রংপুর

নদীতে বিলীন ১২ বিদ্যালয়, পাঠদান চলছে চালাঘরে

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

নদীতে বিলীন ১২ বিদ্যালয়, পাঠদান চলছে চালাঘরে

পাঠদান চলছে চালাঘরে

  ভবতোষ রায় মনা, ফুলছড়ি (গাইবান্ধা)

এবারের বন্যায় গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার পাঁচটিসহ জেলার ১২টি স্কুল নদীতে বিলীন হয়েছে। বন্যার পানি নেমে গেলে খোলা আকাশের নিচে পাঠদান শুরু করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। এতে নানা ধরনের সমস্যায় পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। ফলে চলতি বছর ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষকরা। 

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে স্কুলের কক্ষ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এবারের দুই দফা বন্যায় ফুলছড়ি, সাঘাটা, সদর, সুন্দরগঞ্জ উপজেলাসহ অন্যান্য এলাকার ২২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ হয়ে যায়। তবে পানি নেমে যাওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ২০৮টিতে পাঠদান শুরু হয়। আর ফুলছড়ির হারোডাঙ্গা, ধলিপাটাধোয়া, কেতকিরহাট, জামিরা, আঙ্গারীদহ, গাইবান্ধা সদরের চিথুলিয়ার চর, চিথুলিয়া দিগর নতুন পাড়া, বাজে চিথুলিয়া, মৌলভীর চর, কেবলাগঞ্জ, সুন্দরগঞ্জের উজানবুড়াইল, চরপূর্ব লাল চামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সময় তীব্র নদী ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংলগ্ন কেতকির হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দৃষ্টিনন্দন দ্বিতল ভবনের কোনো অস্তিত্ব নেই। সেখানে ভাঙনের চিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে দুই-তিনটি পিলার। অথচ বন্যার কয়েকদিন আগেই বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা নতুন দ্বিতল ভবনে শিক্ষকদের কাছে পাঠগ্রহণ করত। পাশের একতলা পুরনো ভবনটিতেও ছিল তাদের ক্লাসরুম। প্রশস্ত আঙিনায় ছিল খেলার সুযোগ। পাশেই ছিল কেতকিরহাট বাজার। সবই পাওয়া যেত সে বাজারে। কিন্তু স্রোতের তোড়ে ভবন দু’টিসহ প্রায় শতাধিক দোকানপাট, বাড়িঘর ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে হারিয়ে যায়। 

স্কুলের আসবাবপত্র, বেঞ্চ, টেবিলসহ সব জিনিস ডুবে গেছে। বিদ্যালয় ভবনের পাশে গাছতলা ও চালাঘরে বসে তারা এখন হতাশ চোখে ক্লাস করছে। 

স্কুলের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্রী লিমা আক্তার জানায়, আমাদের লেখাপড়া করতে খুব অসুবিধা হচ্ছে। মাটিতে বসে পড়তে ভালো লাগে না। রাস্তার সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। আবার রাস্তা দিয়ে সাইকেল-মোটরসাইকেল চলাচলের সময় ধুলোবালি উড়ে এসে চোখেমুখে পড়ে। সামনে সমাপনী পরীক্ষা আমরা কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। তাই আমরা দ্রুত আগের মতো স্কুল চাই। 

এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সোলেমান আলী বলেন, দ্রুত বিদ্যালয়টির জন্য জমি ও অবকাঠামো নির্মাণ করা দরকার। এভাবে পড়াশোনা করার কারণে বাচ্চাদের পড়ায় মনোযোগ থাকে না। তারা পিছিয়ে যাচ্ছে। সামনে পরীক্ষা, আমাদের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার কি হবে জানি না। অনেকের আবার প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী সমাপনী পরীক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এখন এখানে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেই কারো। 

কেতকিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মতিয়ার রহমান বলেন, স্রোতের তোড়ে ভবনগুলোর সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে হারিয়ে গেছে স্কুলের আসবাবপত্র, বেঞ্চ, টেবিলসহ সব জিনিসপত্র। হারিয়ে যাওয়া বিদ্যালয় ভবনের পাশে গাছতলা ও ছাপরাঘর তুলে সেখানে পাঠদান করা হচ্ছে। কারণ সমানে সমাপনী পরীক্ষা। 

কেতকিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক মোছা. লিমা খাতুন জানান, এ স্কুলে ৩২০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের সামলাতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। ক্লাসরুম থাকলে এ ঝামেলা পোহাতে হতো না। খোলা জায়গায় ক্লাস নিতে গিয়ে নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। একইসঙ্গে শিশু শ্রেণিসহ ছয়টি ক্লাস নিতে গিয়ে কোলাহলপূর্ণ খোলা জায়গায় মনসংযোগ হারিয়ে ফেলেন শিক্ষকরা। রোদ-বৃষ্টিতে সংকট আরও বাড়ে।

কেতকির হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক মোছা. রেজিয়া খাতুন বলেন, ভেঙে যাওয়া স্কুলের পাশে তারা নিজেরা একটি চালাঘর তুলেছেন। গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক টিন দিয়েছেন। সেখানে পাঠদান চলছে। স্কুল ভবন না থাকায় এবার চর এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার সংখ্যা বাড়তে পারে।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসেন আলী সমকালকে বলেন, নদীভাঙনে ১২টি স্কুল বিলীন হয়। এরমধ্যে সুন্দরগঞ্জে দুইটি, ফুলছড়িতে পাঁচটি ও গাইবান্ধা সদর উপজেলায় পাঁচটি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। বরাদ্দ পেলে স্কুলের কক্ষ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মন্তব্য


অন্যান্য