সাহিত্য ও সংস্কৃতি

সাক্ষাৎকার :নন্দিতা দাস

#মিটু আন্দোলন অনিবার্য ছিল

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮ | আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

#মিটু আন্দোলন অনিবার্য ছিল

  দীপন নন্দী

নন্দিতা দাস কেবল চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও পরিচালকই নন, সামাজিক অধিকারকর্মী হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। বাংলা একাডেমিতে চলমান ঢাকা লিট ফেস্টে এসেছেন নিজের পরিচালিত নতুন চলচ্চিত্র 'মান্টো' নিয়ে। গতকাল বৃহস্পতিবার উদ্বোধনী দিনে ছবিটির বাংলাদেশ প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে সমকালের সঙ্গে আলাপচারিতায় কথা বলেছেন চলচ্চিত্রটি নিয়ে। এ ছাড়া কথা বলেছেন চলমান #মিটু আন্দোলন নিয়েও।

নন্দিতা দাস বলেন, "ঢাকা লিট  ফেস্ট নিয়ে আমি মুগ্ধ। এর আগে ২০১২ সালেও এসেছিলাম। এবার আরও মুগ্ধ আমি। কারণ, দিন দিন এ উৎসবের পরিধি বেড়েছে। ভালো লাগার আরেকটা কারণ হচ্ছে- এবার আমার 'মান্টো' চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার হচ্ছে এখানে।"

আলাপচারিতা ডানা মেলল 'মান্টো'র দিকে। নন্দিতা বলেন, 'কান চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্রটির প্রথম প্রদর্শনী হয়। এর পর এটি নিয়ে ছুটেছি সিডনি থেকে লন্ডন। ঢাকায় সর্বসাধারণের জন্য প্রথমবারের মতো প্রদর্শিত হচ্ছে। ছবির প্রযোজক প্রথমে রাজি হননি, যদি ছবিটি পাইরেসি হয়ে যায়। পরে পাইরেসি না হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত করেছি আমি। এই প্রদর্শনীর পর সারাবিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে ছবিটি মুক্তি দেওয়া হবে।'

'এটির গল্প নিয়ে যদি কিছু বলেন?'

"ছবিটি উর্দু সাহিত্যের অন্যতম লেখক সাদাত হাসান মান্টোর জীবন নিয়ে নির্মিত। আজ থেকে ৭০ বছর আগে মান্টো যেমন প্রাসঙ্গিক ছিল, প্রাসঙ্গিক এখনও। ভারতসহ সারাবিশ্বে সত্য বলার আন্দোলনে যারা সংগ্রাম করেছেন, তাদের কথাগুলোই এসেছে 'মান্টো'র জবানিতে।"

'এটার সঙ্গে তাহলে সাহিত্যের একটা সম্পর্ক আছে।'

"আছে। কিন্তু সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র খুব কমই নির্মিত হয়েছে বলিউডে। হিন্দি ভাষায় শুধু সাহিত্য নিয়ে কোনো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি। সে হিসেবে 'মান্টো'ই সাহিত্য সম্পর্কিত প্রথম হিন্দি ছবি।"

'বলিউডসহ সারাবিশ্বে #মি টু আন্দোলন এখন খুবই আলোচিত। এতে আপনার অভিমত কী?'

'এই সমাজটা পুরুষপ্রধান। এখানে নারীর অধিকার কখনোই পুরুষের সমান ছিল না। তাই অনিবার্য ছিল এই আন্দোলন। এটা খুব ভালো বিষয় যে আন্দোলনটা খুব ভালোভাবে হচ্ছে। তবে সতর্ক থাকতে হবে। সত্যিই যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেই মেয়েদের এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। এটার অপব্যবহার যাতে না হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রকৃত অর্থে এ আন্দোলন পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে।'

উৎসবের উদ্বোধনী মঞ্চে কারাগারে থাকা আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের মুক্তি চেয়েছেন নন্দিতা দাস। তিনি বলেন, 'শিল্পীরা সমাজে কোনো দেয়াল তৈরি করেন না; বরং সেতুবন্ধ তৈরি করেন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। সৃষ্টিশীলতার ভেতর দিয়েই নিজেদের তুলে ধরেন তারা। সারা পৃথিবীতেই শহিদুল আলমের মতো মানুষ আছেন, যারা কবিতা, আলোকচিত্র কিংবা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সত্যের সন্ধান করে থাকেন। এটি একটি অহিংস পন্থা। তাদের মতো মানুষকে থামিয়ে দিলে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।'

আলাপচারিতা আরেকটু বাড়াতে চাইলে বাদ সাধলেন নন্দিতা দাস, 'ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি এবার। ওর বয়স আট বছর। ঢাকা ঘুরতে যাব ওকে নিয়ে। আর এখানে এসে যে ভালোবাসা পেয়েছি, সেটাও বলব ওকে।'

সদ্য ৪৮ বছর পূর্ণ করা নন্দিতা দাসের জন্ম ১৯৬৯ সালে, মুম্বাইয়ে। হিন্দি ভাষার পাশাপাশি এই অভিনেত্রী তিনটি বাংলা ছবি ছাড়াও মালয়ালাম, তামিল, উর্দু, রাজস্থানি, কনড়সহ ভারতের অজস্র আঞ্চলিক ভাষার সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে ফায়ার, ১৯৪৭ আর্থ, বাওয়ান্দার, আজাগি, বিফোর দ্য রেইনস অন্যতম। ১৯৪৭ আর্থ-এ অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ারের শ্রেষ্ঠ অভিষেক অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেছিলেন তিনি। নন্দিতা দাস পরিচালিত প্রথম সিনেমা 'ফিরাক' একই সঙ্গে হিন্দি, উর্দু ও গুজরাটি ভাষায় মুক্তি পেয়েছিল ২০০৮ সালে। 'ফিল্মফেয়ার স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড'সহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার জিতে নেয় সিনেমাটি। চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ২০০৯ সালে ফ্রান্স সরকার তাকে 'অড্রে দেস আর্টস অ্যাট দেস লেটারস' সম্মাননায় ভূষিত করে। নন্দিতা দাস প্রথম ভারতীয়, যিনি শিল্পকলায় অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক নারী ফোরাম থেকে সম্মানিত হন। এ ছাড়া চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ 'এশিয়ান ফেস্টিভ্যাল অব ফার্স্ট ফিল্ম পুরস্কার', 'নন্দী পুরস্কার', 'ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব কেরালা পুরস্কার'সহ অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন। দুবার কান চলচ্চিত্র উৎসবের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত


আরও খবর

সাহিত্য ও সংস্কৃতি

  সমকাল প্রতিবেদক

পথচলার ৬৭ বছর পেরিয়ে ৬৮ বছরে পা রাখল বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি।

এ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার নানা আয়োজনে সজ্জিত ছিল সোসাইটি প্রাঙ্গণ। সদস্যদের প্রাণবন্ত আড্ডার পাশাপাশি ছিল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর একক বক্তৃতা। বৃহস্পতিবার থেকে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে সোসাইটির জাদুঘর।

সকালে জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা। এর পর সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানম ও সাধারণ সম্পাদক ড. সাব্বীর আহমেদ শান্তির প্রতীক সাদা কবুতর ও বেলুন উড়িয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্বোধন করেন। এর পর 'রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক এবং তার পরে' শীর্ষক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মারক বক্তৃতা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। একক বক্তৃতায় তিনি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সম্পর্ক, সম্পর্কের পটভূমি এবং ওই দুই কবির প্রস্থানের পরের সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করেন। সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক ড. সাব্বীর আহমেদ।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, 'রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহৎ কবি। বাংলার কবিদের মধ্যে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ। বিশ্বসাহিত্যে গীতিকবিতার ক্ষেত্রে এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। নজরুলও মহৎ এবং বাংলা কবিতার ইতিহাসে প্রতিভা ও অর্জনের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের পরেই তার স্থান। কিন্তু তারা একে অপর থেকে পৃথক। মহত্ত্বই তাদেরকে পৃথক করে দিয়েছে। স্মরণে রাখার মতো বিষয় হলো, নজরুলের সৃষ্টিশীল জীবন ছিল মাত্র ২২ বছরের; রবীন্দ্রনাথের সময়ের তিন ভাগের এক ভাগ।

তিনি বলেন, এ দুই কবি অনেক বিষয়ে পরস্পর কাছাকাছি ছিলেন। সে নৈকট্য কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। দু'জনেরই প্রধান পরিচয়, তারা কবি। নিজেদেরকে তারা ওভাবেই দেখতেন, লোকেও তাদেরকে সেভাবেই দেখে। তারা দু'জনেই আবার ছিলেন বহুমুখী। সাহিত্যের সব শাখাতেই তাদের কাজ আছে। রবীন্দ্রনাথের মতোই নজরুলের ছিল সঙ্গীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে তাদের অবদান অসামান্য। বাংলা সাহিত্যে তাদের মতো সঙ্গীতমনস্ক আর কোনো কবি পাওয়া যায়নি। তারা দেশের রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন; সমাজের অগ্রগতি ও মানুষের মুক্তি নিয়ে তাদের চিন্তা ছিল সার্বক্ষণিক।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন, সাহিত্য আরও অনেক কিছুর ভেতরে রুচিও তৈরি করে দেয়। উদারনীতিক সেই রুচির সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিনিধি হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যের ক্ষেত্রে ওই রুচিই স্থায়ী হয়ে আছে। নজরুল যে একটা ভিন্ন রুচি সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, সেটি পেছনে হটে গেছে। সাহিত্য ভদ্রলোকেরাই লেখেন এবং পড়েন। শিক্ষা সার্বজনীন হয়নি। শিক্ষিত ব্যক্তিরা যতটা না মানবিক হতে চেয়েছে; তার চেয়ে বেশি চেষ্টা করেছে ভদ্রলোক হওয়ার। ভদ্রলোকদের রাজত্বে নজরুলের গান তবুও চলে, তার সাহিত্য কদর পায় না। মনে হয় কেমন যেন গরিব গরিব, আবার উচ্চকণ্ঠও। অর্থাৎ অভদ্র। পিতৃতান্ত্রিক এই ব্যবস্থায় বিপ্লব যা করার শরৎচন্দ্রের সব্যসাচীরাই করেছে, নজরুলের সব্যসাচীরা পারেনি। পরাজয়টা নজরুলের একার নয়, দেশের শতকরা ৮০ জন সুযোগবঞ্চিত মানুষেরই।

এদিকে, এশিয়াটিক সোসাইটির ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বৃহস্পতিবার থেকে সর্বসাধারণের জন্য এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘর উন্মুক্ত করা হয়েছে। এদিন সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক মাহফুজা খানম এক হাজার টাকা দিয়ে ৫০টি টিকিট ক্রয় করে জাদুঘর পরিদর্শনের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এই ৫০টি টিকিট উপস্থিত সম্মানিত সদস্যদের জন্য প্রদান করা হয়। এ ছাড়া ঐতিহ্য জাদুঘরের প্রধান গবেষণা সমন্বয়ক অধ্যাপক শরীফ উদ্দিন আহমেদও ৫০টি টিকিট ক্রয় করে দর্শকদের সৌজন্য উপহার প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘরকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. জেবউন নেছা দুটি এবং নারায়ণগঞ্জের আলহাজ মু. জালাল উদ্দিন নলুয়া একটি নিদর্শন উপহার প্রদান করেন।

সাধারণ দর্শকদের জন্য এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘর প্রতি শুক্রবার ও শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। শুক্রবার দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত নামাজের বিরতি। জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য দর্শকদের প্রবেশমূল্য ২০ টাকা, ছাত্র-ছাত্রীদের পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে ১০ টাকা এবং বিদেশি দর্শকদের জন্য ২০০ টাকা ধার্য করা হয়েছে।

পরের
খবর

কীর্তিমানের মৃত্যু নেই


আরও খবর

সাহিত্য ও সংস্কৃতি
কীর্তিমানের মৃত্যু নেই

বিশেষ লেখা

প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ববিতা

পরিচালনা ও লেখালেখি অনেকেই ভালো করেন-কিন্তু গণমানুষের প্রাণের স্পন্দনের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন, এমন পরিচালক একটি দেশে খুব বেশি থাকে না। আমাদের দেশে আমজাদ হোসেন ঠিক তেমনই একজন পরিচালক- যিনি গণমানুষের প্রাণের স্পন্দনে মিশে গেছেন। সেই ষাটের দশকে এ দেশের চলচ্চিত্রের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছিলেন। অল্প সময়েই হয়ে উঠেছিলেন সবার শ্রদ্ধেয় ও প্রিয়। বাংলা চলচ্চিত্রের দিকপাল বা সেরা মহীরুহদের একজন আমজাদ হোসেন- যিনি একাধারে অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, কাহিনীকার, সংলাপকার, গীতিকার, নাট্যকার, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক। তাকে ভালোবাসেন না, এমন একজন মানুষও কি এই দেশে পাওয়া যাবে? এটি এক বিরল ঘটনা। তার এই অর্জন সম্ভব হয়েছে কাজের প্রতি তার অসামান্য নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও ভালোবাসার কারণেই। তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে আরও নিখুঁতভাবে গড়ে তুলতে চাইতেন। একজন প্রকৃত ও গুণী শিল্পী হিসেবে এই নিষ্ঠা তার ছিল।

আমজাদ ভাই নেই- বড় আঘাত পাওয়ার মতো খবর। অবিশ্বাস্য।

আমি কোনোভাবেই এটা মেনে নিতে পারছি না। খুবই কষ্ট হচ্ছে আমার। এতদিন ধরে কাজ করেছি, যা স্মৃতিকোষে আজও জমা হয়ে আছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই দিনগুলোর দৃশ্যপট; আর অশ্রুসিক্ত করছে আমাকে।

কতদিনের পরিচয় আমাদের- তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। দিন, তারিখ, মাস, বছর কোনোটাই মনে নেই। তার অনেক চলচ্চিত্রে আমি অভিনয় করেছি। ভীষণ প্রিয় একজন মানুষ আমার। তার মতো আবেগী মানুষ আমার অভিনয় জীবনে খুব কমই দেখেছি। তার নির্দেশনায় প্রথম 'নয়নমণি' চলচ্চিত্রে অভিনয় করি, তখন তিনি বলেছিলেন, 'অভিনয় করে দেখুন, আপনার ভালো লাগবে আশা করি।' সত্যিই 'নয়নমণি' দর্শকের কাছে একজন অভিনেত্রী হিসেবে আমাকে অন্যরকম এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। 'নয়নমণি'র পর 'সুন্দরী', 'কসাই', 'বড় বাড়ির মেয়ে', 'গোলাপী এখন ট্রেনে' চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। যারা সত্যিকার অর্থে বড় মাপের নির্মাতা তাদের মধ্যে বিশেষ কিছু গুণ থাকে, যা সহজেই অন্য অনেকের চেয়ে তাকে আলাদা করে দেয়। আমজাদ ভাই ঠিক তেমনি একজন গুণী মানুষ, নির্মাতা। আমজাদ ভাইয়ের মতো গুণী মানুষ তার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন।

ষাট দশকের পাকিস্তানি ছবির দাপটের মধ্যে এ দেশে কম বাজেটের বাংলা ছবি নির্মাণ করা রীতিমতো যুদ্ধ ছিল। আমজাদ হোসেন ছিলেন এ দেশের সিনেমার পক্ষে সেই লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান যোদ্ধা। তিনি নিরলস পরিশ্রমে বাংলা চলচ্চিত্রকে দৃঢ় ভিত্তিমূলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। তিনি ইতিহাসের অনিবার্য অংশ।

এই তো সেদিন শেষবার তাকে দেখতে গিয়েছিলাম হাসপাতালে। দূর থেকে তার মুখখানা দেখে হাজারো স্মৃতি ভেসে উঠেছিল মানসপটে।

বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে একটা মাইলফলক 'গোলাপী এখন ট্রেনে'। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছে ছবিটি। কী অসাধারণ এর নির্মাণশৈলী। ছবিটিতে ছিল বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের গল্প। ছবির প্রতিটি সংলাপ মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। সে সময় তো অফিস-আদালত, হাটে-বাজারে 'গোলাপী এখন ট্রেনে' ছবির সংলাপ সবার মুখে ফিরত। বিশেষ করে ওই কথাটা তো ছড়িয়ে গিয়েছিল-গোলাপীকে প্রশ্ন করা হচ্ছে 'তোমরা যে ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাসে এসে ঢুকলা, তোমরা টিকেট কেটেছো?' উত্তরে সে বলছে, 'বাংলাদেশে কোনো কেলাস [ক্লাস] নাইক্যা, আমরা হগলেই এক কেলাসের [ক্লাস] মানুষ।' এই সংলাপটি কী অসাধারণ ভাবেই না আমজাদ ভাই সেলুলয়েডের পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এখনও পর্দায় দেখলে হারিয়ে যাই অন্য ভুবনে। আমজাদ হোসেন সমকালীন মেধাবী নির্মাতাদের একজন। মনে আছে যখন 'গোলাপী এখন ট্রেনে'র কাজ করছি, সেই সময় ট্রেনে বসেই আমজাদ ভাই লিখলেন 'হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ' গানটি। গানটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এখনও গানটি মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

দীর্ঘ সময় ধরে চলচ্চিত্র অঙ্গনে আমাদের পদচারণা ছিল। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে জেনেছি, পরিচালনা, অভিনয় আর লেখালেখির প্রতি তার আছে অকৃত্রিম ভালোবাসা। শিল্পীসত্তাকে সমৃদ্ধ করতে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। চলচ্চিত্রকার-লেখক পরিচয়ের বাইরেও একজন সাদা মনের মানুষ ছিলেন তিনি। সবার বিপদে-আপদে এগিয়ে আসতেন। এ জন্য আমজাদ হোসেনের তুলনা চলে কেবল তার সঙ্গেই। সময়কে অতিক্রম করে যাওয়ার সব রকম প্রচেষ্টা ছিল তার। খ্যাতির মোহ কখনও পেয়ে বসেনি। কাজের বিষয়ে আপস করতেন না। সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল নিজের কাজটিকে ভালো করে তুলে ধরার। এমন একজন যখন আমাদের ছেড়ে চলে যান, তখন কত বড় শূন্যতা তৈরি হয়, তা বলাই বাহুল্য।

যখন খবর এলো আমজাদ হোসেন আর নেই, তখন বাঁধভাঙা অশ্রু ধরে রাখতে পারিনি। অবশ্য আমি মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিই যে, মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মে। তিনি এই দেশের মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবেন। তার মৃত্যু নেই। বাংলা চলচ্চিত্র যতদিন আছে, আমজাদ হোসেনের অবস্থান চির অমলিন হয়ে রইবে। ব্যক্তিগতভাবে আমাদের দুঃখ, আমরা আর মানুষটিকে চোখে দেখব না। এই তো নিয়তি। বিদায় প্রিয় ভাই। প্রিয় বন্ধু, বিদায়।

পরের
খবর

কাঙালিনী সুফিয়ার অবস্থার কিছুটা উন্নতি


আরও খবর

সাহিত্য ও সংস্কৃতি

হাসপাতালে কাঙালিনী সুফিয়া- সমকাল

  নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার

বাংলা লোকগানের জনপ্রিয় শিল্পী কাঙালিনী সুফিয়া। হৃদরোগ ও উচ্চরক্তচাপ জনিত কারণে তাকে ঢাকার সাভারে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে ( সিসিইউ) রাখা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালে ভর্তি করা এই শিল্পীর অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে চিকিৎসকের জানিয়েছেন। তবে অর্থকষ্টে থাকার কথা জানিয়েছে তার পরিবার।

শনিবার দুপুরে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও এনাম মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ডা: এনামুর রহমান এনাম হাসপাতালে যান এবং কাঙালিনী সুফিয়াকে দেখে তার শারীরিক অবস্থার খোঁজ খবর নেন।

কাঙ্গালিনি সুফিয়ার মেয়ে পুষ্প আক্তার বলেন, মা নানা জটিল রোগে দীর্ঘদিন ধরেই ভুগছিলেন। মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ করেই বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। স্মৃতিশক্তিও লোপ পাওয়ায় তিনি কাউকে চিনতে পারছিলেন না। প্রেশার বেশি থাকার কারণে বেশ খানিকবার বমি করেন। প্রচণ্ড মাথা ও  গলা ব্যথা ছিলো। এরপর দ্রুত তাকে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি।

তিনি জানান, প্রথমে কেবিনে দিলেও মায়ের অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে সিসিইউ নেয়া হয়েছে। চিকিৎসকরা বলেছেন- তিনি এখন অনেকটাই শংকামুক্ত।

পুষ্প কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান বলেন, মায়ের চিকিৎসার জন্য এত টাকা কোথায় পাব। সরকার ও বিভিন্ন ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া অনুদানের টাকাসহ ধারদেনা করে অনেক টাকা ইতিমধ্যেই  বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ঔষধের পিছনে খরচ হয়ে গেছে। মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে তার ভক্তবৃন্দরা হাসপাতালে ছুটে  অনুদান দিলেও তার পরিমান খুবই সামান্য। তিনি তার মায়ের চিকিৎসার জন্য সকলের কাছে সহযোগিতা ও দোয়া চান।

রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী এ্যাপোলো জামালি কাঙালিনী সুফিয়া দেখতে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে ছুটে আসেন। তিনি বলেন, এ বাউল শিল্পীর  অসুস্থতার খবর শুনে আমরা দ্রুত হাসপাতালে ছুটে আসি। গত দুই দিন ধরে তার পাশে থেকে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আমরাও তাকে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা এবং মানসিকভাবেও সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করছি।

কাঙালিনী সুফিয়ার চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক এনাম মেডিকেল কলেজের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোলায়মান হোসেন জানান, হৃদরোগ ও উচ্চরক্তচাপ জনিত কারণে প্রথমে থাকে এখানে ভর্তি করা হয়। এরপর নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা যায় তার শরীরে রক্তের পরিমাণ অনেকটাই কম। এছাড়াও কিডনি জনিত নানান জটিল রোগ তাকে আঁকড়ে ধরছে। তবে বর্তমানে আগের চেয়ে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। 

তিনি বলেন, এনাম মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ডা: এনামুর রহমানের নির্দেশে তার সকল প্রকার চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত এর জন্য হাসপাতালের কার্ডিওলোজী, নিউরোলোজীসহ প্রতিটি ইউনিটের চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। কাঙালিনী সুফিয়া আমাদের দেশের একজন বরেণ্য সঙ্গীত শিল্পী। তার চিকিৎসার যেন কোন ত্রুটি না হয় সে নির্দেশও আমাদের রয়েছে। 

কাঙালিনি সুফিয়ার সাথে গান করা নাতি গিটার বাদক সোহান যাযাবর বলেন, আমরা চাই সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তিনি উপযুক্ত চিকিৎসা পেয়ে দ্রুত সুস্থ হয়ে আবারও আমাদের মাঝে ফিরে আসুন।

এব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা: এনামুর রহমান বলেন, কাঙালিনি সুফিয়া আমাদের দেশের একজন বরেণ্য সঙ্গীত শিল্পী; সাভারের গর্ব। আমি প্রতিদিন তার চিকিৎসার খোঁজ খবর নিচ্ছি। তার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো।

উল্লেখ্য, বাউল গানের শিল্পী কাঙালিনী সুফিয়া মাত্র ১৪ বছর বয়সে গ্রাম্য একটি অনুষ্ঠানে গান গেয়ে শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান। এরপর বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।

ওই সময়ই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর ডি.জি. মুস্তফা মনোয়ার তার উপাধি দেন ‘কাঙালিনী’। সেই থেকে তিনি এই নামে পরিচিতি পান।

সঙ্গীতে এযাবৎ তিনি প্রায় ৩০টি জাতীয় ও ১০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন। গান রচনা করেছেন প্রায় ৫০০টি। তার জনপ্রিয় গানের তালিকায় আছে- ‘পরাণের বান্ধব রে, বুড়ি হইলাম তোর কারণে’, ‘কোন বা পথে নিতাই গঞ্জে যাই’, ‘নারীর কাছে কেউ যায় না’ প্রভৃতি।