদ। সম্পাদক থাকাকালীন সরকারের বিরুদ্ধে লেখার কারণে এক বছরের জন্য কারাবরণ করতে হয় তাকে।

মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহ-পরিচালক পদে নিয়োগ দেন। ১৯৯৩ সালে পরিচালক হিসেবে শিল্পকলা একাডেমি থেকে অবসর নেন বরেণ্য এই কবি।

১৮ বছর বয়স থেকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আল মাহমুদের কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ পত্রিকা এবং কলকাতায় কবি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’, ‘নতুন সাহিত্য’, ‘চতুষ্কোণ’, ‘ময়ূখ’ ও ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা ও কলকাতার পাঠকদের কাছে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় আল মাহমুদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’, যেটি তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস (১৯৬৬), সোনালি কাবিন (১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো (১৯৬৯)- এভাবে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৯৩ সালে বের হয় আল মাহমুদের প্রথম উপন্যাস ‘কবি ও কোলাহল’। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে - ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’, ‘আমি দূরগামী’, ‘দ্বিতীয় ভাঙন’, ‘উড়ালকাব্য’ ইত্যাদি। ‘কাবিলের বোন’, ‘উপমহাদেশ’, ‘ডাহুকি’, ‘আগুনের মেয়ে’, ‘চতুরঙ্গ’ ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। ‘পানকৌড়ির রক্ত’সহ বেশকিছু উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ লিখে গল্পেও কিংবদন্তী হয়ে ওঠেন তিনি। এছাড়া ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ ও ‘বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ’ তার উল্লেখযোগ্য আত্মজীবনীগ্রন্থ।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সৈয়দা নাদিরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ দম্পতির পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যা রয়েছে। বছর কয়েক আগে সৈয়দা নাদিরা বেগম মারা যান। এরপর থেকে তিনি মগবাজারের বাসায় নিভৃতেই বসবাস করতেন।

সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ আল মাহমুদ একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জয় বাংলা পুরস্কার, হুমায়ুন কবীর স্মৃতি পুরস্কার, জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার, কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্য পুরস্কার, কবি জসীম উদ্দিন পুরস্কার, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদকসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

থেমে গেল অবিনশ্বর কবিকণ্ঠ


আরও খবর

সাহিত্য ও সংস্কৃতি
থেমে গেল অবিনশ্বর কবিকণ্ঠ

প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

  সমকাল প্রতিবেদক

'কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সেতো ভেসে ওঠা ম্লান/ আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি/ পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ভাই-বোন/ আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি 'রাবেয়া রাবেয়া'/ আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট!' ... বাংলা ভাষার কবিতায় ভেজানো কপাটের পর কপাট আবিস্কারের অনন্য সাধারণ রূপকার, অভাবনীয় কল্পনাশক্তির অধিকারী, কবিতায় অবিনশ্বর কণ্ঠস্বর কবি আল মাহমুদ আর নেই।

শুক্রবার রাত ১১টায় রাজধানীর ধানমণ্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি পাঁচ পুত্র, তিন কন্যাসহ তার কবিতার অগণিত অনুরাগী রেখে গেছেন।

রাতে আল মাহমুদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে ইবনে সিনা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে, তাকে রাজধানীর ধানমণ্ডির এই হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়।

শুক্রবার রাতে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সে অবস্থায় তিনি রাত ১১টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আল মাহমুদ নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। তিনি অধ্যাপক  ডা. মো. আবদুল হাইয়ের তত্ত্বাবধানে ছিলেন।

আল মাহমুদ পঞ্চাশ দশকে বাংলা ভাষায় কবিতা লিখতে শুরু করেন। এক দশকের কাব্যপ্রচেষ্টার ফসল 'লোক লোকান্তর' [১৯৬৩] প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি কাব্য অনুরাগীদের দৃষ্টিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন। কবিতায় তার ঋজু ভঙ্গি, ছন্দ কুশলতা, কল্পনা বিস্তার, নিপুণ বিন্যাস কৌশল তাকে রবীন্দ্রউত্তর ত্রিশ দশকের কবিদের সারি থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে। এরপর একের পর এক কাব্য- বিশেষত 'কালের কলস' [১৯৬৩] ও 'সোনালি কাবিন' [১৯৬৬] তাকে বাংলা ভাষার সুদীর্ঘকালের ইতিহাসে স্বাতন্ত্র্যে ভাস্বর ধ্রুপদী মৌলিক কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। আল মাহমুদের কবিতার বড় বৈশিষ্ট্য- তিনি জাত কবি, একান্ত রক্তের ভেতরে তার কবিতা খেলা করেছে স্বতঃস্ম্ফূর্ত প্রেমে ও তাপে। পশ্চিম থেকে তিনি ঋণ করেননি, নিজের মধ্যেও ঘুরপাক খাননি ক্রমাগত- বরং নিজের চারপাশ- নদী ও নারী, স্বদেশ ও স্বকালকে তিনি কবিতায় রূপান্তর করেছেন একান্ত নিজস্ব বয়ানে।

আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তার কবিতায় অবলম্বন করেন। নারী ও প্রেমের বিষয়টি তার কবিতায় ব্যাপকভাবে এসেছে। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ম্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তার অনন্য কীর্তি।

আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইলের মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুর রব মীর ও মা রৌশন আরা বেগম। আল মাহমুদের প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি কুমিল্লার দাউদকান্দির সাধনা হাইস্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকু হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। তিনি বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।

সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে ১৯৫৪ সালে আল মাহমুদ ঢাকায় আসেন। কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। এই পত্রিকায় সম্পাদক থাকাকালে সরকারের বিরুদ্ধে লেখার কারণে এক বছরের জন্য কারাবরণ করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ 'পানকৌড়ির রক্ত' প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োগ দেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পরিচালক হন। ১৯৯৩ সালে পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

১৮ বছর বয়স থেকে আল মাহমুদের কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত 'সমকাল' পত্রিকা এবং কলকাতার 'নতুন সাহিত্য', 'চতুস্কোণ', 'ময়ূখ', 'কৃত্তিবাস' ও 'কবিতা' পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা ও কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস 'কবি ও কোলাহল'।

তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- 'অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না', 'মিথ্যাবাদী রাখাল', 'আমি দূরগামী', 'দ্বিতীয় ভাঙন', 'উড়ালকাব্য' ইত্যাদি। 'কাবিলের বোন', 'উপমহাদেশ', 'ডাহুকি', 'আগুনের মেয়ে', 'চতুরঙ্গ' ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। 'পানকৌড়ির রক্ত'সহ বেশকিছু গল্পগ্রন্থও রচনা করেছেন তিনি। 'যেভাবে বেড়ে উঠি' তার উল্লেখযোগ্য আত্মজীবনী গ্রন্থ।

ছড়া রচনাতেও তিনি ছিলেন অতুলনীয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ- সবকিছুই তার ছড়ায় রূপান্তরিত হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মুখে মুখে ফিরছে। 'আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে/ হেথায় খুঁজি ...সারা বাংলাদেশে!' 'ট্রাক, ট্রাক, ট্রাক'...'আব্বা বলেন পড়রে সোনা/ আম্মা বলেন মন দে, ...' এ ধরনের শত শত ছড়া বাঙালির মুখে মুখে ফিরছে।

প্রয়াত সৈয়দা নাদিরা বেগম ছিলেন আল মাহমুদের সহধর্মিণী। বছর কয়েক আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আল মাহমুদ মগবাজারের বাসায় নিভৃতেই বসবাস করতেন।

তিনি তার কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জয় বাংলা পুরস্কার, হুমায়ুন কবীর স্মৃতি পুরস্কার, জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার, কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্য পুরস্কার, কবি জসীমউদ্‌দীন পুরস্কার, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদকসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

কবিতায় বিস্তারিত দার্শনিকতা আল মাহমুদের বড় এক শক্তির জায়গা। জীবনকে নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে তাকে কবিতায় তিনি স্থাপন করেছেন অন্তরঙ্গ আর মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায়।

কবি আল মাহমুদ তার প্রত্যাবর্তনের লজ্জা কবিতায় লিখেছিলেন- কুয়াশার সাদা পর্দা দোলাতে দোলাতে আবার আমি ঘরে ফিরবো/ শিশিরে আমার পাজামা ভিজে যাবে/ চোখের পাতায়/ শীতের বিন্দু জমতে জমতে নির্লজ্জের মতোন হঠাৎ/ লাল সূর্য উঠে আসবে। / পরাজিতের মতো আমার মুখের উপর রোদ নামলে, সামনে দেখবো পরিচিত নদী। ছড়ানো ছিটানো ঘরবাড়ি, গ্রাম। .../ দীর্ঘ পাতাগুলো না না করে কাঁপছে। বৈঠকখানা থেকে আব্বা / একবার আমাকে দেখে নিয়ে মুখ নিচু করে পড়তে থাকবেন,/ ফাবি আইয়ে আলা ই-রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান.../ বাসি বাসন হাতে আম্মা আমাকে দেখে হেসে ফেলবেন.../ আর আমি মাকে জড়িয়ে ধরে আমার প্রত্যাবর্তনের লজ্জাকে ঘষে ঘষে তুলে ফেলবো।'

কবি আল মাহমুদ চলে গেছেন মহাসিন্ধুর ওপারে; কিন্তু তার রচিত কবিতা পরম্পরা বাংলা ভাষার চিরস্থায়ী সম্পদে এরইমধ্যে পরিণত হয়েছে। আল মাহমুদের ভাষায়, 'পরাজিত হয় না কবিরা!' সত্যিই কবি আল মাহমুদ অপরাজেয়, অবিনশ্বর কাব্যভাষার জন্য তিনি চিরকালের বাংলা ভাষার সম্পদ হিসেবে পরিগণিত ও বারবার উচ্চারিত হবেন।

সংশ্লিষ্ট খবর